ঠিকই বলেছে রাখী। এই পরিবেশে প্রেমের বারোটা বেজে যাবে। মোটেও জমবে না। ওকে সায় দিলুম। বললুম–তাই হবে। লাঞ্চ খেয়ে আর দরকার নেই। চলল, গিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিই। মিসেস জেভিয়ারকে আমি বলে আসছি তুমি এগোও।
রাখী তখুনি ওপরে চলে গেল। আমি মিসেস জেভিয়ারকে কথাটা বলতেই উনি দুঃখিত মুখে বারবার ক্ষমা চাইলেন। বললেন কী করব বাছা, আমারই দুর্ভাগ্য! আবার কিন্তু আসবে তোমরা।
সিঁড়ির মুখে সেই গুঁফো সেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল–হ্যাল্লো মিঃ চৌধুরী, আর কিছু শুনলেন?
-কিসের বলুন তো?
–আবার কিসের? যা ঘটে গেল!
বিরক্ত হয়ে বললুম–কিচ্ছু শুনিনি। স্রেফ সুইসাইড। কেন? আর বেশি কী শোনার আছে?
হঠাৎ লোকটা অভদ্রভাবে আমার কাঁধে একটা হাত রেখে মুচকি হেসে চাপা গলায় বলে উঠল–ওই ভদ্রমহিলা কি সত্যি আপনার স্ত্রী?
রাগে সারা শরীর বি রি করে উঠল। হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললুম–কী বলছেন মশাই যা-তা! একটু ভদ্রতাও শেখেননি!
গুঁফো সেন হাসতে লাগল।
আরও রেগে বললুম–আপনি অত্যন্ত অভদ্র! আপনি জানেন কার সঙ্গে ইতর রসিকতা করছেন? তেমন শিক্ষা-সংস্কৃতি থাকলে গৌতম চৌধুরীর সঙ্গে এরকম ব্যবহার করতে লজ্জা পেতেন!
গুঁফো একটুও না দমে বলল–আমি মশাই এখানকার ভেটারেন ট্যুরিস্ট। আপনার সঙ্গিনীকে অনেকবার দেখেছি এখানে। এই লজেই–অন্য ভদ্রলোকের প্লঙ্গে। মিসেস জেভিয়ার বুড়ি মানুষ–চোখেও কম দেখেন। নয়তো চেনা মুখকে। অচেনা ভাবতেন না। এবেলার চেনা মানুষ উনি ওবেলায় চিনতে পারেন না। কিন্তু আমি পারি!…..
বলেই গুঁফো সেন আচমকা চলে গেল। আর দুটো চড়া কথা বলার সুযোগ দিল না। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরের দিকে পা বাড়ালুম।
রাখী তাহলে অন্য কারও সঙ্গে অনেকবার এখানে এসেছে? কার সঙ্গে এসেছে? অন্য প্রেমিক? নাকি ওই মাস্তান লোকটা আমাকে নিয়ে মজা করল? রাখীকে কথাটা বলার সাহস পেলুম না। ও দুঃখ পাবে। আমাদের সুন্দর সম্পর্কটা নড়ে ওঠারও আশঙ্কা আছে। বিশেষ করে রাখী যা ভাবপ্রবণ মেয়ে! অত আবেগ। যার মনে–তাকে এসব প্রশ্ন করা মানেই বারুদে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দেওয়া! আর এযুগে অত সংকীর্ণচেতা হওয়া সাজে না।
মনের অস্থিরতা মনেই চেপে রাখলুম। কিন্তু গোছগাছ করতে করতে বুদ্ধিমতি রাখী তা যেন টের পেল। বলল–তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন বল তো? মাথা ধরেনি তো?
বললুম–হ্যাঁ?
ট্যাবলেট আছে। খেয়ে নাও না! দেব?
থাক। বেরুলে ছেড়ে যাবে।
সব গোছানো হয়ে গেলে রাখী একবার ব্যালকনিতে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে ডাকল–এই! শুনে যাও না!
তার ডাকের কোনও তুলনা নেই। খুব ঝটপট যেটুকু সেজে নিয়েছে, তাতে, ওর চেহারা আশ্চর্য লাবণ্যময় হয়ে উঠেছে। ওর কোমর, নিতম্ব ও পেটের কিছু নগ্ন অংশ, এবং ওর ঠোঁট চিবুক গলা ঘাড় চুল–আমার চোখে অলৌকিক আর মায়াময় হয়ে উঠেছিল। প্রায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে তার পাশে গেলুম। সে তার চাপা অভ্যস্ত আবেগময় স্বরে বলল–চলে যাবার আগে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে বলে যাবে না যে, আমরা এসেছিলুম–তুমি সাক্ষী রইলে?
-হ্যাঁ। বলব। বলব যে আবার আসব, আমাদের মনে রেখ।
–গৌতম!
উঁ?
–এখানে দাঁড়িয়ে সমুদ্রকে সাক্ষী রেখে আমাকে তুমি একটা চুমু দাও না লক্ষ্মীটি।
বলার দরকার ছিল না। পাগলের মতো ওকে দুহাতে বুকে টেনে ওঁর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলুম–দীর্ঘ একটা মিনিট। তারপর ও সরিয়ে দিল। ঠোঁট মুছল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল–আরও কিছু তোমাকে দেবার ছিল এই সমুদ্রের সামনে। তুমি আরও কিছু চেয়েছিলে–তাই না গৌতম?
–হ্যাঁ। আরও কিছু বাকি থেকে গেল, রাখী।
রাখী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ ঘরে চলে এল। আমি ওর পিছন পিছন এসে ওকে গভীর আবেগে আকর্ষণ করে বললুম–রাখী! আমার আত্মা! আমার প্রাণ!
রাখী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল–এবার আমরা কোথায় যাব গৌতম? আমার ছুটি কিন্ত আরও তিনদিন আছে।
–চলো তো, আগে স্টেশনে যাই। তারপর ঠিক করে নেব।
কাছাকাছি আর কোথাও সি-বিচ নেই ভাল?
–আছে। সে অনেক দূর। প্রায় ছ-সাত ঘণ্টার জার্নি। তার চেয়ে তিন ঘণ্টার ট্রেনে ও বাসে আমরা কোনারক পৌঁছাতে পারি।
–কোনারক! রাখী নেচে উঠল। ওগো, তাহলে তাই চলো! …
একটু পরে নির্বিবাদে আমরা বেরোলুম। ফো সেন বা কর্নেল কাউকেও দেখতে পেলুম না। অনেকটা স্বস্তি এল। রিকশায় আমরা স্টেশনের দিকেই চললুম। আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার আজ। অবশ্য এখানে ওখানে কিছু সাদা মেঘ আছে। বাতাসও বইছে প্রচণ্ড জোরে। পিছন থেকে বইছে বলে রিকশা প্রায় পক্ষীরাজের মতো উড়ে চলল।
চন্দনপুর অন-সী জংশন স্টেশন। খুব ভিড়ও ছিল। কোনারকের দিকে যাবার ট্রেন আসতে দেড় ঘণ্টা দেরি। ফার্স্ট ক্লাশ ওয়েটিং রুমে রাখীকে বসিয়ে রেখে এনকোয়ারিতে দাঁড়িয়ে ছিলুম। ভাবছিলুম, দুপুরের খাওয়াটা এখানেই সেরে নিই। কারণ ট্রেন থেকে নেমে কোনারকের পথে বাসে যেতে হবে। কখন পৌঁছব কিছু ঠিক নেই।
হঠাৎ চমকে দেখি সেই গুফো সেন সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে নিবিষ্ট মনে খবরের কাগজ পড়ছে। আপদটা এখানে কেন? অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠলুম। ওর চোখ এড়িয়ে তক্ষুনি সরে গেলুম। ক্যান্টিনটা খুঁজে বের করতে হবে!
ক্যান্টিন থেকে অবস্থা দেখে বেরিয়ে রাখীকে ডাকতে আসছি, চোখে পড়ল প্ল্যাটফর্মের ফাঁকা জায়গায় কিছুটা দূরে একটা পিপুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন সেই ধুরন্ধর গোয়েন্দা ঘুঘু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। আমার বুকে রক্ত ছলকে উঠল।
