রাখী কৌতূহলী হয়ে বলল ঠিকানা কোথাকার?
-বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ।
–সে কী! আমিও তো…বলে চুপ করে গেল রাখী।
–আপনি কি বহরমপুরের মেয়ে?
রাখীর বিব্রত অবস্থা টের পেয়ে আমি বললুম–হা কর্নেল। আমার শ্বশুরালয় বহরমপুর। কিন্তু সবাইকে চেনা তো রাখীর পক্ষে সম্ভব নয়। কী বলল রাখী?
রাখী বলল–নামটা…নামটা কেমন চেনা লাগল। বহরমপুরে রমা বলতে সে ভুরু কুঁচকে ভাবতে থাকল।
কর্নেল তার দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে খারাপ লাগল। রাখীর সিঁথিতে অবশ্য সরু সিঁদুরের রেখা রয়েছে। হাতে শাঁখাটাখা নেই–আমরা তো মডার্ন দম্পতি! বললুম–একটা শহরে অনেক রমা থাকা সম্ভব!
কর্নেল বললেন–রাইট, রাইট। সে তো সম্ভবই।
রাখী হঠাৎ বলল–ও, মনে পড়েছে! রমা রায়! কিন্তু তাকে তো আমি চিনতুম!
–কে সে?
রাখী হেসে ফেলল।–এক দাগী ডাকাতের বউ। পরে ওর স্বামীর জেল হয়। জেল থেকে পালাতে গিয়ে গুলি খেয়ে মারা পড়ে। বউটি বহরমপুরে মার্কামারা মেয়ে ছিল। সবাই চিনত। পুলিসের সঙ্গে খাতির ছিল প্রচণ্ড। তারপর কোথায় যেন চাকরি-টাকরি নিয়েছিল। ও হ্যাঁ–স্কুলে।
–স্কুলে ডাকাতের বউকে চাকরি দিল?
বুঝতেই পারছেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে খাতির করে নিয়েছিল। ওর মতো মেয়ের পক্ষে অসম্ভব তো কিছু ছিল না!
আমি রাখীকে সমর্থন করে বললুম–আজকাল তো সব জায়গায় এরকম হচ্ছে। মরালিটি নিয়ে কজনই বা মাথা ঘামায়? অবশ্য, সাহিত্যিক হিসেবে আমি বলব–এতে ইম্মরালও কিছু নেই। স্বামী দাগী ডাকাত হলেই যে বউ ভাল মেয়ে হবে না, তার মানে নেই। তাছাড়া স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে বাঁচতে হবে তো!
কর্নেল বললেন–সে রমা নিশ্চয় দেখতে খুব সুন্দরী ছিল?
কর্নেলের বেমক্কা প্রশ্নে অবাক হলুম। রাখী কিন্তু হাসল।-কেমন করে বুঝলেন?
হিউম্যান সাইকলজি এরকমই, মিসেস চৌধুরী। রূপের বেলা সাতখুন মাফ। অবশ্য এটা জেনারেল ল।
রমা দেখতে খুব সুন্দরী ছিল। গরীব ঘরের মেয়ে তো? বি এ পাশ করার আগেই বাবা ওর বিয়ে দেন–অবশ্য রমা প্রেম করেই বিয়ে করে। আর করল করল, এক মাস্তানের সঙ্গে। তার ফলটা ভালই ভুগল।
–তাহলে বলছেন, সে রমা এই রমা নয়?
–মোটেও না।
আমি হঠাৎ বলে উঠলুম কিন্তু তুমি তো এই রমাকে দেখইনি, রাখী?
রাখী ভুরু কুঁচকে বলল–দেখিনি? পরক্ষণে হেসে ফেলল। কী কাণ্ড! সত্যি তো! আমি ওকে এখানে দেখিইনি। অথচ কেবলই মনে হচ্ছে–দেখেছি! আসলে ওই নামটার জন্যে এমন হচ্ছে!
কর্নেল মাথা নেড়ে সায় দিলেন। রাইট, রাইট। যাকে বলে উইশফুল থিংকিং। তবে ও বডিটা আপনার একবার দেখা দরকার। অবশ্যই দরকার। আপনি সনাক্ত করলে পুলিসের খুবই সুবিধে হয়। দায়িত্ববান নাগরিকের পক্ষে এটা কর্তব্যও বটে।
এই বলে কর্নেল খুব ব্যস্তভাবে উঠলেন এবং রাখী অসহায় মুখে আমার দিকে তাকাল। বিব্রত বোধ করছিলুম। রাখীকে এভাবে মড়ার সামনে নিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তাই শেষ রক্ষার জন্যে, বললুম–ইয়ে দেখুন কর্নেল, ওর নার্ভ খুব শক্ত নয়। একসময় নার্ভের অসুখেও ভুগেছে। তার প্রমাণ তো গতরাতে পেয়েছেন। তাই বলছিলুম, মড়াটড়া দেখে ও হয়তো ভীষণ ভয় পাবে এবং হিতে বিপরীত ঘটে যাবে।
কর্নেল মানুষটি দেখলুম খুবই সহানুভূতিশীল। ব্যাপারটা বুঝতে ওঁর দেরি হলো না। আবার বসে পড়লেন। বললেন–হ্যাঁ, সেও ঠিক। ওঁর নার্ভ তেমন শক্ত নয়। আচ্ছা মিসেস চৌধুরী, তাহলে যদি ওর ডেডবডির একটা ফোটো আপনাকে দেখানো হয়, কোনও আপত্তি হবে?
রাখী নিশ্চয় মনে মনে বিরক্ত হলো। পুলিসে যা করবার করুক, তুমি কে বাপু যে এত উৎসাহ দেখাচ্ছ–এরকম ভাব রাখীর মুখে ফুটে উঠল। কিন্তু সে আস্তে ঘাড় নেড়ে ছোট্ট করে শুধু বললেউ।
কর্নেল বললেন–ছবি তোলা হয়েছে। লাশও এতক্ষণ মর্গে চলে গেছে। ছবিটা পেতে ঘণ্টা চার-পাঁচ দেরি হবে। যাই হোক, অপেক্ষা করা যাক।
রাখী বলল-চার-পাঁচ ঘণ্টা! আমরা যে এগারোটা ছত্রিশের ট্রেনে চলে যাব ঠিক করেছি কর্নেল!
আমি অবাক হয়ে তাকালুম ওর দিকে। কখন ঠিক করলুম রে বাবা! চলে যাওয়া মানেই তো রাখীর সঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া! আর এক্ষুণি চলে যাব বলে তো এতদূরে বেড়াতে আসিনি।
রাখী আমার দিকে চোখের ইশারা করল। তখন বুঝলুম, আসলে ও ডেডবডির ছবিও দেখতে চায় না। এড়িয়ে যাবার মতলব এঁটেছে! অতএব ওকে সায় দিয়ে বললুম–হা কর্নেল। যে বীভৎস কাণ্ড হলো–এরপর এখানে ওকে নিয়ে থাকা খুব রিস্কি! আবার ভয়টয় পেয়ে সিন ক্রিয়েট করে বসবে। তাছাড়া রমা ঠিক পাশের ঘরেই উঠেছিল!
হাসতে হাসতে বললুম– কথাটা। কর্নেল গম্ভীর হয়ে মাথাটা কয়েকবার দোলালেন মাত্র। কিছু বললেন না। অবশ্য এও জানি যে, পুলিস আইনত আমাদের আটকাতে পারে। বুক কেঁপে উঠল–আমাদের নিয়ে পুলিস টানাটানি করলেই বিপদ। রাখী ও আমার গোপন সম্পর্ক ফাঁস হয়ে যায় যদি! পুলিসের চোখে ফাঁকি দেওয়া কি সহজ হবে যে আমরা আসলে স্বামী-স্ত্রী নই?
অবশ্য এটা পশ্চিমবঙ্গ হলে নিজের কিছু প্রভাব খাটাতে হয়তো পারতুম। কিন্তু এটা ওড়িশা। ভিন ভাষার রাজ্য। এখানে কারো কাছে গৌতম চৌধুরী সাহিত্যিক বলে কোনও আলাদা গুরুত্ব নেই।
হঠাৎ কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন–এক্সকিউজ মি। আবার দেখা হবে। কেমন?
উনি চলে গেলে রাখী ফিসফিস করে রাগ দেখিয়ে বলল–ভদ্রলোক বড্ড কুচুটে মানুষ! যেন সব দায় ওঁর! এই, আর এখানে থাকব না আমরা। বরং অন্য কোনও জায়গায় চলে যাই। এই বিশ্রী ঘটনার পর তোমার ইচ্ছে করবে ফ্রিলি চলাফেরা করতে?
