বেরিয়ে এলুম অগত্যা। ওর দৃঢ়তার কাছে নতি স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই। করিডর ফাঁকা। সব দেখে শুনে বাঁদিকে এগিয়ে নিচে যাবার সিঁড়ির মুখে কথামতো দাঁড়ালুম এবং কাশলুম অর্থাৎ পথ পরিষ্কার।
আমাদের ঘর থেকে রাখী বেরোল। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় চলে গেল সে করিডর পেরিয়ে তেতলার সিঁড়ির দিকে। অবশ গায়ে ও দুরুদুরু বুকে আমি দাঁড়িয়ে আছি। এতদিন পরে দেবতাকে খুব ডাকাডাকি করছি মনে মনে। মানত মানছি। সেকেণ্ডগুলো কাটতেই চায় না।
আর কাশবার দরকার হলো না। রাখীকে নেমে আসতে দেখলুম। সে চোখ নামিয়ে হাসিমুখে ঘরে ঢুকলে আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। প্রায় দৌড়ে ঘরে ঢুকে দরজা ভাল করে লক করলুম। তারপর রুদ্ধশ্বাসে বললুম–কোথায় রেখে এলে?
রাখী জবাব দিল–ভেবো না। ঠিক জায়গায় রেখেছি।
এই সময় বাইরে ভারী পায়ের শব্দ হলো। পুলিস নাকি? শব্দ অন্য দিকে সরে গেল। ইস্ আর একটু দেরি করলে কী যে ঘটত! …
.
তারপর যা সব হলো, বিস্তারিত বলার দরকার নেই। পুলিস আমাদের নীচে ডাইনিং হলে ডেকেছিল। জিজ্ঞাসাবাদ যা হলো, তা চূড়ান্ত। এরপর সার্চের পালা পড়ল। প্রত্যেকটি ঘর এবং প্রত্যেককে সার্চ করা হবে। মেয়েদের বডিসার্চ করবে এক মহিলা পুলিস। সবাইকে নিয়ে ওপরে আসা হচ্ছে, এমন সময় দেখা গেল মিসেস জেভিয়ার তেতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে নামছেন। কর্নেল সাহেবই দৌড়ে গিয়ে বুড়িকে ধরলেন। বুড়ির হাতে সেই চোখ ধাঁধানো জড়োয়া নেকলেস! সবাই তাজ্জব।
বুড়ি হেসে কেঁদে বাঁচেন না! তারপর সকলের কাছে ক্ষমা চাইতে শুরু করলেন। বোঝা গেল, হারটা মোটেও খোওয়া যায়নি। ওটা ওঁর স্মৃতির ভুল। লকারের অন্য তাকে রেখেছিলেন। এই স্মৃতিভ্রংশের জন্য উনি ভীষণ লজ্জিত।
সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কর্নেল ওঁর হাত থেকে হারটা নিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু বুড়ি তখন প্রায় পাগল-হারানিধি ফিরে পেয়েছেন। পাত্তাই দিলেন না।
আমরা আবার ডাইনিং হল-এ নেমে এলুম। বেলা বারোটা তখন। লাঞ্চের এক ঘণ্টা দেরি। এখন মিসেস জেভিয়ারের আন্তরিক কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে কফি খেতে হবে বিনা দামে। বলা বাহুল্য, সবাই খুশি মনে কফি খেতে বসলেন।
কিন্তু আমার মন খারাপ করছিল। বেচারা রমার কথা ভাবছিলুম। কীভাবে পড়ে গেল সে রেলিং থেকে? রাখী আমার মনমরা ভাবটা টের পেয়ে বলল তুমি কিন্তু এখনও নার্ভাস হয়ে রয়েছ গৌতম?
-না, না। এমনি!
–এমনি নয়। কী ভাবছ, বলব?
বলো না?
রমার কথা।
হাসলুম। হয়তো ভাবছি। বেচারা ওভাবে মারা পড়ল!
দুঃখ নিশ্চয় হওয়া স্বাভাবিক। হ্যাঁ গো, যদি রমা না পড়ে আমি ওভাবে পড়ে যেতুম…
না, না! কী বলছ অলক্ষুণে কথা!
–আচ্ছা, হ্যাঁ গো, যদি রমা হতে রাখী–তাহলে এমন করে ভালবাসতে নিশ্চয়? বলল না!
-যাঃ! কী বলছ!
–আহা, বলোই না বাবা! যদি আমি অন্য কোনও মেয়ে হতুম, আর রমা হতো তোমার ভক্ত সেবিকা এবং প্রেমিকা!
যা হয়নি, তা নিয়ে ভাবি না, রাখী।
ভাবতে দোষ কী? তুমি তো সাহিত্যিক মানুষ। কত সব কল্পনা করতে পারো। এটা কল্পনা করে দেখ না কেন একবারটি।
–তুমি সামনে না থাকলে পারতুম রাখী।
–তাহলে রমাকে আমার মতোই আদর করতে? কাছে নিয়ে শুতে– চুমু খেতে?
যাঃ! শুনবে ওরা!
আচমকা আমার বাঁ দিক থেকে কর্নেলের সাড়া পেলুম-হ্যালো গৌতমবাবু! এই যে মিসেস চৌধুরী! এতক্ষণ কথা বলার ফুরসতই পাইনি। ট্যাবলেট খেয়ে ভাল ঘুম হয়েছিল তো?
বলতে বলতে কর্নেল এসে আমাদের পাশে বসে পড়লেন। রাখী সলজ্জ মুখে বলল–বসুন, বসুন কর্নেল। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। খুব ঘুমিয়েছি।
কর্নেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–সবই সুরাহা হলো। শুধু বেচারা রমা! ভেরি স্যাড রিয়্যালি!
রাখী বলল-হা, বেচারার জন্য কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা কর্নেল, আপনার কি মনে হয় সত্যি ওটা অ্যাকসিডেন্ট?
তাই বলছে পুলিস। রেলিং-এর ফাঁকে ওর শাড়ির একটা টুকরো আটকে রয়েছে। আর–ওর হাতের ব্যাগটাও ছিটকে পড়েছে-অবশ্য জলে পড়েনি, পাথরের ওপর পাওয়া গেছে ওটা। এসব দেখে পুলিস বলছে, অ্যাকসিডেন্ট। বৃষ্টিতে রেলিং ভীষণ পিছল ছিল। বসতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেছে।
আমি বললুম–আপনার ধারণা কী বলুন কর্নেল?
কর্নেল হাসলেন। আমার আর কী আলাদা ধারণা থাকবে?
-এটা খুন নয় তো?
–তেমন ক্লু তো পাওয়া যায়নি এখনও। অবশ্য মেয়েটির সত্যিকার পরিচয়। পুলিস উদ্ধার করতে পারলে সব বোঝা যেত।
রাখী ভুরু কুঁচকে বলল–সত্যিকার পরিচয়? তার মানে-ও কি রমা নয়, অন্য কেউ?
কর্নেল জবাব দিলেন–আমি ডেফিনিট নই। কিন্তু…
বললুম–কিন্তু?
–কিন্তু ওর মধ্যে কেমন একটা অপ্রকৃতিস্থ ভাব লক্ষ করেছিলুম। আমার স্বভাব, মানুষকে লক্ষ করা। অবশ্য আমার চোখের ভুল হতেও পারে। তাছাড়া ও আসে গত রাত্রে সাতটা দশের ট্রেনে।
–আমরাও তো ওই ট্রেনে এসেছি।
-তাই বুঝি? তা ও যখন নাম রেজিস্ট্রি করাচ্ছিল মিসেস জেভিয়ারের খাতায়, আমি কাছাকাছি ছিলুম। লক্ষ করলুম, নাম লেখবার সময় একটু ইতস্তত করল। আমার ওই এক কুঅভ্যাস। একটু পরে পাশে গিয়ে একটা অজুহাতে দাঁড়ালুম। দেখলুম আর লিখে ও হরফটা দুবার বুলিয়েছে–যেন অন্য কী হরফ লিখতে যাচ্ছিল–হয়তো অভ্যাসে।…অবশ্য সবই আমার ভাসা ভাসা ধারণা। এর পিছনে কোনও বাস্তব তথ্য নাও থাকতে পারে।
