রাখী চমকে উঠে বলল–সে কী! দরজা ভেজানো ছিল?
-হ্যাঁ।
রাখী ভুরু কুঁচকে কিছু ভেবে বলল–আমারই ভুল। ট্যাবলেট দুটোর ঘোর এখনও চোখ থেকে যায়নি। টলতে টলতে সোজা বাথরুমে ঢুকেছি। ভেবেছিলুম তুমি হয়তো ব্যালকনিতে বসে আছ।
কিন্তু যা হবার হয়েছে। এখন এটা নিয়ে কী করা যায়, দেখি। বরং কর্নেলের সঙ্গে পরামর্শ করে… ।
বাধা দিল রাখী!–উঁহু। ঠাণ্ডা মাথায় এটা ভাবা দরকার। আমার মনে হচ্ছে, এখন কেউ আমাদের কথা বিশ্বাস করবে না। পুলিস জানলেই আমাদের জড়াবে। তার ফলে একটা ভীষণ ক্ষতি হবে অন্তত আমার। কারণ, আমি মেয়ে–এবং একটা স্কুলের শিক্ষিকা। আমার চাকরি যাবে। কেলেঙ্কারি রটবে–এমনি করে, তোমার সঙ্গে বাইরে এসেছি বলে! রাখী বুদ্ধিমতী। ঠিকই তো। আমরা দুজনে গোপনে বেড়াতে এসেছি স্বামী স্ত্রী সেজে। রটলে রাখীর শুধু নয়, আমারও কি কম বদনাম হবে? তার ওপর সবচেয়ে সর্বনাশ হবে আমার বাড়িতে। সত্যিকার স্ত্রী ভদ্রমহিলা হিস্টেরিক মেয়ে। নির্ঘাৎ আত্মহত্যা করে বসবে। এ ব্যাপার ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করেও কতটুকু কাজ হবে? কারণ, সাহিত্যিক হিসাবে আমার খ্যাতি আছে। খ্যাতিমান লোকেদের কোন কিছু চাপা থাকে না। এক সময় ফঁস হয়ে যায়। খবরের কাগজের রিপোর্টাররা এ নিয়ে যা শুরু করবে, তা ভাবতেই আমার গা হিম হয়ে গেল।
বললুম–হা, ঠিকই বলেছ রাখী। আমরা এখন অজ্ঞাতবাসে এসেছি। কর্নেলকে জানানো মানেই পুলিসকে জানানো। ব্যাপারটা সহজে হয়তো মেটার বা চেপে দেওয়ার একটা চান্স ছিল কিন্তু তা আর নেই। কারণ সেই বেপাত্তা রমা রায়ের লাশ পুলিস খুঁজে পেয়েছে!
অমনি রাখীর মুখটা আবার আতঙ্কে ছাই হয়ে গেল। সে রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠল–সে কী! সেই মেয়েটি খুন হয়েছে?
–হ্যাঁ। ব্যালকনিতে গেলেই দেখতে পাবে। ওর ঘরের নীচের খাড়ি থেকে লাশটা তোলা হয়েছে।
রাখী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কোনও কথা বলতে পারল না।
বললুম–কাজেই এই হারটা খুব সহজ হার নয়। খুনের সঙ্গে তার বাস্তব যোগাযোগ থাক বা নাই থাক, এখন আপাতত দুটো একসুত্রে জড়িয়ে গেছে। তুমি ঠিকই বলেছ, হারটা আমরা দিতে গেলেই জড়িয়ে যাব!
রাখী অস্ফুটস্বরে বলল–এ কী বিপদে পড়লুম আমরা।
ওকে আশ্বস্ত করার ক্ষমতা নেই। তবু বললুম–আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে। তাহলে উদ্ধার পাওয়া সম্ভব হবে। তুমিও ভাব, কী করলে ভাল হয়।
একটু পরে রাখী বলে উঠল–এক কাজ করা যেতে পারে। হারটা যে কোনও ভাবে পাচার করা। বরং ওটা ব্যালকনি থেকে এক্ষুণি সমুদ্রের জলে ফেলে দাও।
-এখন চারদিকে পুলিসের চোখ, রাখী!
রাখী ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে বলল–তাহলে…তাহলে ওটা এবাড়ির মধ্যে কোথাও ফেলে রেখে এস।
–তা সম্ভব। কিন্তু কয়েক লাখ টাকা দামের জিনিস এটা। যদি অন্য কেউ হজম করে দেয়? আমাদের বিবেক তত আছে, রাখী! মিসেস জেভিয়ারের এই সম্পদ তো শুধু টাকার জিনিষ নয়!
–হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ! আহা বেচারা!
–একটা কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু সেটায় রিস্ক আছে।
কী, কী?
–হারটা ম্যাডামের হাতের নাগালে রেখে দেওয়া।
–কোথায় রাখবে?
–ভাবছি।
-শোনো, এক কাজ করা কিন্তু অনেকটা সহজ। ওপরে ওঁর যে ঘর থেকে এটা চুরি গিয়েছিল, সেখানেই রেখে আসা।
–কিন্তু সেখানে তো তালা আটকানো।
কপাট বা অন্য কোথাও ফোকর থাকা সম্ভব। গলিয়ে দিলেই তো ঝামেলা চুকে গেল। তাই না? ম্যাডাম ভাববেন, চোর ভয়ে ফেরত দিয়েছে। হজম করতে পারেনি।
ঘামতে ঘামতে বললুম–তাহলে তা এখনই করতে হয়। তুমি সিঁড়ির মুখে দাঁড়াও। ম্যাডাম এখন নীচে আছেন! আমি কোনও কায়দায় তিনতলায় ঝটপট গিয়ে এটা পাচার করে আসি।
রাখী হঠাৎ একটু হাসল–হাসিটা অবশ্য খুবই করুণ। বলল–হ্যায় সাহিত্যিক। তোমার প্রেমের মূল্য হয়তো এভাবে শোধ দিতে হচ্ছে!
ওর একথায় আপ্লুত হলুম। উঠে দাঁড়ালুম। আমার পা থরথর করে অবশ্য কাঁপছে। মাথা টলমল করছে।
পা বাড়াতেই রাখী উঠে দাঁড়াল। ওর মুখে একটা দৃঢ়তার ছাপ ফুটে উঠল। ফিসফিস করে বলে উঠল সেনা, না! তোমাকে অমন ভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া যায় না। আমি তা প্রাণ থাকতে হতে দিতে পারব না। তুমি দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তোমার মর্যাদার দাম কে দিতে পারে! ওগো, তুমি যেওনা। জীবনে তোমার এখনও কত কী দেবার আছে মানুষকে? তার চেয়ে আমি তো সামান্য অজ্ঞাতকুলশীল মেয়ে–আমার কিছু ঘটলেও কিছু যায় আসে না। শোনো, আমার কথা শোনো তুমি!
রাখীকে আবেগে উচ্ছসিতা দেখলুম। এই সেই সত্যিকার রাখী, ঠিক কণ্ঠস্বর তার চিঠিতে পেয়ে এসেছি বরাবর। আবেগময়ী প্রেমিকা মেয়ে সে। আমি ওর চিবুক ধরে চুমু খেলুম। বললুম–না। তুমি অসামান্যা, রাখী। তুমি মেয়ে বলেই তোমার মর্যাদা আমার চেয়ে বেশি।
না, না! ওগো, তা নয়। তোমার পায়ে পড়ি, তুমি যেও না!
তবে কে যাবে?
রাখীর নাসারন্ধ্র কাঁপছিল। তার মুখে ফুটে উঠেছে এক দৃপ্ত দৃঢ়তা। এদেশের মেয়েরা হয়তো এমনি করেই প্রেমিকের সম্মানে আত্মদান করতে যায়। সে বলল আমি যাব। আমিই রেখে আসব। ভেবো না–মেয়েরা এমন অনেক কিছু পারে, যা পুরুষেরা কল্পনাও করতে পারে না। তুমিই তো একথা কত উপন্যাসে লিখেছ?
তুমি যাবে?
হ্যাঁ। তার আগে তুমি বাইরেটা ভাল করে দেখে এস। তারপর তুমি কাশলে আমি বেরোব। তুমি বাঁদিকে নীচে যাবার সিঁড়ির মুখে দাঁড়াবে। কেউ এলে খুব জোরে কাশবে। আমি করিডরে ডাইনে তেতলার সিঁড়িতে উঠব। তোমার দ্বিতীয়বার কাশি শুনলে নেমে আসব। কেমন? আর কেউ না এলে তুমি চুপচাপ থাকবে। মনে রেখ।
