–দেখেছি। কিন্তু রমা হঠাৎ ডাইনিং থেকে উঠে এসে ওভাবে বসতে যাবে কেন রেলিং-এ?…অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই প্রশ্নটা তুললুম। কারণ, আমি ঘটনাটায় গুরুত্ব চাপিয়ে ওকে আঁচ করাতে চাইছিলুম যে যত সহজে ভাবছ উড়িয়ে দেওয়া যাবে, তত সহজ এটা নয়। অবশ্য ওকেই আমি অপরাধী ভেবেছি, তাও নিঃসংশয় নই। শুধু কেমন-কেমন লাগছে মাত্র।
আমার প্রশ্ন শুনে গুঁফো সেন সায় দিয়ে বলল–ঠিক, ঠিক। ওটাই ভাইটাল কথা! তবে এমনও হতে পারে, খাবার দেরি দেখে বিরক্ত হয়ে চলে গিয়েছিল রমা এবং রেলিং-এ বসেছিল!
সবই সম্ভব! তবে খুব জোরাল যুক্তি এতে নেই!
–তা তো নেই-ই। কিন্তু ওকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে কেন?
আমরা তো পিছনের ঘটনা কিছু জানি না। ওর শত্রু থাকতে পারে।
নিশ্চয় পারে। কিন্তু যার শত্রু আছে, সে দরজা খোলা রেখে একা এইভাবে অন্ধকারে ব্যালকনিতে গিয়ে শত্রুকে সুযোগ দিল?
লোকটি যে ধুরন্ধর, তাতে সন্দেহ রইল না! ওর প্রশ্নে যুক্তি আছে। বললুম– হ্যাঁ, সেও একটা পয়েন্ট। দ্বিতীয়ত মিসেস্ জেভিয়ারের হার চুরির ঘটনা।….
কথা কেড়ে সেন বলল–হ্যাঁ, হার চুরি। দুটো প্রায় একই সময়ে ঘটেছে। আপনি কি মনে করেন দুটোর মধ্যে কোনও লিঙ্ক আছে?
থাকতে পারে। হয়তো রমা চোরকে মুখোমুখি দেখেছিল এবং তার ফলে তাকে মরতে হয়েছে।
সেন সোসাহে বলল–চমৎকার যুক্তি! জানেন, ওই কর্নেল ভদ্রলোকও তাই মনে করেন। পুলিসও তাই ধরে নিয়েছে। হাজার হলেও আপনারা সাহিত্যিকরা অর্ডিনারি ব্রেন তো নন!
সে সপ্রশংস তাকাল আমার দিকে। কিন্তু ওর চাউনিটা পছন্দ করছিলুম না। গায়ে পড়ে এমন ভাব করতে চায় কেন সে? তাছাড়া আমাদের ঘরের দরজায় ওকে দেখলুম, যদি চোখের ভুল না হয় তার কারণটাই বা কী? সেই সময় চকিতে মনে পড়ল, গতরাতে রাখীর মুছা যাবার সময় সে আমাদের ঘরে ঢুকেছিল–মোম জ্বেলে দিয়েছিল। তখন আবছা ভাবে মনে হয়েছিল, নোকটা যেন আমাদের ঘরের প্রতি কোনও অজানা কারণে আগ্রহী। কেন এই ধারণা মাথায় এসেছিল তখন? এটা ইনটুইশানের মতো।
সেন আরও দু-একটা কথা বলে চলে গেল। আমি ঘরের দরজা ঠেললুম। যেমন ভেজিয়ে রেখে বেরিয়েছিলুম, তেমনি রয়েছে। কিন্তু খাটে রাখী নেই। বাথরুমে জলের সব্দে তার সাড়া পেলুম। কী বোকা মেয়ে! দরজাটা বন্ধ আছে কী নেই দেখেনি! এবার আমাদেরই কিছু চুরি গেল না তো? প্রেমিকারা এমনি সরল গোবেচারা হয়!
প্রথমে চোখ পড়ল রাখীর ভ্যানিটি ব্যাগটার দিকে। সেটা গতরাত থেকে ওর বালিশের পাশে রয়েছে। সেই মুহূর্তে চমকে উঠলুম। ব্যাগের মুখটা খোলা একটা ভাঁজকরা কাগজ উঁকি মেরে রয়েছে। ব্যস্ত হয়ে ব্যাগটা ফাঁক করলুম। সর্বনাশ! নির্ঘাৎ কিছু, চুরি গেছে। রাখী শোবার সময় হাতের সোনার কাকন দুটো খুলে ওতে ঢুকিয়ে রেখেছিল মনে পড়ছে।
কাগজটা কিন্তু আমারই লেখা চিঠি। রাখী সঙ্গে এনেছে তাহলে! ওর কাকন খুঁজতে–যদিও ওর ব্যাগে হাত ভরা উচিত নয়–এই অনধিকার চর্চা করতে হলো, কারণ আমিই তো এখন ওর গার্জেন।
টুকিটাকি কাগজপত্র, প্রসাধনী, রুমাল কিন্তু কাকন জোড়া কই? রুমালটা তুলতেই বুকে জোর এল। এই যে রয়েছে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই আমার চোখ ঝলসে গেল। মাথা ঘুরে উঠল। কয়েকটা সেকেণ্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম। রুমালের তলা থেকে একটা নেকলেস যন্ত্রের মতো টেনে তুললুম। হা-হীরেরই নেকলেস।তা না হলে এত উজ্জ্বল সাদা হতে পারে না। সাদাসিদে নেকলেস নয় রীতিমতো জড়োয়া হার!
কোথায় পেল এ হার রাখী? এটাই সেই চুরি যাওয়া নেকলেস ম্যাডাম জেভিয়ারের? থরথর করে কাঁপতে থাকলুম। রাখীই কি….কিন্তু না–তা তো অসম্ভব। রাখীর মতো একজন সাদাসিধে নিরীহ মেয়ে সুশিক্ষিতা, সংস্কৃতিমতী, মার্জিত রুচির মেয়ে–যে শুধু ভালবাসা ছাড়া, সৌন্দর্য ও শিল্প ছাড়া জীবনে কিছু শ্রেয় ও প্রেয় মনে করে না–সে হার চুরি করবে কেন? গতকাল থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত এই তেইশটি ঘন্টায় ওর যা পরিচয় পেয়েছি, তাতে ওকে কিছুতেই ক্রিমিনাল চরিত্রের মেয়ে বলে ভাবা যায় না। তাহলে যা চোখের ভুল ভেবেছি, তাই ঠিক। ওই সেন ব্যাটাই খুনে ডাকাত। সে রাখীর ব্যাগে হারটা পাচার করে গেল এইমাত্র। হয়তো হজম করতে পারল না–তাই।
হারটা হাতে নিয়ে অবশ হয়ে বসে আছি, এমন সময় রাখী বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল হাসিমুখে ক্ষণে সে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল–ও কী? ওটা কী?
আড়ষ্টস্বরে বললুম–হীরের নেকলেস।
রাখী আমার পাশে লাফিয়ে এসে বসল। রুদ্ধশ্বাসে ভয়ার্ত গলায় বলল হীরের নেকলেস! এ কোথায় পেলে তুমি? কার নেকলেস?
–সম্ভবত মিসেস জেভিয়ারের সেই চুরি যাওয়া নেকলেস। তোমার ব্যাগের মুখ ভোলা দেখে সন্দেহ হয়েছিল, তারপর দেখি ওতে ভরা আছে।
রাখী কেঁদে ফেলল তখুনি। সে কী! কে রাখল ওখানে? হা গো, আমার গায়ে হাত দিয়ে তুমি বলোতুমি বলো আমার গা ছুঁয়ে–তুমি…
অবাক হয়ে বললুম–রাখী! কী বলতে চাও তুমি? আমি হার চুরি করেছি?
রাখী আমার বুকে ভেঙে পড়ল! না, না, না। তুমি সাহিত্যিক, তুমি শিল্পী তুমি কেন তা করবে? ছি ছি ছি! আমার মনে এখনও পাপ আছে গো? আমায় ক্ষমা করো, ক্ষমা করো তুমি। বলল, ক্ষমা করেছ? বলো!
তার মাথাটা এবার আমার পায়ে পড়ার উপক্রম হলো। ব্যস্ত হয়ে ওকে দুহাতে চেপে ধরে সামলে নিলুম। বললুম–না, রাখী। তোমার স্বাভাবিক সংশয় তুমি প্রকাশ করেছ মাত্র। কিন্তু আমি ভাবছি, অন্য একটা কথা। দরজাটা ভেতর থেকে লক না করে তুমি বোকার মতো বাথরুমে ঢুকেছিলে, আর চোর সেই সুযোগে ঘরে ঢুকে এটা পাচার করে গেছে।
