বললুম–মিসেস জেভিয়ার হঠাৎ কীভাবে টের পেলেন যে ওঁর নেকলেস খোয়া গেছে?
–ভদ্রমহিলা যেমন কর্মঠ, তেমনি অভিজ্ঞ। বুদ্ধি ওঁর প্রখর। ডিনার টেবিলে রমা নেই–অথচ আপনার ঘরের দরজায় ওই কাণ্ড হলো, তবু ওকে দেখা যায়নি। তাছাড়া বোর্ডারদের সম্পর্কে খোঁজখবর তো মিসেস জেভিয়ারকে রাখতেই হয়। বেয়ারা দিয়ে খাবার পাঠালেন ঘরে। বেয়ারা ফিরে এসে জানাল–দরজা খোলা কিন্তু ঘরে কেউ নেই। এমনকি কোনও জিনিসপত্রও নেই ওর। অমনি স্বভাবত মিসেস জেভিয়ারের মনে সন্দেহ হলো। তারপর…
-কিন্তু আশ্চর্য! রমা পালাল কোন পথে?
–সেটাই বুঝতে পারছি না। যেতে হলে এই সিঁড়ি দিয়েই ওঁকে যেতে হবে।
গুঁফো লোকটি বলল–তখন আমরা সবাই এই ভদ্রলোকের স্ত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত। এঁর ঘরে ঢুকে গেছি। তখন সে কেটে পড়েছে।
কর্নেল বললেন–এও একটা পয়েন্ট বটে। কিন্তু নীচে নামলে বেয়ারা আর দারোয়ানের চোখে না পড়েই পারে না। তারা বলছে, কেউ বেরিয়ে যায়নি।
দারোয়ানদের কথা ছাড়ুন স্যার! ব্যাটারা গাঁজাখোর। তখন তো লোডশেডিং –অন্ধকার। ওরা কি টের পাবে নাকি? তার ওপর বৃষ্টি। ঘরে ঢুকে বসেছিল সব।
হাতে টর্চ ছিল। হেরিকেনও জ্বেলে নিয়েছিল লোডশেডিং শুরু হতেই। অবশ্য, তাতেও রমার পালাবার সন্স থাকে। রাউট রাইট মিঃ সেন। আপনার যুক্তি অগ্রাহ্য করা কঠিন। কিন্তু..
–কোনও কিন্তুর ব্যাপার নেই। পুলিসে খবর গেছে। দেখবেন, স্টেশনেই ধরা পড়ে যাবে!
আরও একটা আলোচনার পর আমি নিজের ঘরে ফিরে এলুম। রাখী আমার প্রতীক্ষায় উত্তেজিত মুখে বসেছিল। বলল–কী ব্যাপার? কী হয়েছে?
সব বললুম–! শুনে রাখী আরও ভয় পেয়ে গেল। রুদ্ধশ্বাসে বলল–আমার ইনটুইশান বলছিল কিছু সাংঘাতিক ব্যাপার ঘটছে। ওগো, তুমি খাটটা সরিয়ে নিয়ে এস। আমরা পাশাপাশি শোব…
.
বেড-টি দিয়ে গেল ভোর সাড়ে ছটায়। রাখী তখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে জাগালুম না। কর্নেল দুট ট্যাবলেট দিয়েছিলেন খেতে। তাই অত ঘুম। আমি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম।আমার চোখ জ্বালা করছিল। একটুও ঘুম হয়নি। রাখী জেগে থাকলে নিশ্চয়ই ওর শরীরের সঙ্গে কিছু একটা শারীরিক ব্যাপার ঘটে যেত কিন্তু বিবেক আর শালীনতা অথবা চিরকালের ভীরুতা আমাকে সংযত রেখেছিল। রাখীকে মনে হচ্ছিল, ঝড়ে ক্লান্ত এক ছোট্ট সুন্দর পাখি। সে আকাতরে ঘুমোচ্ছে যখন–ঘুমোক। ওকে বিরক্ত করব না। বিরক্ত করিনি। বরং সাবধানে দূরত্ব নিয়ে শুয়েছিলুম–যাতে আমার মনের অন্ধ কামনা বাসনা ওই অবস্থাতেই হঠকারী কোনও ঘটনা না। ঘটিয়ে ফেলে।
আকাশ আজ পরিষ্কার। সূর্যোদয় দেখলুম। রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়াতেই নিচে বাঁদিকে চোখ পড়ল। চমকে উঠলুম। দেখি, খাকি উর্দি পরা পুলিসদল, আর কর্নেল দাঁড়িয়ে আছেন একটা পাথরের ওপর। পিছনে আরও একটা ভিড় রয়েছে। এবং কজন জেলে ধরনের আধন্যাংটা লোক জাল দিয়ে নীচে থেকে কী যেন টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করছে।
তক্ষুনি ভেতরে এসে দরজা আস্তে খুলে বেরিয়ে গেলুম।
ডাইনিং হলে দুজন কনস্টেবল বসে রয়েছে। মিসেস জেভিয়ারকে দেখতে পেলুম না।
বাইরে রাস্তায় গিয়ে একজনকে পেলুম। তাকে জিগ্যেস করলুম–ওদিকে পুলিশ কেন অত?
লোকটা নিরাসক্ত গলায় জবাব দিল–যাকে দেখিয়ে না। কুছ অ্যাকসিডেন হুয়া জুরুর। যাইয়ে–দেখিয়ে! কই বড়া মছলি পাকড়া, মালুম।
বাড়ির উত্তর ঘুরে পাথুরে সরু পথ ধরে কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল, জালটা টেনে ওপরে ভোলা হয়েছে। ভিড় ঘিরে ধরেছে।
কাছে গিয়ে আমার চোখ দুট নিষ্পলক হয়ে উঠল। জালে যা তুলেছে, তা একটি বডি। এবং ডেডবডিলাশ!!
সেই লাশটার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট চিৎকার করে উঠলুম–কে ও?
কর্নেল চাপাস্বরে বললেন রমা রায়। দ্য পুওর গার্ল!
রমা! সেই মেয়েটি! কীভাবে সমুদ্রে পড়ল?
কর্নেল জবাব দিলেন–ওর ঘরের ব্যালকনি থেকে।
–অ্যাকসিডেন্ট?
–কে জানে! কেউ ধাক্কা মেরে ফেলে দিতেও পারে।
আঁতকে উঠলুম। ফিকে নীল শাড়িটা জড়িয়ে আছে গায়ে-রমার মুখে আতঙ্কের চিহ্ন নোনা জলেও মুছে যায়নি। প্রায় হাঁফাতে হাঁফাতে পালিয়ে এলুম।…
সিঁড়িতে ওঠার সময় অন্যমনস্ক হয়ে ছিলুম। শেষ ধাপে উঠলে আমাদের ঘরটা ডাইনে সামনে পড়ে এবং কোনও বাধা না থাকায় দরজাটা স্পষ্ট দেখা যায়। আমার অন্যমনস্কতা কেটে গেল। সেই গ্রুফো ভদ্রলোক যেন এইমাত্র আমাদের দরজা থেকে সরে আসছে, এমন কি পর্দাটাও স্পষ্ট নড়ে ওঠা দেখেছি। প্রথম মুহূর্তের চমক কাটলে ব্যাপারটা চোরে ভুল বলে সন্দেহ করলুম।
এই লোকটাকে কর্নেল সাহেব মিঃ সেন বলে সম্বোধন করছিলেন। আমার সামনে এসে সে একটু হাসল। হাসিটা অপ্রস্তুত ও হতচকিত মানুষের যেন।–এই যে মিঃ চৌধুরী। দেখে এলেন নাকি?
গম্ভীর হয়ে পড়েছিলুম নিজের অজান্তে। বললুম–হ্যাঁ।
সে অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করল যেন। বলল–কিন্তু কী মারাত্মক ঘটনা বলুন তো! আমি তো গত পাঁচ-ছ বছর ধরে জেভিয়াস লজে আছি। এমন বীভৎস কাণ্ড কখনও ঘটতে দেখিনি! আচ্ছা, আপনারা সাহিত্যিকরা তো খুব পাওয়ার অব অবজার্ভেশনের অধিকারী। দেখে কী মনে হলো বলুন তো?
উত্তেজনা দমন করে বললুম–কী মনে হবে? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
সেন চাপা গলায় বলল, বোঝার সমস্যা নিশ্চয়। প্রথম ধরুন, এটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলেও মনে হতে পারে। রমার ব্যালকনির নিচেই খাড়ি এবং গভীর জল। আনমনে রেলিং-এ পা ঝুলিয়ে বসলে পড়ে যাবার চান্স আছে! সম্প্রতি বোম্বেতে ফিল্ম প্রডিউসার ভদ্রলোকের বাড়ি থেকে এভাবেই তো এক অভিনেত্রী শাবানা সমুদ্রে পড়ে গেছেন। খবরের কাগজে দেখেননি?
