দরজায় কেউ নক করল। অমনি রাখী চোখ খুলে উঠে বসল। ব্যস্তভাবে বললনা, না। দরজা খুলল না। আমার ভয় করছে!
বাইরে থেকে সাড় এল–খানা সাব!
তখন দরজা খুলে দিলুম। বেয়ারা ট্রেতে রাতের খাবার রেখে গেল। কোণের টুলে জলের কুঁজো আর গ্লাস দেখিয়ে দিয়েও গেল।
এবার রাখীকে প্রশ্ন করলুমকী হয়েছিল বলো তো? হঠাৎ কী দেখে ভয় পেয়েছিলে?
রাখী আমার কাছ ঘেঁষে এসে চাপা গলায় বলল–তুমি যাবার পর শাড়ি বদলে নিয়ে বেরোতে যাচ্ছি, হঠাৎ দরজায় কে নক করল! বললুম– কে? সাড়া নেই। একটু ভয় পেলুম! কিন্তু ভাবলুম হয়তো তুমিই দুষ্টুমি করছ। দ্বিতীয়বার নক করার সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুললুম। কিন্তু করিডোর ফাঁকা। কেউ কোথাও নেই। অমনি ভীষণ ভয় হলো। কিছুতেই একা ওই পথটুকু পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে যাবার সাহস হলো না। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ভাবলুম–চুপচাপ বসে থাকি। দেরি দেখলে তুমি নিশ্চয় আসবে। তখন দুজনে একসঙ্গে বেরোব। কিছুক্ষণ পরে আবার দরজায় কে নক করল। এবার ভাবলুম, নিশ্চয় তুমি আমার দেরি দেখে চলে এসেছ। তবু জিজ্ঞেস করলুম-কে? যে নক করছিল, সে বলল–আমি!
কী আশ্চর্য!
হ্যাঁ! শুধু আমি বলল। মনে হলো তোমার গলা। তখন গিয়ে দরজা খুলে দিলুম। কিন্তু দরজা খুলেই আমি আবার অবাক। কেউ কোথাও নেই। আর সঙ্গে সঙ্গে আলো নিভে গেল। তখন….
রাখী প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত চেপে ধরল। ফিসফিস করে। ফের বলল–তখন, বিশ্বাস করো–মনে হলো, কী একটা ঠাণ্ডা শরীর তামাকে চেপে ধরেছে হঠাৎ। অমনি চেঁচিয়ে উঠলুম। তারপর কী হলো কিছু মনে নেই!
ওর কথার মধ্যে সরলতা এত বেশি যে অবিশ্বাস করার কিছু নেই। ভয়ে। আড়ষ্ট হলুম। তাহলে কি সত্যি ভূতপ্রেত বলতে কিছু আছে? পরক্ষণে মনে। হলো-রাখীর মনের ভুলও হতে পারে।
হাসতে হাসতে বললুম–তুমি বড্ড অনুভূতিপ্রবণ মেয়ে তো! তাই বৃষ্টির রাতে সমুদ্র তীরের বাড়িতে এটা ঘটেছে। আসলে বাতাস বইছে জোরে। তাই দরজায় শব্দ হয়েছে। আর বৃষ্টির বাতাস তো বেশ ঠাণ্ডাই। আচমকা একটা ঝাপটানি এসে গায়ে লাগতেই ভেবেছ, কেউ চেপে ধরল।
রাখী বলল–তা নয়। আমি স্পষ্ট নক করতে শুনেছি। আর ওই আমি বলাটা? নিশ্চয় কেউ বদমাইশির তালে ছিল। সাহস পায়নি। পাশের ঘরে ঢুকে পড়েছিল।
তাও আশ্বস্ত হওয়া গেল, রাখীর ভয়টা ভূতের নয় তাহলে কোনও লম্পট বদমাইশের। বললুম–আমার সামনে শাড়ি বদলালে এসব হতো না!
রাখীর মুখ লজ্জায় রাঙা হলো–যাঃ! আমি তা পারি না।
ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে এবার চুমু খেলুম। ও ছাড়িয়ে নিয়ে বলল–এস, খাওয়াটা সেরে নিই আগে….
.
সে রাতে যখন শুতে যাচ্ছি, তখন ঘড়িতে নটা তিরিশ। এত সকালে ঘুমানো সম্ভব নয়। তাই দাখীর সঙ্গে প্রেমিকসুলভ কথা বলছি আর সিগারেটের পর সিগারেট খাচ্ছি। এই সময় মনে হলো, বাইরে কারা সব ব্যস্তভাবে চলাফেরা করছে! তখন বৃষ্টি অনেকটা কমেছে, কিন্তু লোডশেডিং চলছে। আমাদের টেবিলে মোমের আলো জ্বলছে। বাইরের চাপা শব্দে কৌতূহলী হলুম। উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছি, রাখী বাধা দিয়ে বলল–যে যা করছে করুক। দরজা খুলল না।
সরে এসে আবার বসলুম। কিন্তু নাবাইরের চলাফেরা ও কথা বলার চাপা আওয়াজ থামল না। নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে।
কয়েকমিনিট পরে রাখীর নিষেধ না মেমে দরজা খুললুম। উঁকি মারতেই দেখি, করিডরে মিসেস জেভিয়ার শশব্যস্তে ওদিকে কোথায় চলেছেন। তার সঙ্গে আলো হাতে দুজন বেয়ারা দৌড়ে চলেছে। তারপর সিঁড়ির মুখ থেকে কর্নেলের ভারি গলার আওয়াজ পেলুম–আপনি তাহলে ওকে করিডোরে দেখেছিলেন মিঃ সেন?
ঠাহর করে দেখি সেই গুফো লোকটি টর্চ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কর্নেলের সামনে। কী ব্যাপার? দরজা খুলে বেরিয়ে গেলুম ওঁদের দিকে।
আমাকে দেখে কর্নেল বললেন-এই যে গৌতমবাবু। আসুন, আসুন। আপনাকে ডিসটার্ব করতে চাইনি। ইয়ে–একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে।
চমকে উঠলাম। অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল মাথার চুল। ব্যস্তভাবে বললুম– কী হয়েছে কর্নেল?
কর্নেল গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন মিস রমা রায় নামে একটি মেয়ে আজ সন্ধ্যায় এই লজে আসে। রাত আটটা দশ অব্দি মেয়েটিকে ডাইনিং হলে দেখেছি আমরা। তার রুম নাম্বার আঠারো। কিন্তু আশ্চর্য, তার পাত্তা নেই। আর…
বাধা দিয়ে বললুম–হা, হ্যাঁ। আমার ডাইনের দুটো টেবিলের ওদিকে একা বসেছিল–সেই তো! রোগা ছিপছিপে চেহারা ফিকে নীল শাড়ি?
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। সেই। তবে তার চেয়ে সাংঘাতিক ঘটনা হচ্ছে তিন তলায় মিসেস জেভিয়ারের ঘর থেকে একটা দামী জিনিস হারিয়েছে। যার দাম অন্তত লাখ তিনেক হবে।
–সে কী! সর্বনাশ!
-হ্যাঁ, একটা জুয়েল নেকসেল। ওপরের ঘরে মিসেস জেভিয়ার আজকাল থাকেন না। ওঁর জিনিসপত্র থাকে। উনি ভেবেছিলেন, যেহেতু অত দামী জিনিস, তাই ওঘরে আর সব অকেজো জিনিসের মধ্যে এটা রাখলে চোরডাকাতের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব হবে না। সচরাচর দামী জিনিস লোকে নিজের শোবার ঘরেই রাখে। অথচ, কী আশ্চর্য ব্যাপার–চোর কীভাবে তা টের পেয়েছিল এবং সুযোগমতো হাতিয়েছে!
গুঁফো লোকটি বলল–এবং হাতিয়ে কেটেও পড়েছে।
আমি বললুম–এর সঙ্গে মিস রমা রায়ের বেপাত্তা হওয়াটা খুব অদ্ভুত লাগছে কিন্তু!
কর্নেল বললেন–ঠিকই বলেছেন গৌতমবাবু। হঠাৎ সে বেপাত্তা হলো কেন? যাক গে–এসব পুলিসের ব্যাপার। পুলিশ এসে যা হয় করুক।
