দেখিনি–তবু মাথা দোলালুম। ভদ্রমহিলার আচরণ মায়ের মতো। সহজে হৃদয় গলে যায়।
আরও কিছু কথা বলে উনি চলে গেলেন। তখন লক্ষ্য করলুম, সেই একলা বাঙালী মেয়েটি নেই। কখন হয়তো ওপরে উঠে গেছে।
কিন্তু আট মিনিটের জায়গায় দশ মিনিট হলো, তখনও ডিনার এল না, রাখীও না, অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়ালুম। মিসেস জেভিয়ার কিছু বলার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করলেন আবার–কিন্তু বললেন না। আমি সিঁড়িতে কয়েক ধাপ সবে উঠেছি, হঠাৎ রাখীর চিৎকার শুনলুম যেন চিৎকারটা হঠাৎ বেখাপ্পাভাবে থেমে গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল। তারপর কার সঙ্গে ধাক্কা লাগল আমার। উঠেই চেঁচিয়ে ডাকলুম রাখী! রাখী!
মাত্র কয়েকটি সেকেণ্ডের মধ্যে এসব ঘটল। আমার সঙ্গে যার ধাক্কা লেগেছিল, সে যেন নীচে নেমে গেল। নীচে মিসেস জেভিয়ারের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনলুম হীরা সিং! মোম জ্বালাও। জলদি মোম জ্বালাও।
ওপরের করিডোরে ঘন অন্ধকার। আবার ডাকলুম রাখী! রাখী! আমার গলা শুকিয়ে গেছে–অজানা ভয়ে প্রচণ্ড কাঁপছি। দেশলাই আছে, তাও ভুলে বসেছি। কেবল বেমক্কা ঘড়ঘড়ে গলায় ডাকছি রাখীকে। নিজেদের ঘরও চিনতে পারছিনে।
সেইসময় করিডরের শেষদিকে দরজা খুলে কে বেরোল। তার হাতে টর্চ জ্বলে উঠল। সেই আলোয় দেখলুম, আমার ঘরের দরজার সামনে রাখী অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে। লাফিয়ে গিয়ে রাখীর মাথাটা তুলে বোকার মতো চেঁচালুম-ডাক্তার! ডাক্তার!
টর্চের আলোটা কাছে এসে গেল। কে বলে উঠল–ও কী! হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে নাকি? কী ব্যাপার?
মনে হলো, সেই রুক্ষ চেহারার ফো লোকটিই। রুদ্ধশ্বাসে বললুম–প্লীজ একটু জল আনুন না দাদা! আমাদের রুমেই পেয়ে যাবেন।
ততক্ষণে সিঁড়িতে পায়ের শব্দ তুলে কারা সব উঠে আসছে। তারপর মোমের আলো হাতে বেয়ারা, মিসেস জেভিয়ার আর কারা এসে পড়লেন। ভিড় জমে গেল। রাখীকে আমি আর কে যেন ধরল। তুলে নিয়ে ঘরে ঢোকালুম। ঘরে ঢুকে দেখি, সেই ফো ভদ্রলোক দেশলাই জ্বেলে টেবিলের মোমটা ধরাচ্ছেন।
ঘরে স্বভাবত ভিড় হলো। রাখীর মুখে জল ছিটিয়ে দিতেই সে জ্ঞান ফিরে পেল। চোখ খুলে শশব্যস্তে উঠে বসতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু মিসেস জেভিয়ার… বাধা দিলেন–চুপ করে শুয়ে থাকো ডার্লিং। প্লীজ। অন্তত মিনিট দশেক। তারপর কোনও কথা।
এবার দেখলুম, টেকো মাথা দাড়িওলা বুড়ো ভদ্রলোকটিও আমাদের রুমে এসেছেন। ভুরু কুঁচকে রাখীর দিকে তাকিয়ে আছেন। মিসেস জেভিয়ার ওঁর দিকে তাকিয়ে বললেন–চলুন কর্নেল, আমরা একে সুস্থ হতে সময় দিই। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন–থাক বাছা, তোমাদের আর কষ্ট করে নীচে যেতে হবে না। এখানেই ডিনার খাবে। আর, দেখো–একে বেশি নাড়াচাড়া করতে দিও না। মনে হচ্ছে, হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় ভয় পেয়েছিল। এ খুবই স্বাভাবিক। কর্নেল, আপনার মনে পড়ছে, সেবার এক ভদ্রমহিলা তো প্রতিরাত্রে সমুদ্রে ভূত দেখে চেঁচামেচি করতেন!
বুড়ো লোকটি তাহলে কোনও কর্নেল–তবে পোশাক ও বয়স দেখে মনে হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। উনি চাপা হাসলেন। হাসিটা খুবই ভদ্র আর অমায়িক। মুহূর্তে ভালো লেগে গেল আমার।
মিসেস জেভিয়ার ফের হেসে বললেন–ও নো নো! অফ কোর্স এটা কোনও ভূতের বাড়ি নয়। সবাই তা জানে। তোমরা মিছিমিছি ভয় পেয়ো না–আসলে অনেকের নার্ভের অসুখ থাকে-হ্যালুসিনেশা দেখে তারা।
উনি বেরোলেন প্রথমে। তারপর গুফো লোকটি গেল। তার পেছনে অবাঙালী দম্পতি। বেয়ারা পিছনে মোমের আলো হাতে এগোল।
কর্নেল ভদ্রলোক তখনও দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললুম–বসুন স্যার!
কর্নেল হাত তুলে মিঠে গলায় বললেন–ধন্যবাদ ইয়ংম্যান। আমার নাম কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। থাকি কলকাতায়। আর ইয়ে…
চমকে উঠে বললুম–কী কাণ্ড! আপনি কি সেই প্রখ্যাত কর্নেল সরকার প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার? এই তো সেদিন খবরের কাগজে আপনার আরেক কীর্তির কথা পড়লুম! কী সর্বনাশ! রাখী, আমাদের কী সৌভাগ্য। পরিচয় করিয়ে দিই।
রাখী ক্লান্তভাবে চোখ বুজল! তখন নিজের পরিচয় দিলুম–আমি গৌতম চৌধুরী। সামান্য সাহিত্যচর্চা করে থাকি।
কর্নেল ব্যস্ত হয়ে বললেন-সামান্য কী অসামান্য আমি জানি। গৌতম চৌধুরী! মাই গুডনেস! আপনি তো আমার প্রিয় লেখক গৌতমবাবু। আপনার লেখায় প্রকৃতি থাকে অনেকটা জায়গা নিয়ে। আর আমি সত্যি বলতে কী– একজন প্রকৃতি-প্রেমিক। এই দেখুন না, এখনও গলায় বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছে। দিনমান টোটো করে ঘুরি। বিরলজাতের পাখি প্রজাপতি পোকামাকড় আর অর্কিড দেখার বাতিক আছে প্রচণ্ড। আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুব প্রীত হলুম।
রাখী চোখ খুলছে না দেখে অস্বস্তি জাগল। আস্তে বললুম– রাখী তোমার কি কষ্ট হচ্ছে এখনও?
চোখ বুজে ও জবাব দিল-হ্যাঁ।
তখন কর্নেল একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন–এখন তাহলে আসি গৌতমবাবু। পরে আলাপ করা যাবে। ওঁকে একটু সাবধানে রাখবেন। আর নার্ভ ঠাণ্ডা রাখার জন্যে আমার কাছে একরকম ট্যাবলেট আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি। দুটো খাইয়ে দেবেন নির্ভয়ে। দেখবেন, সকালে ফ্রেশ হয়ে উঠেছেন আবার!
কর্নেল চলে গেলেন। এমন একজন প্রখ্যাত ধুরন্ধর গোয়েন্দার সঙ্গে আলাপ : হওয়া এখন আমার পক্ষে যতটা খুশির–ততটা অস্বস্তিরও। কারণ, রাখীর ব্যাপারে আমি নার্ভাস বোধ করছিলুম। নিশ্চয় ওই ঘুঘু ভদ্রলোক আঁচ করে নিয়েছেন ইতিমধ্যে যে এই মেয়েটিকে নিয়ে আমি বেড়াতে অর্থাৎ ফুর্তি করতেই এসেছি। আবার মনে হলো, ভদ্রলোক নিশ্চয় আধুনিক মনের মানুষ। যুগোপযোগী উদারতা। কি ওঁর থাকতে নেই? আজকাল বান্ধবী নিয়ে ছেলেদের বেড়াতে যাওয়ার মধ্যে তেমন খারাপ কী থাকতে পারে?
