রাখী বলল–চলো না গো, ওই ব্যালকনিতে গিয়ে বসে সমুদ্র দেখি!
এই ডাকে সহজ সম্পর্কের তীব্র মাধুর্য ছিল। তখুনি ব্যালকনিতে গিয়ে বসলুম আমরা। তারপর রাখী কেমন চুপ করে গেল। তার মৌন নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না। অথচ আমার চুপচাপ থাকতে ভাল লাগছিল না। এই অসাধারণ সৌন্দর্য পাশে নিয়ে কেউ চুপ থাকতে পারে না।
একটু পরেই আবার বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির ছাঁটে পুবের ব্যালকনি ভিজতে থাকল। সেইসঙ্গে সমুদ্রের দিক থেকে জোর একটা বাতাস এল! তখন আমরা উঠে এসে দরজা বন্ধ করলুম। শুধু জানালা খোলা রইল। সমুদ্রের গর্জন বেড়ে গেল। অস্বস্তি জাগছিল যদি সমুদ্রের ঝাপটায় নিচের পাথর ধসে যায়। এই বাড়িটাও তো তখুনি সমুদ্রের তলায় চলে যাবে।
সেই সময় রাখী বলে উঠল–ভীষণ খিদে পেয়েছে। তোমার পায়নি?
নিশ্চয় পেয়েছে। কিন্তু ওদের যে খাবার এখানে আনতে বলা হয়নি।
চলো না, নিচে ডাইনিং হলে গিয়ে খেয়ে আসি।
একটু হেসে বসলুম–চেনাজানা কারো চোখে পড়লে কী বলবে বলোত? তুমিই বা কী বলবে–যদি তোমার চেনা কেউ থাকেন?
রাখী তাচ্ছিল্য করে জবাব দিল–আমি বলব, বন্ধুর সঙ্গে বেড়াতে এসেছি। তুমি বলতে পারবে না?
খুব পারব। ওর সাহস আমার সাহস বাড়াল। উঠে দাঁড়ালুম।
রাখী বলল–এক মিনিট। তুমি নিচে গিয়ে বসো। আমি যাচ্ছি। কাপড়টা বদলে নিতে যেটুকু সময় লাগবে!
ওর কথা মেনে নিয়ে সুড়সুড় করে নিচে চলে এলুম। ডাইনিং হলটা মোটামুটি প্রশস্ত। মৃদু আলো জ্বলছে সেখানে। বেশ রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। লক্ষ্য করলুম কোণার দিকে একজন বুড়ো কাপ্তেন গোছের ভদ্রলোক একা বসে রয়েছেন। মাথায় টাক, মুখে সাদা গোঁফ আর দাড়ি, কিন্তু বেশ শক্তসমর্থ চেহারা। ওঁর কোলে একটা বর্ষাতি রয়েছে। মনে হলো, এইমাত্র বাইরে থেকে এসেছেন। ভদ্রলোকের উদ্দেশে কাউন্টার থেকে মিসেস জেভিয়ার চাপা গলায় কিছু বললেন। উনি অমায়িক হেসে মাথা নেড়ে পাল্টা কিছু বললেন। কথাগুলো শোনা গেল না।
অন্যদিকের কোণে এক দম্পতি বসে রয়েছেন। অবাঙালী মনে হলো। চল্লিশ বেয়াল্লিশ বয়স পুরুষটির, মহিলাটির পঁয়ত্রিশ-সাঁইত্রিশের কম নয়। আলো কম থাকলেও এটা আঁচ করা গেল। আমার ডাইনে দুটো টেবিল পরে বসে আছে একটি মেয়ে। হাল্কা ছিপছিপে গড়ন। ডিমালো মুখ। বেণীবাঁধা চুল। পরনে ফিকে নীল রঙের শাড়ি আর গায়ে সাদা লম্বাহাতা ব্লাউস। স্কুলমিসট্রেসের আদল যেন।
টেবিলে একটা কালো ব্যাগ রয়েছে। আমি নেমে আসার সময় মুখটা একবার। ঘুরিয়েছিল মেয়েটি, কেমন চোখে তাকিয়েছিল যেন। যতক্ষণ আমি এই টেবিলে না এলুম, সে তাকিয়েই ছিল। তারপর মুখটা ঘুরিয়ে নিলো, তারপর আর তাকায়নি। কেন যেন মনে হলো, তার দুই চোখে ঘৃণা বা ব্যঙ্গ ছিল।
কিন্তু ও যে বাঙালী মেয়ে, তা চিনতে আমার অসুবিধে হয়নি। শুধু ভাবছিলুম, আজকাল বাঙালী যুবতীরাও একা এতদূর সমুদ্রতীরে বেড়াতে আসার সাহস রাখে! ওকে সাহসী মেয়ে বলেই মনে হলো। চেহারা খুব সুশ্রী বলব না। কিন্তু মুখে ব্যক্তিত্ব কিংবা এমন একটা কিছু আছে–যা ওকে আর পাঁচজন থেকে আলাদা করে দেখাতে বাধ্য। কিন্তু একটু পরে হঠাৎ মনে হলো ওকে কোথায় যেন দেখেছি।
আমার ডাইনের দিকের একটা টেবিল বাদে বসেছেন একজন রুক্ষ কঠোর চেহারার ভদ্রলোক–একা। গোঁফ আর বড়বড় চুল আছে মাথায়। বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। হাতে একটা বালা রয়েছে। খাড়া নাক, চোখদুটো কেমন হিংস্র যেন। এইসব চেহারায় হানাদারের আদল থাকে এবং অকারণে অস্বস্তি জাগায়।
বসে থাকতে থাকতে উনি হঠাৎ উঠে গেলেনে। সিঁড়িতে ওঁর পা দুটো মিলিয়ে গেল। মিসেস জেভিয়ার ওঁকে কী যেন বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিলেন, কিন্তু বললেন না। ঘরে প্রায় স্তব্ধতা। শুধু অবাঙালী দম্পতি চাপা গলায় কথা বলছেন। বাইরে চাপা বৃষ্টি ও সমুদ্রের গর্জন কানে আসছে। ওপরে সম্ভবত কেউ ঘরের জানালায় হুক লাগায়নি–মাঝে মাঝে জানালার কপাটই হয়তো শব্দ করছে। ঘড়ি দেখলুম, আটটা বারো। এখনও ডিনার সার্ভ করছেন না কেন মিসেস জেভিয়ার? কিচেনের কাউন্টারের পাশে তিনজন উর্দিপরা বয় পুতুলের মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে। হঠাৎ আমার কেমন অস্বস্তি জাগল। ওই বেয়াড়া রুক্ষ চেহারার লোকটা ওপরে গেল। ওপরে রাখী একা আছে।
কিন্তু রাখীই বা এত দেরি করছে কেন? সিঁড়ির দিকে বারবার ঘুরে তার আশা করতে থাকলুম। এসময় মিসেস জেভিয়ার কাউন্টার থেকে এগিয়ে এলেন আমার কাছে। এসে সস্নেহে চাপা স্বরে বললেন মাফ করবেন। আর আট মিনিট পরে ডিনার সার্ভ করা হবে, মাই ডিয়ার ইয়াং ম্যান। একটা মিসহ্যাপ হয়েছে। গ্যাস ফুরিয়ে গেছে কিচেনে। তাই ইলেকট্রিক চুলোয় সব রান্না হচ্ছে। একটা হিটার জ্বলে গিয়ে এই সামান্য দেরি। খুব কষ্ট হচ্ছে না তো?
শশব্যস্ত বললুম–না, না!
মিসেস জেভিয়ার বললেন–যা অবস্থা হচ্ছে দিনে দিনে বলার নয়। জিনিসপত্র আগুনের দর। মিলছে না সবকিছু। গ্যাস প্রায় মেলে না। ইলেকট্রিসিটি–তাও প্রায় লোডশেডিং হচ্ছে ঘন ঘন। তোমাদের ভাগ্য ভাল যে আজ প্রায় সারাটা দিনই ভাল। গেছে। এখন অব্দিও ভাল যাচ্ছে। পরে কী হয় বলা যায় না। তোমাদের টেবিলের ওপর মোম রাখা আছে। আশা করি লক্ষ্য করেছ?
