ফোটোর রাখীকে দেখেই আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। তারপর যখন হাওড়া স্টেশনে কথামতো সে এল, তখন ঘুরে যাওয়া মাথার ঘিলু গলে গেল। ফোটোর। কথা ভুলেই গেলুম। এত আশ্চর্য সুন্দর আর সেক্সি চেহারা সচরাচর দেখা যায় না। হাল্কা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছিল সে, হাতাকাটা ব্লাউজ ছিল গায়ে, বেণী বাঁধা ঘন কালো চুল ঝুলছিল কোমর অব্দি–এবং তার উদ্ধত বুকের ওপর একটা শঙ্খের মালা ঝুলছিল। আমি মনে মনে পাগল হয়ে গেলুম। বললুম–একটা কবিতা মনে পড়ছে। জীবনানন্দ দাশের শঙ্খমালা নামে এক নারীর কথা আছে তাতে।
কথা ছিল আমরা ওখান থেকেই সোজা বাইরে এক জায়গায় চলে যায়। সেই জায়গাটা পছন্দ করেছিল রাখীই। আমার অমত করার কী আছে? চন্দনপুর অন-সীর মতোন সুন্দর সমুদ্রতীর সারা ভারতে আর একটিও নেই। হিলক শ্রেণীর পাহাড়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, তার নিচে সমুদ্র–মাত্র একবার গিয়েছিলুম কবছর আগে। খুবই ভাল লেগেছিল।
ট্রেনে আমরা কোনও প্রেমাত্মক কথাবার্তা বললুম– না। খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলুম। শুধু একবার আস্তে বলেছিলুম-আমাকে দেখে তোমার ইমেজ নিশ্চয় নষ্ট হয়ে গেছে, রাখী!
রাখীও আস্তে জবাব দিয়েছিল–পাগল! কী যে ভাল লাগছে!
চন্দনপুর অন-সী পৌঁছতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে গিয়েছিল। সময়টা বর্ষার। ভাগ্যিস আমরা পৌঁছানোর সময় বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। ভাল হোটেল কয়েকটা। আছে ওখানে। কিন্তু রাখীর পছন্দ মিসেস জেভিয়ারের হোটেল। লোকে বলে মিসেস জেভিয়ারস্ লজ। প্রাইভেট বাড়ির মতো ব্যবস্থা। সমুদ্রের এক খাড়ির কাছে পাথুরে জমির ওপর বাড়িটা বানিয়েছিলেন ব্রিটিশ আর্মির লেফটন্যান্ট কর্নেল রিচার্ড জেভিয়ার–সে ১৯৩০ সালের কথা। মিসেস আর দেশে ফিরে যাননি। একা এখানেই থেকে গেলেন। বয়স প্রায় সত্তর। কিন্তু শক্ত সমর্থ মহিলা। আমাদের দেখেই সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। কারণ, এখন অফ সিজন। খুব কম লোকই এই বর্ষায় এখানে বেড়াতে আসে। একটা ডাবল বেড ঘর খালি ছিল দোতালার পুবদক্ষিণ কোণে। পুবে সমুদ্র, দক্ষিণে কিছু ছোটো পাহাড় আর বাংলো বাড়ি। বসতি এলাকা গোটা পশ্চিম-উত্তর জুড়ে।
ঘরটা খুবই ভাল লাগল। সব রকম আধুনিক ব্যবস্থা আছে। রাখীর প্রতি সপ্রশংস তাকিয়ে বললুম– নিশ্চয় তুমি এখানে কখনও এসেছিলে?
রাখী জবাব দিল–মোটেও না। এই প্রথম।
–তবে মিসেস জেভিয়ারের লজে আসতে বললে যে?
আমার বিস্ময় কাটিয়ে দিল রাখী। বলল–আমার এক আত্মীয় এখানে আসেন। তাঁর কাছেই শুনেছিলুম।
ইচ্ছে ছিল, ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে সব কিছুর আগে ওকে বুকে চেপে ধরব। ওকে দুহাতে তুলে নিয়ে তুমুল চিৎকার করে বলব-রাখী, তুমি আমার! কিন্তু কে জানে কেন, সেসব কিছু করলুম না। খুব শান্ত ও ভদ্র হয়ে গেলুম। সেও যেন বিশেষ উৎসাহ দেখাল না। সোজা বাথরুমে চলে গেল আগে।
মিসেসের লোক এসে সব দেখিয়ে শুনিয়ে চলে গিয়েছিল। একটু পরে উনি নিজে এলেন। বিরক্ত করার জন্য বারবার ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বললেন–কোনও অসুবিধে হলে যেন তক্ষুনি জানাই। এ বাড়িতে যাঁরাই আসেন, তারাই ওর কাছে পুত্রকন্যাবৎ। নো কোয়েশ্চেন অফ মানি। প্রবাসের আনন্দটুকু, পুরোপুরি সবাই যাতে উপভোগ করতে পারে, সেটা দেখা ওঁর কর্তব্য।
রাখী কিন্তু খুব ভাব জমাবার চেষ্টা করল। যত শীগগির উনি চলে যান, তাই ভাল কারণ, আমি একা হতে চাই রাখীর কাছে। অথচ রাখী এটা ওটা নানা প্রশ্ন করল। অবশেষে আন্টি পাতিয়ে বসল। মিসেস জেভিয়ারও দেখলুম রাখীকে পছন্দ করেছেন। এমন কি, যাবার সময় ওর গালে সস্নেহ চুমুও দিয়ে বসলেন।
চলে গেলে দরজা বন্ধ করে রাখী বলল–কেমন ম্যানেজ করলুম দেখলে? বুড়িটা অবশ্য খুব ভাল মানুষ। দেখবে, একটুও অসুবিধে ঘটতে দেবেন না।
রাখী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মাঝে মাঝে পাশের খোলা জানলায় উঁকি দিয়ে সমুদ্র দেখছিল। দেখা যায় না–সব অন্ধকার। শুধু নিচের দিকে অবিশ্রান্ত গর্জন শোনা যায়। বর্ষার সমুদ্র এমনিতেই উত্তাল থাকে। তাতে এ বাড়ির নিচে খাড়ি আছে। পাথরের ওপর ঠেউ এসে দারুণ গর্জনে ভেঙে যাচ্ছে। মিসেস বলছিলেন–ঝোড়ো হাওয়া বইলে জানলা খোলা যেন না থাকে। লোনা জল এত উঁচুতে ছিটকে এসে ঘর ভিজিয়ে দেবে।
আমি বিছানার দিকে তাকিয়ে একটা কিছু ভাবছিলুম। পাশাপাশি দুট নিচু খাট আছে। ডানলোপিলো গদি আছে। মধ্যে একহাত ব্যবধান ওই ব্যবধান রেখেই কি শুতে হবে?
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমার মুখের সেই লোভ, অসহায়তা ও কাকুতির দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করল রাখী–প্রতিবিম্বে। সে ঘুরে একটু হেসে বলল–যে মেয়ে সোজা এভাবে চলে আসতে পেরেছে সে তোমার কোনও সমস্যাই সৃষ্টি করবে না। সাহিত্যিক হয়ে এটুকুও তুমি বুঝতে পারছ না গৌতম?
অপ্রস্তুত হয়ে বললুম–কী বলছ! যাঃ!
রাখী তার খোলাচুলের ঝাপি নিয়ে আমার পাশে এসে বসে পড়ল হঠাৎ! তারপর আমার চিবুক ধরে সোজা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল বলো তো, আমাকে তুমি বাজারের মেয়ের মতো ভেবেছ কি না?
আবেগ সংযত করে বললুম–তুমি এসব কেন ভাবছ রাখী? বাজারের মেয়ে আমি জানি না। জানলেও তোমাকে তা ভাবব কেন? আমি তো তোমাকে দেখে তোমার প্রেমে পড়িনি! সে প্রশ্নও ওঠে না।…
রাখী আমার মুখে হাত চাপা দিল। ওর চিরোল সাদা আঙুলগুলো আমার ঠোঁটের খিদে জাগিয় তুলল। কিন্তু এখনই হুট করে কিছু করে বসলে রাখীর মনে আমার সাহিত্যিক ইমেজে আঘাত লাগতে পারে। তাই সংযমী হলুম।
