রাজবাহাদুর খাপ্পা হয়ে বললেন, ব্যস! গেল। টাকাকে টাকা, পরিশ্রমকে পরিশ্রম!
মেঘেন্দ্রবাবু বললেন, বাজপাখির পাল্লায় না পড়ে তো ফিরে আসবে। এতদিন ধরে ট্রেনিং দিচ্ছি। বেঁচে থাকলে ফিরতেই হবে। আর যদি নাই ফেরে, কথা দিচ্ছি–আমি এর একটা জোড়া এনে দেব।
রাজাবাহাদুর পরিচয় করিয়ে দিলেন। মেঘেন্দ্রলাল ঘোষ। ওঁর শ্যালক। একসময় সার্কাসে ছিলেন। নানা ঘাটের জল খেয়েছে জীবনে। চিরকুমার মানুষ। চেহারায় জীবনসংগ্রামের পোড়-খাওয়ার ছাপ স্পষ্ট। রাজাবাহাদুর শ্যালকের হাতে পশু পাখির দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন। মনে হল, শ্যালককে খুব স্নেহ করেন।
চিড়িয়াখানা থেকে ফের ড্রইংরুমে। কর্নেলের সঙ্গে রাজাবাহাদুরের পায়রা নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা। তারপর এল খুনোখুনির প্রসঙ্গ। রঞ্জন আঢ্যির কথা উঠতেই রাজাবাহাদুর মুখ বিকৃত করে বললেন, ওই সুদখোরটার এমন পরিণতি স্বাভাবিক। বুঝলেন না? নকশালরা আবার অ্যাকশানে নেমেছে।
কর্নেল বললেন রঞ্জন আঢ্যি সুদখোর নাকি?
হ্যাঁ। তাছাড়া যে কটা লোক মারা পড়েছে, সব কটাই সুদখোর। মহাজনী কারবার ছিল।
কিন্তু নবারুণবাবু? উনি তো রিটায়ার্ড মাইন ইঞ্জিনীয়ার!
হাসলেন রাজাবাহাদুর। নবারুণও তো সুদখোরের বংশ মশাই! রক্তে ওটা আছে। শুনেছি, সেও টাকা ধার দিত খনিশ্রমিকদের। ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা, বুঝলেন না? খনিশ্রমিকরা নেশাভাঙ করে আর জুয়া খেলে ফতুর হয়। নো প্রপার এডুকেশান, নো হেলদি অ্যাটমসফিয়ার। ওদের দোষ কী?
কিন্তু তাহলে কাপালিক সাধুর ব্যাপারটা কী মনে হয় আপনার?
ছদ্মবেশী নকশাল-স্কোয়াড। রাজাবাহাদুর রায় দিলেন। আমার ডাইরীতে পরবর্তী অংশ ফের সংক্ষিপ্ত।..রাজাবাহাদুরের কাছে বিদায় নিয়ে পুলিস স্টেশন। সেখানে কর্নেল-যদুপতিবাবুর দুর্বোধ্য গোপন মন্ত্রণা। ডাকবাংলোতে প্রত্যাবর্তন। আমার পুনঃপুনঃ প্রশ্ন। কর্নেলের উৎকট নীরবতা। আমি খাপ্পা। কর্নেলের চোখ বুজে কিয়ৎক্ষণ ধ্যান। তারপর হঠাৎ নিষ্ক্রমণ। প্রশ্নের জবাব পেলাম না।
বেলা একটায় কর্নেলের ফোন। লাঞ্চটা যেন আমি একা সাবাড় করি। এবং বিকেল চারটেয় যেন থানায় যাই রহস্যের পর্দা উন্মোচন দেখতে যদি আমার আগ্রহ থাকে।
.
০৩.
কাঁটায় কাঁটায় চারটেতে থানায় হাজির হলাম। ভেতরকার বড় ঘরে রীতিমত কনফারেন্সের আয়োজন হয়েছে। পুলিসসুপারও এসেছেন। বড়-ছোটো একঝাঁক গোমড়ামুখো পুলিস অফিসার বসে আছেন। মধ্যমণি হয়ে মিটিমিটি হাসছেন আমার বৃদ্ধ বন্ধু। তারপর চা এল।
চা খেতে খেতে গোয়েন্দাপ্রবর বললেন, মিস্টার বিশ্বাস আসামীকে নিয়ে আসার আগেই এই হত্যারহস্যের পর্দা তোলা যাক। দুটি সূত্র থেকে আমি উপকৃত। প্রথমটি হল : রাজাবাহাদুরের সংগৃহীত একটি বিশেষ জাতের ট্রেণ্ড পায়রার অন্তর্ধান। দ্বিতীয়টি হল : রাজাবাহাদুরের উক্তি–ভিকটিমরা প্রত্যেকে চড়া সুদে টাকা ধার দেওয়ার মহাজনী কারবারে লিপ্ত ছিলেন। থানায় এসে মিস্টার সিনহাকে নিহত ব্যক্তিদের বাড়ি তল্লাস করে কারবারের খাতাপত্র তদন্ত করার নির্দেশ দিলাম। আশাতীত ফল পাওয়া গেল। মিস্টার সিনহা, আপনার তদন্ত রিপোর্টটি পড়ুন একবার।
যদুপতি সিনহা একটা ফাইল খুললেন। মহেশ্বর ত্রিপাঠীর খাতায় আসামীর নামে কর্জখাতে খরচ লেখা আছে দুহাজার টাকা। সুদের হার মাসিক শতকরা তিরিশ টাকা। নবারুণবাবুর মহাজনী খাতা পাইনি। নোটবইয়ে আসামীর নামে লেখা আছে, আড়াই হাজার টাকা। সুদের হার মাসিক শতকরা কুড়ি টাকা। ভবেশবাবুর খাতায় একই লোকের নামে কর্জখাতে খরচ লেখা আছে পাঁচ হাজার পাঁচশো টাকা। সুদের হার মাসিক শতকরা চল্লিশ টাকা। রঞ্জন আঢ্যির খাতায় আসামীর নামে কজখাতে লেখা রয়েছে সাত হাজার টাকা। মাসিক সুদ শতকরা তিরিশ টাকা।
পুলিশ সুপার বললেন, এত চড়া সুদে টাকা ধার নিয়ে কী করতেন ভদ্রলোক?
যদুপতিবাবু বললেন, এই ইণ্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় একটা জুয়াচক্রের রিং লিডার হতে গেলে প্রচুর টাকা ইনভেস্ট করতে হয় স্যার। গুণ্ডাদল এবং মেয়েমানুষও পুষতে হয়। কিন্তু আমাদের চাপ সৃষ্টিতে এই চক্র বিশেষ সুবিধা করতে পারছিল না।
কর্নেল বললেন, এবার হত্যাপদ্ধতির কথায় নামা যাক। ভিকটিমরা সন্ধ্যার দিকে ফোন পাবার পরই ব্যস্তভাবে ছুটে যেতেন। বোঝা যায়, ফোনের অপরপ্রান্তে লোক অর্থাৎ আমাদের আসামীটিকে ওঁরা খুবই গুরুত্ব দিতেন। রঞ্জনবাবুর কথাই ধরুন। কাপালিক সাধুর আগমন এবং এককপি ডাকিনীতন্ত্র রেখে যাওয়ার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক থাকছে জেনেও রঞ্জনবাবু ছুটে গিয়েছিলেন ফোন পেয়ে। কেন? এর ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে : প্রথমত, কাপালিক সাধু ও ডাকিনীতন্ত্র ব্যাপারটার সঙ্গে ওই জরুরি ফোন পাবার কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে, তিনি মোটেও জানতেন না। দ্বিতীয়ত, এমন ঝুঁকি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটে যাবার কারণ টাকাকড়ি ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। আশা করি, আপনারা সুদখোর মহাজনদের মানসিকতার সঙ্গে পরিচিত। যখন সুদ কেন, আসল টাকাও ফেরত পাবার আশা ছেড়ে দিয়েছেন, তখন হঠাৎ যদি দেনাদার খাতক ফোনে ডেকে বলেন, এক্ষুণি চলে আসুন টাকা যোগাড় হয়েছে এবং সুদে আসলে সব মিটিয়ে দিচ্ছি, এবং সেই খাতক যদি হন এক গণ্যমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি–তাহলে অর্থগৃধু মহাজন পাগল হয়ে দৌড়ে যাবেন বৈকি। টাকার সঙ্গে এঁদের রক্ত নেচে ওঠারই কথা।
