পুলিশসুপার বললেন, ঠিক, ঠিক। কিন্তু মহেশ্বরবাবুর খুন হওয়া দেখেও কেন নবারুণবাবু কিংবা নবারুণবাবুর খুন হওয়া দেখেও ভবেশবাবু, এবং ভবেশবাবুর খুন হওয়া দেখেও রঞ্জনবাবু একই ফাঁদে পা দিতে গেলেন?
কর্নেল বললেন, নবারুণবাবু কেমন করে জানবেন, আমাদের আসামী ওরফে। ঘাতক লোকটি মহেশ্বরবাবুর কাছেও টাকা ধার করেছিলেন? তেমনি ভবেশবাবুও জানতেন না, তিনি ছাড়া আরও অনেকের কাছে এই লোকটি টাকা ধার করেছেন এবং ফেরত পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন। এই ভিকটিম মহাজনরা প্রত্যেকে স্বাভাবিক কারণেই ভাবলেন, একমাত্র তার কাছেই ওই লোকটি দেনাদার। বিশেষ করে লোকটি যদি বিশিষ্ট কোনও ব্যক্তি বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের কেউ হন, তিনি যে রাজ্যজুড়ে সকলের কাছে দেনা করে বেড়াবেন–কে ভাবতে পারে?
যদুপতিবাবু মুচকি হেসে বললেন, অথচ ইনি তাই করেছে।
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ–অন্তত সাতজন মহাজনের কাছে তো বটেই। কারণ আমরা সাতকপি ডাকিনীতন্ত্র চিৎপুরে এক ক্রেতার কেনার খবর জানি। শিল্পাঞ্চলে মহাজনদের ছড়াছড়ি। আপাতত আমরা চারজনকে জেনেছি। কারণ তারা খুন হয়েছেন, বাকি তিনজনকে জানি না। তবে বলা যায়, এই তিনজন জোর বেঁচে গেলেন। বাই দা বাই, মিস্টার সিনহা, এই চারজন মহাজনের কাতোর বাড়িতে কোনও হ্যাণ্ডনোট পেয়েছে কি–আসামীর স্বাক্ষরিত কোনও হ্যাণ্ডনোট?
না, কর্নেল।
তাহলেই বুঝুন, ভিকটিমদের বলা হয়েছে হ্যাণ্ডনোটসহ যেতে। ওঁরা ছুটে। গেছেন। ঘরে বসিয়ে রেখে আসামী টাকা আনার ছলে ভেতরে গেছেন। তারপর অতর্কিতে পিঠে ত্রিশূল বিঁধিয়ে মেরেছে। বডি বয়ে নিয়ে গেছে ভৈরবমন্দিরে। আসামীর বাসস্থানের অতি সন্নিকটে মন্দির। বেশি কষ্ট করতে হয়নি।
পুলিশসুপার বললেন, সন্নিকটে? মন্দিরের কাছে তো আর কোনও বাড়ি নেই!
কর্নেল দ্রুত বললেন, মিস্টার সিনহা, এবার টেলিফোন এক্সচেঞ্জের তদন্তরিপোর্ট, প্লিজ!
যদুপতিবাবু ফাইলের দিকে ঝুঁকে বললেন, রঞ্জনবাবুর বাড়ির লাইন চাওয়া হয়েছিল রাজবাড়ি থেকে।
মাইগুডনেস! নড়ে বসলেন পুলিসসুপার। অসম্ভব। রাজাবাহাদুর অত্যন্ত সৎ মানুষ!!
যদুপতিবাবু বললেন, এক্সচেঞ্জের অপারেটার রাজাবাহাদুর বা রাজবাড়ির অনেকের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে পরিচিত। সে বলেছে, অচেনা কণ্ঠস্বরে লাইন চাওয়া হয়েছিল। ছয়ুই মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় মহেশ্বরবাবুর, সাতুই মার্চ সন্ধ্যা ছটায় নবারুণবাবুর এবং নয়ুই। মার্চ সন্ধ্যা সাতটায় ভবেশবাবুর বাড়ির লাইন চাওয়া হয়েছিল রাজবাড়ি থেকেই। কণ্ঠস্বর অচেনা।
কণ্ঠস্বর বদলানো খুব সহজ। কর্নেল বললেন, যাই হোক মিস্টার সিনহা, এবার আমাদের মূল সাক্ষীকে উপস্থিত করুন।
হতবাক হয়ে দেখি, যদুপতিবাবু টেবিলের তলা থেকে একটা পাখির খাঁচা বের। করে টেবিলে রাখলেন। খাঁচার ভেতর একটা সাদা পায়রা। তার গলায় খয়েরি রঙের খানিকটা তুলো বাঁধা রয়েছে। বললাম, কর্নেল! আজ সকালে আপনার দাড়িতে কি এই পায়ারাটিরই পালক দেখছিলাম?
কর্নেল হাসলেন। অত উঁচুতে ত্রিশূল। কিভাবে রক্ত মাখানো সম্ভব, ভাবতে গিয়ে হঠাৎ মনে হয়েছিল–ট্রেণ্ড পাখির সাহায্য নেওয়া হয়েছে কি? এ-ক্ষেত্রে পায়রার কথাই সবার আগে মনে আসে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এবং পরে নানা ক্ষেত্রে ট্রেণ্ড পায়রা দিয়ে চিঠি পাঠানো হত। অন্যান্য কাজও করা হয়েছে পায়রা দিয়ে। তাই রাজাবাহাদুরের পায়রাগুলোর কথা মনে পড়েছিল। মিস্টার সিনহাকে নির্দেশ দিয়েছিলাম গতরাতে রঞ্জনবাবুর হত্যাকাণ্ডের পর। ফায়ার বিগ্রেডের সাহায্যে ত্রিশূলে ফাঁদ পেতে রাখতে বলেছিলাম।
যদুপতিবাবু বললেন, রাত তিনটের মুকহরবস্তীতে গিয়ে পাখি ধরা একটা লোককে ওঠালাম। ফায়ার ব্রিগেডের একটা গাড়িও চুপচাপ আনা হল। মুকহর লোকটি কিছুতেই ফায়ার ব্রিগেডের মইয়ে উঠবে না। ভয়টয় দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত কাজ হল। ভোর পাঁচটায় দেখি, পক্ষিবরের আবির্ভাব এবং গলায় তুলোতে রক্ত। ত্রিশূলে এসে গলা ঘষতে গিয়েই বাছাধন ফাঁদে পড়ল। তারপর দেখি, কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে মাঠ দিয়ে আসছেন।
কর্নেল বললেন, তখনও বুঝিনি, কে এর পেছনে। সকাল আটটার পর রাজবাড়িতে ব্রেকফাস্টের নিমন্ত্রণে গিয়ে দেখলাম, রাজাবাহাদুরের পায়রার খাঁচায় জোড়াপায়রার একটা নিখোঁজ। অমনি সব জল হয়ে গেল। হা-ওই যে আসামী হাজির। ওঁর টুপিটা খুললেই দেখবেন, মাথায় আমার মত টাক আছে। চিৎপুরের দোকানে যে চেহারার বর্ণনা পেয়েছিলুম, আজ সকালে ওঁকে দেখামাত্র তা মিলে গিয়েছিল।
সবাই দরজার দিকে ঘুরে দেখলাম, খগেন্দ্র বিশ্বাস এবং আরও সব অফিসারের সঙ্গে হাতকড়া ও কোমরে দড়ি পরে আসামী সত্যি হাজির। কিন্তু কী আশ্চর্য! এ যে দেখছি, রাজাবাহাদুরের শ্যালক সেই মেঘেন্দ্রবাবু?
কর্নেল বললেন, মিস্টার বিশ্বাস, আশা করি, চিৎপুরের আর দাশ অ্যাণ্ড কোম্পানির জটাজুট গোঁফ-দাড়ি পোশাক-আশাক পাওয়া গেছে?
হ্যাঁ স্যার। খাটের তলায় পিচবোর্ডের বাক্সে প্যাক করা ছিল।
ত্রিশূলটা?
পেয়েছি। এই দেখুন। এতে কিন্তু রক্তক্ত নেই। ধুয়ে ফেলা হয়েছে।
ত্রিশূলটা দেখে আঁতকে উঠলাম। যাত্রাদলে ব্যবহারের জন্য নিছক টিনের তৈরি ত্রিশূল। সূচনো তিনটে ফলা। একটু বেঁকে আছে শুধু।
