এই সময় আরেকজন পুলিশ অফিসার এলেন। পরিচয়ে জানলাম, ইনি আই বি দারোগা খগেন্দ্র বিশ্বাস। গম্ভীর মুখে বললেন, জরুরি খবর আছে স্যার। বিকেল চারটে নাগাদ রঞ্জন আঢ্যির বাড়িতে সেই সাধু এসেছিলেন। সাধুকে বসতে বলে, রঞ্জনবাবু ভেতরের ঘরে গিয়ে থানায় ফোন করেন। আমরা ছুটে যাই–আপনি তখন বাইরে ছিলেন। রঞ্জনবাবুর বাড়ি গিয়ে সাধুকে পাইনি। রঞ্জনবাবু ফোন করে গিয়ে দেখেন, সাধু নেই। সম্ভবত ব্যাপারটা আঁচ করে কেটে পড়েছিল।
কর্নেল বললেন, সাধুবাবা রঞ্জনবাবুকে কী বলছিলেন?
খগেন্দ্রবাবু বললেন, এককপি ডাকিনীতন্ত্র কিনতে পীড়াপীড়ি করছিলেন।
আর কিছু?
না স্যার! রঞ্জনবাবু বললেন, এছাড়া আর কিছু বলেননি সাধু। কিন্তু ফোন করে এসে রঞ্জনবাবু দেখেন, এককপি ডাকিনীতন্ত্র বসার ঘরে পড়ে রয়েছে। পাতা উল্টে দেখেছি, মারণমন্ত্রের তলায় ডটপেন দিয়ে আণ্ডার লাইন করা।
রঞ্জনবাবু এখন কোথায়?
বাড়িতেই থাকার কথা। ওঁর বাড়িতে আর্মড গার্ড মোতায়েন করেছি। ওঁকে বেরোতেও নিষেধ করেছি।
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। এখনই রঞ্জনবাবুর কাছে যাওয়া দরকার। ওঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। চলুন মিস্টার সিনহা। জয়ন্ত, তুমিও এস।
বাইরে জীপ দাঁড় করানো ছিল। যদুপতিবাবু ড্রাইভ করছিলেন। আলো-আঁধারি আঁকাবাঁকা রাস্তায় এগিয়ে বাজার এলাকায় ঢোকার মুখে হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। যদুপতিবাবু অস্ফুট স্বরে বিরক্তি প্রকাশ করলেন।
অনেক গলিঘুজি ঘুরে একস্থানে জীপ দাঁড়াল। সামনে একটা দোতলা নতুন বাড়ির বারান্দায় হ্যাঁজাক জ্বলছিল। বেঞ্চে দুজন সশস্ত্র কনস্টেবল বসেছিল। তারা উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকল। বাড়িটা নিঃঝুম কেন বুঝতে পারলাম না। যদুপতিবাবু জিজ্ঞেস করলেন, রঞ্জনবাবু বেরোননি তো?
একজন কনস্টেবল মাথা নেড়ে বলল, না স্যার! কিছুক্ষণ আগেও ভেতরে ওঁর। গলা শুনেছি।
দরজার কড়া নাড়লে হেরিকেন হাতে একটি লোক জানালা খুলে প্রথমে আমাদের দেখে নিল, তারপর দরজা খুলল। বুঝলাম, রঞ্জনবাবু খুব সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। যদুপতিবাবু বললেন, তোমার মনিবকে খবর দাও হে! বলল, আমরা এসেছি।
লোকটি বলল আজ্ঞে হুজুর, বাবু তো নেই!
আমরা চমকে উঠলাম। খগেন্দ্র বিশ্বাস চোখ কটমটিয়ে বললেন, নেই মানে?
ভেতর দিকের দরজার পর্দা তুলে বিবর্ণ মুখে এক প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা বললেন, ঘণ্টাখানেক আগে ফোন বাজল। দাদা ফোন ধরল। কী কথাবার্তা হল। তারপর দাদা ব্যস্ত হয়ে খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বলল, এক্ষুণি আসছি। জরুরি কাজ আছে। আমি নিষেধ করলাম, শুনল না। আর বৌদি তো শয্যাশায়ী।
কর্নেল শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠলেন, মিস্টার সিনহা। এখনই ভৈরবমন্দিরে যাওয়া দরকার। শীগগির!
আবার আমরা জীপে উঠলাম। অন্ধকার ঘোরালো সঙ্কীর্ণ রাস্তায় জীপ ছুটে চলল প্রচণ্ড গতিতে। মিনিট পনেরো পরে যখন থামল, জীপের হেডলাইটের আলোয় বিশাল এবং জরাজীর্ণ এক মন্দিরের ফটক দেখতে পেলাম। আবছা আলোয় ডাইনে-বাঁয়ে ধ্বংসস্তূপ আর আগাছার জঙ্গলও চোখে পড়ল।
টর্চ জ্বেলে মন্দিরের ফটক পেরিয়ে আমরা প্রাঙ্গণে ঢুকলাম। তারপর সবাই থমকে দাঁড়ালাম। প্রাঙ্গণে ফুট তিনেক উঁচু একটা চত্বরের ওপর পা মুড়ে আসনে বসা অবস্থায় কেউ মুসলিমদের নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে উবু হয়ে রয়েছে। মাথাটা ঝুঁকে মাটিতে ঠেকেছে। সবার আগে চত্বরে উঠলেন কর্নেল। বললেন, হুঁ–যা ভাবছিলাম।
খগেনবাবু ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, বোকা! বোকা! অত করে বললাম ভদ্রলোককে।
যদুপতিবাবু চারধারে টর্চের আলো ফেলছিলেন। বললেন, বিশ্বাস? জীপ নিয়ে যাও। অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এস সঙ্গে।
কর্নেল ঝুঁকে টর্চের আলোয় হতভাগ্য লোকটিকে দেখছিলেন। পিঠে তিনটি ক্ষতচিহ্ন। রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। কর্নেল বললেন, মারা গেছেন সঙ্গে সঙ্গে। খুনী শরীরের ভাইটাল পয়েন্টগুলো ভালই জানে।
এদিন আমার বৃদ্ধ বন্ধুকে অস্বাভাবিক গম্ভীর এবং অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতে দেখছিলাম। আমার কোনও প্রশ্নের জবাব দেননি। যেন আমার কথা ওঁর কানে ঢুকছিল না। গতিক দেখে মুখ বন্ধ করেছিলাম। চুপচাপ দেখে যাচ্ছিলাম ওঁর ক্রিয়াকলাপ।
ওঁর সারাটা দিনের গতিবিধি ও ক্রিয়াকলাপ বর্ণনা করতে গেলে আরব্য উপন্যাস হয়ে যাবে। ডাইরীতে যেভাবে লিখে রেখেছিলাম, সেভাবেই সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরছি।
…সাড়ে সাতটায় কর্নেলের ডাকে নিদ্রাভঙ্গ। রাতের সেই বীভৎস ঘটনার পর মন বিভ্রান্ত। গোয়েন্দাপ্রবর অভ্যাসবশে সম্ভবত প্রাতঃভ্রমণ সেরে এসেছেন। দাড়িতে সাদা কী লেগে আছে। পাখির পালক? বিষণ্ণ হেসে ফেলে দিলেন। ভীষণ গম্ভীর হাবভাব। রাজবাড়িতে ব্রেকফাস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। রেডি হতে তাড়া দিলেন। তারপর আপন মনেই বললেন, আশ্চর্য জয়ন্ত! আজও ভৈরবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের নতুন দাগ ফুটে উঠেছে। চমকে উঠলাম শুনে। এ নিশ্চয় অলৌকিক কাণ্ড।
আটটায় রাজবাড়ির গাড়ি এল। রাজবাড়ি ভৈরবমন্দিরের পেছনে। রাজবাহাদুর সুপ্রতাপ সিংহ অমায়িক মানুষ। খেতে ও খাওয়াতে ভালবাসেন। কর্নেলের মতোই প্রকৃতিবিদ্যার বাতিক আছে। কত রকম দুপ্রাপ্য অর্কিড, ক্যাকটাস, আরও বিচিত্র গাছগাছড়ার সংগ্রহ আছে। ছোট্ট একটি চিড়িয়াখানাও আছে। বেশি নেশা পায়রার। পৃথিবীর নানাদেশের পায়রা পুষেছেন। কথায় কথায় কর্নেল জানতে চাইলেন, মুসিলিটা ক্যালিটা (শব্দ দুটো এরকমই মনে হল) জাতের পায়রা আছে নাকি। রাজাবাহাদুর মুচকি হেসে চোখ নাচিয়ে বললেন, আসুন। দেখে যান। কাঠের খাঁচার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। গম্ভীর গলায় মেঘে বলে সে কী রাজকীয় হাঁক। বাড়ি কেঁপে উঠল। উঁকি মেরে দেখি, একটা সাদা পায়রা ঝিম ধরে বসে আছে খাঁচায়। ঢ্যাঙা নোগা মত এক ভদ্রলোক এলেন। মাথায় নীল টুপি, গায়ে স্পোর্টিং গেঞ্জি, পরনে আঁটো প্যান্ট, হাতে একটা ছড়ি। এসেই গাল চুলকে বললেন, তোমাকে খবর দিতে যাচ্ছিলাম। কাল বিকেলে ওড়াবার সময় মাদীটা বেশি দুরে চলে গিয়েছিল। ভাবলাম, সন্ধ্যার মুখে ফিরে আসবে। বোমের মাথায় লাল আলোটা জ্বেলে নাড়াচাড়া করলাম। ফিরে এল না।
