পাঞ্জাবির কথা ভুলেই গিয়েছিলুম, অর্থাৎ ওদিকে এতক্ষণ চোখ ছিল না। এবার দেখি, ওখানে রণধীর চোপরা বসে রয়েছে। হতভম্ব হয়ে গেলুম। সে ব্যস্তভাবে পাঞ্জাবির পকেট হাতড়াচ্ছিল রত্না হিস হিস করে উঠল বাস্টার্ড!
মেয়েদের মুখে বাস্টার্ড শুনে আমার হাসি পেল।
তারপর কর্নেল আচমকা উঠে বিকট গর্জন করলেন–চোপরা! নড়ো না! নড়লেই গুলি করব।
চোপরার দুপাশের ঝোপ ও পাথরের আড়াল থেকে ততক্ষণে কয়েকজন পুলিশ অফিসার উঠে দাঁড়িয়েছেন।
.
এরপর যা হবার তাই হল–অর্থাৎ রণধীর চোপরা চালান গেল। এখন ওসব ব্যাপার কানুনের এক্তিয়ারে। তা সব দেখার জন্য এবং তদারক করার জন্য সরকার যথেষ্ট লোকজন রেখেছেন। কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সেখানে কোনও ভূমিকা অবান্তর এবং উনি ওতে নাক গলাবেনও না। বাংলোয় আমাদের ঘরে, অর্থাৎ যে ঘরে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, আমি কর্নেল, সোনালী এবং তার বাবা অনিরুদ্ধ ব্যানার্জি ও জয়ন্তী দেবী বিকেলের চায়ের মজলিশ জমাচ্ছিলুম। দিব্য এল না। রত্না এসে বলল-দাদা চুপচাপ শুয়ে আছে।
সেটা স্বাভাবিক। বেচারা ভীষণ আঘাত পেয়েছে মনে।
সবার চোখে মুখে কৌতূহল ফুটে উঠেছিল। সুতরাং মুখপাত্র হয়ে আমিই প্রথম তুললুম– কর্নেল, চোপরা সবুজ পাঞ্জাবিতে কী খুঁজতে গিয়েছিল?
কর্নেল একটু হেসে জবাব দিলেন দীপ্তির হাতের মুঠোয় একটুকরো কাগজ ছিল। খুন করার পর চোপরা সম্ভবত তাড়তাড়িতে সেটা পকেটে ঢুকিয়েছিল। তখন তো ওর নার্ভাস অবস্থা। কে দেখে ফেলবে এই আতঙ্কে রয়েছে। তাই পাঞ্জাবি রেখে পালাবার সময় কাগজটা বের করে নেয়নি। ভেবেছিল, পরে এসে নেবে। এমন না হলে পাঞ্জাবিটা সে প্রকাশ্যে কোথাও ফেলে রাখত। কারণ তার উদ্দেশ্য দিব্যের কাঁধে দায়টা চাপানো। আসলে খুন করার পর খুনীর খানিকটা হতবুদ্ধি অবস্থা থাকে বলেই তাদের ধরা সম্ভব হয়। কোনও না কোনও ক্ষেত্রে একটু ভুল করবেই। আজ পর্যন্ত আমি খুনী দেখিনি, যে কোনও ভুল করেনি, অর্থাৎ কোনও ক্লু রাখেনি।
অনিরুদ্ধ বললেন কাগজটাতে কী ছিল? দীপ্তি তা পেল কোথায়?
বিশেষ কিছুই ছিল না। ছিল তিনটে জিরো লেখা। এটা একটা বিদেশী শত্রুরাষ্ট্রের দেশীয় গুপ্তচর এজেন্সির সাংকেতিক নাম। চোপরাকে তারাই মিঃ ব্যানার্জির পি. এ. করে পাঠাতে পেরেছিল।
অনিরুদ্ধবাবু কিছু বলতে ঠোঁট ফাঁক করলেন। কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন জানি, আপনার দোষ নেই। আপনি কী করতে পারেন? যাক গে, যা বলছিলুম। হতভাগিনী দীপ্তি তার বোকামির জন্যই কিন্তু খুন হলো। ও যেভাবেই হোক জানতে পেরেছিল যে চোপরা থ্রি জিরো দলের মেম্বার। কিন্তু কথাটা সরাসরি অনিরুদ্ধবাবুর কানে তুলতে পারত। তা না করে সে সম্ভবত চোপরাকে নিয়ে একটু মজা করতে চেয়েছিল। সে বোঝেইনি চোপরা যে দলের মেম্বার, তাদের সঙ্গে রসিকতা করার পরিণাম বড় সাংঘাতিক।
রত্না বলে উঠল–আমার মনে পড়েছে! দীপ্তি চোপরাকে দেখলেই বলত কী মশাই, তিন শূন্যের অঙ্ক মিলল? চোপরার মুখটা কেমন সাদা হয়ে যেত যেন।
তা শুনে সোনালীও বলে উঠল–হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমিও শুনেছি। ভাবতুম, নিছক, জোক করছে।
কর্নেল বললেন–চোপরা ভেবেছিল, দীপ্তির মুঠোর কাগজটা সত্যি সত্যি কোনও সাংঘাতিক দলিল–হয়তো কোনও সুত্রে দীপ্তির হাতে এসেছে। অদৃশ্য কালিতে নিশ্চয় কিছু লেখাটেখা আছে। কারণ তিনটে জিরো কোনও কাগজে দেখলেই তাকে সতর্ক হতে হবে। দীপ্তি সত্যি বড় বোকামি করেছে। তবে একটা কথা ঠিক যে ও হাতের মুঠোয় কাগজটা না রাখলেও তাকে খুন করত। কারণ হত্যার পরিকল্পনাটা সেই মন্দিরে যাবার দিনই সে করে নিয়েছে। কাজেই দীপ্তিকে একদিন না একদিন খুন হতেই হতো।
সোনালী বলল কলকাতায় ট্যাক্সির ব্যাপারটা কী হলো, কর্নেল?
কর্নেল হাসলেন। বললেন–শুধু দীপ্তিকে ফলো করা হচ্ছিল সারাক্ষণ। চোপরার দলের লোকেরা কত তৎপর, তারই প্রমাণ ওটা। আজকালের মধ্যেই সেই ট্যাক্সি চালক ধরা পড়ে যাবে। আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে পড়বে। দীপ্তি মন্দিরে যাবার দিনও যথারীতি চোপরার দলের লোক ওকে ফলো করেছিল। তা না হলে চোপরা হঠাৎ গাড়ি নিয়ে মন্দিরের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত না।
রত্না বলল কিন্তু মন্দিরে তো দীপ্তি কারও সঙ্গে দেখা করেনি।
-ওটা সম্ভব হয়নি। কারণ, রাজীব শেরগিল তখন অলরেডি নিহত।
আমি চমকে ওঠে বললুম– বুঝতে পারছিনে কর্নেল। রাজীব শেরগিলের সঙ্গে দীপ্তির আলাপ হলো কীভাবে? রাজীব কেন তাকে ওখানে যেতে বলবে?
কর্নেল জবাব দিলেন–সবটা দিব্যের মুখেই শোনা ভাল। কিন্তু সে কি এখন আসবে?
রত্না মাথা দুলিয়ে বলল–মনে হয় না। আপনিই বলুন কর্নেল।
–দিব্য পরে পুলিশকে একটা লং স্টেটমেন্ট দিয়েছে। হয়তো চেপেই যেত সব। কিন্তু তারই পাঞ্জাবি চুরি করে চোপরা তার ঘাড়ে খুনের দায় চাপাতে চেয়েছিল। এতে ওর ভীষণ রাগ হয়ে গেছে। তাই সব বলে দিয়েছে। সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলি।…চোপরার সঙ্গে যেদিন একটা রেস্তোরাঁয় তার মারামারি হয়না, ভুল বলছি, প্রকৃতপক্ষে মারামারি হয়নি–হবার উপক্রম হয়েছিল এবং রাজীব সেটা থামিয়ে দেয়, সেদিন কিন্তু দীপ্তিও সেখানে উপস্থিত ছিল। চোপরার সঙ্গে আগে থেকেই দীপ্তি ওখানে গিয়েছিল। ইদানিং ওরা ঘনিষ্ঠ হচ্ছিল, তোমরা তা জানো। যাই হোক, স্টেশন থেকে রাজীবকে নিয়ে দিব্য দৈবাৎ ওখানে ঢোকে। বলাবাহুল্য, দীপ্তিকে চোপরার সঙ্গে দেখে মনে মনে জ্বলে ওঠে। সুযোগ খোঁজে চোপরাকে পিটুনি দেবার।
