চোপরার ভঙ্গিতে আমি গম্ভীর মুখে বলে উঠলুম–দ্যাটস ন্যাচারাল।
কেউ তাতে হাসল না। কর্নেল ছাড়া। কর্নেল বললেন–দ্যাটস রাইট। তা, দিব্যও ঠিক রত্না বা সোনালীর মতো দীপ্তিকে, কী মশাই, জিরো জিরোর অঙ্ক মিলল?–চোপরার উদ্দেশ্যে এই জোক করতে শুনেছে। সেদিন ওখানে দীপ্তি, মারামারি থামাতে বলে ওঠে–এই থ্রি জিরোটিকে নিয়ে আর পারা যায় না। দিব্য লক্ষ্য করেনি কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি রাজীব শেরগিল খুবই চমকে উঠেছিল। সে থ্রি জিরো দলের লোক। কিন্তু কোনও কারণে সম্ভবত দলের ওপর ক্রুদ্ধ হয়েই হোক, অথবা নিছক অর্থের লোভে রানীডিহি এসেছিল। অর্থাৎ চোপরাকে ব্ল্যাকমেল করতে অথবা প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যে অয়েল ডিরেক্টরের কানে সব তুলে দিতে। আমার ধারণা, চোপরাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সে অনিরুদ্ধবাবুর কাছে সব ফাঁস করতে চেয়েছিল। যাইহোক, রাজীব বা দীপ্তি এখন বেঁচে নেই। কিন্তু দীপ্তির ঘরে একটা চিঠি পুলিশ আবিষ্কার করেছে। রাজীব শেরগিলের হাতের লেখার সঙ্গে মিলে যায়। নীচে নামের বদলে তিনটে জিরো নেই অনিরুদ্ধবাবুকে লেখা সেই চিঠির মতো। সোজা নামসই রয়েছে চিঠিতে। বলাবাহুল্য ইংরাজিীতে লেখা : …থ্রি জিরোর রহস্য কি জানেন? না জানা থাকলে ১৩ তারিখে সকাল নটায় পাতালকালীর মন্দিরে আসুন। কিন্তু দীপ্তি একা যেতে সাহস করে নি। রত্নার বুদ্ধি ও সাহসে তার আস্থা ছিল স্বাভাবিক। তাই রত্নাকেই সঙ্গে নেয়। দীপ্তি জানত না যে ট্যাঙ্কের কাছে পাওয়া লাশটা রাজীবের।
সোনালী বলল-ওদিন আমার একটু জ্বর মতো হয়েছিল।
আনলাকি থার্টিন নিহত রাজীবের কাছে ওই দিনকার দিল্লীর রিজার্ভেশন টিকিট পাওয়া গেছে। তার মানে, দীপ্তির সঙ্গে দেখা করে এবং সম্ভবত সদুপদেশ দিয়ে সে নিরাপদে দিল্লী চলে যাবে ভেবেছিল। সদুপদেশ দেবার কারণ, দিব্য তাকে বলেছিল যে দীপ্তির সঙ্গে তার বিয়ের কথা ছিল। কিন্তু বিয়েটা আর করা যাবে না। তখন রাজীব বলে, আমি বুঝিয়ে বলব। তুমি ভেবো না। চোপরাকে আমি চিনি। ও খুব খারাপ লোক। দীপ্তিকে সতর্ক করা দরকার। চোপরার হালহদিশ সব ওকে বাতলে দিয়ে যাবো।
এতক্ষণে জয়ন্তীদেবী মুখ খুলে বললেন–এত সব কাণ্ড ভেতর-ভেতর!
কর্নেল বললেন–হ্যাঁ। এ খুব জটিল কেস। কিন্তু খুনের প্রসঙ্গে এলে বলব, এত সহজ এমন চমৎকার মোডস অফ অপারেণ্ডি খুব কমই দেখেছি। আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, চোপরা পুবের রাস্তায় গিয়ে বাগান হয়ে এই বাংলোর পূর্ব-উত্তর কোণে দিব্যের ঘরে ঢোকে এবং সবুজ পাঞ্জাবিটা নিয়ে চলে যায়। চোখে পড়ে শুধু পরিচারিকার। তার চোখে না পড়লেও চোপরাকে আমরা ধরে ফেলতুম। সে পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। তারপর কী ঘটেছে, তাও দেখতে পাচ্ছি। সে দীপ্তিকে বলছে–তোমার ছুরিটা খসে যাচ্ছে যে! ঠিক করে দিই। তারপর…থাক। বড় বীভৎস ঘটনা।
রত্না আস্তে বলল–আমি ওকে দেখে দাদা ভেবেছিলুম!
কর্নেল বললেন–দিব্যও দেখেতে পেয়েছিল। সবুজ পাঞ্জাবিটা তার মনে কিছুটা সন্দেহ জাগিয়াছিল কিন্তু জড়িয়ে পড়ার ভয়ে সে চুপ করে গিয়েছিল।
বললুম–সব তো বুঝলুম! কিন্তু লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া?
কর্নেল চুরুট বের করে বললেন–ওই পাতায় একটা সাবোটাজের বিবরণ আছে। অনিরুদ্ধবাবুকে সাবোটাজের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিল রাজীব।
অনিরুদ্ধ শিউরে উঠে শুধু বললেন হ্যাঁ।
ত্রিশূলে রক্তের দাগ
সম্প্রতি চিৎপুর এলাকায় আন্তর্জাতিক চোরাচালানীচক্রের কার্যকলাপ ফাঁস হাওয়ার ঘটনা সব কাগজে বেরিয়েছিল। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার পক্ষ থেকে এর একটা ফলোআপ সংগ্রহের জন্যে বেরিয়ে ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেলাম। ঘিঞ্জি রাস্তা। বেলাও পড়ে এসেছিল। তার ওপর ঠিক এই সময়টাতেই লোডশেডিং। বিরক্ত হয়ে গাড়িতে বসে সিগারেট টানতে টানতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখছিলাম, আর এই অব্যবস্থার জন্যে ট্রাফিক পুলিশদেরই দায়ী করছিলাম। লরি বা ট্রাকের প্রতি তাদের মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ যে অনেক সময় জ্যামবিভ্রাট বাধায়, তাতে কোনও ভুল নেই।
বাঁ পাশে বসে থাকার ফলে পরপর কয়েকটা হার্ডওয়্যার স্টোর্স, যাত্রা, থিয়েটারের পোশাকের দোকান, এবং তার মাঝখানে একটা বইয়ের দোকান চোখে পড়ল। আনন্দময়ী পুস্তক ভাণ্ডার। নিশ্চয় সুখ্যাত বটতলা প্রকাশনের ঐতিহ্যসম্পন্ন দোকান। সামনের শোকেসে যাত্রানাটক, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীদাসী মহাভারত, প্রভাস খণ্ড, বৃহৎ তন্ত্রসার ইত্যাদি টাইটেল সাজানো ছিল। আলো কম হলেও, আমার দৃষ্টিশক্তি মোটামুটি ভালই। তাছাড়া পঞ্জিকার পাতায় এমন বইয়ের বিজ্ঞাপন আমাকে আকৃষ্ট করে। এইসব দোকান যেন এক রহস্যময় পৃথিবীর তথ্যে ভরা। বশীকরণতন্ত্র ডাকিনীতন্ত্র, ভোজবিদ্যা কামাখ্যাতন্ত্র…এক আশ্চর্য অন্ধকার মায়ালোকের দিকে অঙ্গুলিসঙ্কেত করে যেন।
হঠাৎ হকচকিয়ে গেলাম। এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ আনন্দময়ী পুস্তক ভাণ্ডার থেকে বেরোলেন। তার হাতে লাল মলাটের একটা বই। তার মাথায় ধুসর টুপি, মুখের সাদা দাড়ি, এবং বাঁ হাতে একটা বিদঘুটে গড়নের যষ্ঠি। ফুটপাতে নেমেই তিনি কয়েক পা এগিয়ে অন্য একটা দোকানে ঢুকলেন। এ দোকানটার সাইন বোর্ডে লেখা আছে : আর দাশ অ্যাণ্ড কোং। যাত্রা-থিয়েটারের যাবতীয় পোশাক, স্টেজ, সিন সুলভে ভাড়া পাওয়া যায়। পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
