দেখে আঁতকে উঠলুম। বললুম–দিব্য এমন বোকার মতো কাজ করে ফেলল?
কর্নেল বললেন-সবুজ পাঞ্জাবি পরে খুন করার উদ্দেশ্য বুঝতে পারছ? সবুজ ঝোপঝাড় বা গাছের মধ্যে ক্যামোফ্লেজের কাজ করবে। কারো হঠাৎ নজরে পড়বে না। দ্বিতীয়ত…বলে উনি থেমে গেলেন। সাবধানে পাঞ্জাবিটার পকেটের দিকটায় আঙুলের চাপ দিলেন।
বললুম–কী? ·
–সিগ্রেটের প্যাকেট। মার্ডার ফানের ক্লু হিসেবে একটা টুকরো ফেলা হয়েছিল। কিন্তু দুটো পাওয়া গেছে। তার মানে পকেটে সিগ্রেট থাকায় আরেকটা সিগ্রেটের টুকরো ফেলে রাখা সম্ভব হয়েছে। খুনী যেন একটা খেলার ক্লু রেখে দিতে চেয়েছে। কেন?
প্রশ্নটা কর্নেল আপন মনেই করলেন। বিরক্ত হয়ে বললুম–খুনী-খুনী করছে কেন এখনও? দিব্য বললেই আমার কাছে আপনার জটিল কথাবার্তার মানে বোঝা সহজ হয়ে ওঠে।
কর্নেল ঘুরে বললেন–দ্যাট ডিপেণ্ডস্ ডার্লিং!
অন হোয়াট?
–আরও সাক্ষ্য-প্রমাণ।
–যেমন?
–দিব্য এই পাঞ্জাবিটা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল, নাকি পরে পশ্চিমের দিকে ঘুরতে যাবার সুযোগে বাংলোয় ঢুকে নিয়ে এসেছিল?
ভেবে বললুম–পশ্চিমেই তো বাংলো বাড়ির সদর গেট। কারো চোখে পড়া স্বাভাবিক।
কর্নেল বললেন–ঠিক আছে। এটা এখানেই থাক। আমরা আপাতত বাংলোয় ফিরি। একটা কথা জয়ন্ত, তুমি ঘুণাক্ষরে একথা কারো কাছে প্রকাশ করবে না।
নিশ্চয় নয়।
হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল একটু হেসে বললেন–আমার ভয় হয় জয়ন্ত! যুবতী, স্ত্রীলোকদের প্রতি তুমি সময়ে খুবই পক্ষপাতিত্ব দেখাও।
হো হো করে হেসে বললুম–দ্যাটস ন্যাচারাল!
–ওটা চোপরার মুদ্রাদোষ, তাই না জয়ন্ত?
কী কথায় কী! বললুম–হ্যাঁ। এবং আমার ক্ষেত্রে সঙ্গদোষ। চোপরার কাছে শুনে এই হয়েছে।…
আন্দাজ ফুট বিশেক ওপরে উঠেছি, হঠাৎ কর্নেল দাঁড়ালেন। তারপর ফিস ফিস করে বললেন–উঁহু, হয়তো খুবই ভুল করছি। তুমি এক কাজ কোরো জয়ন্ত। এখানে ঝোপের আড়ালে বসলে পাঞ্জাবিটার ওপর লক্ষ্য রাখা যায়। তোমার রিভলভারটা কি কাছে আছে?
না। ওসব নিয়ে ঘোরাঘুরি করি নাকি? কী দরকার?
–ঠিক আছে। কোনও দরকার নেই। তুমি প্লীজ একটু সাহায্য করো আমাকে। এখানে বসে চুপচাপ লক্ষ্য রাখো। কেউ এসে যদি দেখ পাঞ্জাবিটা সরাচ্ছে– কিংবা কিছু করছে–তুমি কিছু করবে না। সে যাই করুক, শুধু তাকে চিনে রাখবে। ব্যস!
বেশ।
–ভয়ের কোনও কারণ নেই ডার্লিং! যথাসময়ে আমি ফিরে আসব।
–অত বলার কী আছে? আজ তো নতুন আপনার চেলাগিরি করছি নে। বলে একটু হাসলুম। অবশ্য আমার বুকে কাঁপুনি শুরু হয়েছে ঠিকই।
কর্নেল কাঁধে থাপ্পড় মেরে স্নেহ প্রকাশ করে চলে গেলেন। আমি ওৎ পেতে বসলুম। কর্নেল না বলে দিলেও বুঝেছি, সিগ্রেট খাওয়া চলবে না। সকালের রোদ বেয়াড়া রকম বেশি তাপ ছড়াচ্ছে। ছায়ায় বসে আছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিকে মন দিতেও পারছি না–এ এক অদ্ভুত অবস্থা। প্রায় আধ ঘণ্টা কেটে গেল।
হঠাৎ দেখি নীচরে একটা ঝোপের মধ্যে রত্না দাঁড়িয়ে আছে। ভীষণ চমকে উঠলুম। ভুল দেখছি না তো?
ও এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। মনে হলো, কিছু খুঁজছে। তারপর পা বাড়াল। বুঝলুম, ওদের জেরা শেষ করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তো দিব্যকেই শুধু আটকে রেখেছে। রত্না কি পাঞ্জাবিটা খুঁজতেই এসেছে? ও কীভাবে জানল যে পাঞ্জাবিটা এখানেই লুকানো আছে? একটু পরেই বুঝলুম, পাঞ্জাবিটা কোথায় আছে, রত্না জানে না। কারণ সে ওটার পাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করল। তারপর আরও নীচে নামতে থাকল। মিনিট পাঁচেক পরে সে ঘুরল এবং সোজা আমার দিকে ওঠা শুরু করল। আমি একটু সরে বসলুম। কিন্তু সে সোজাসুজি উঠে এসে যেই ডানদিকে ঘুরেছে, আমার মধ্যে হঠকারী ঝোঁক এসে গেল। কর্নেলের নিষেধ ভুলে গেলুম। আসলে আমার মধ্যে গোয়েন্দাসুলভ কৌতূহলের তাগিদ চাগিয়ে উঠেছিল সম্ভবত। আমি গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠলুম-মিস চ্যাটার্জি।
রত্না ভীষণ চমকে গেল। তারপর অপ্রস্তুত হেসে বলল–এই মানে…একটু ঘু ঘুরতে বেরিয়েছি। আপনি কী করছেন? নিশ্চয় আমার মতো ঘুরতে?
খুবই গোমড়ামুখে বললুম–মোটেও না। অন ডিউটিতে আছি।
রত্না হাসবার চেষ্টা করে বলল–তাই বুঝি? আচ্ছা চলি।
–মিস চ্যাটার্জি, শুনুন!
রত্না দাঁড়াল। সে ভীষণ ঘামছে। ঠোঁট কাঁপছে। মনে হলো, ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলবে এক্ষুণি। তারপর অতিকষ্টে বলল-বলুন।
কী খুঁজতে এসেছেন?
–দাদার পাঞ্জাবিটা।
কীভাবে জানলেন যে আপনার দাদার পাঞ্জাবিটা এখানে লুকোনো আছে?
–আমি পাঞ্জাবি-পরা দাদাকে দেখতে পেয়েছিলুম দীপ্তির কাছে।
-চোপরাও দেখেছিল। যাক গে, ওটা দিয়ে কী হবে এখন? আপনার দাদার বিরুদ্ধে তো অন্য সব প্রমাণ আছে।
না কিছু নেই। শুধু এটা ছাড়া। …বলে রত্না হু হু করে কেঁদে উঠল।
একটু পরে বললুম–আপনি এত সহজে ভেঙে পড়তে পারেন। অথচ পুলিশের রেকর্ডে আছে, আপনি নাকি নকশালপন্থী ছিলেন?
রত্না ফোঁস করে উঠল–একসময় ছিলুম। এখন আর নেই।
এই সময় চোখে পড়ল ওপরের দিকে ঝোপের কাছ থেকে কর্নেলের টুপিপরা মুণ্ডুটা দেখা যাচ্ছে। তখনি রত্নাকে চুপ করতে এবং সরে যেতে ইশারা করলুম। কিন্তু যা হবার হয়ে গেছে ততক্ষণে। কর্নেল গুম হয়ে গুঁরি মেরে এগোচ্ছেন– রত্নাও দেখতে পেল। কাছে এসে কর্নেল হঠাৎ দুজনকে টেনে বসিয়ে দিলেন এবং ফিস ফিস করে বললেন–চুপ!
