রত্না জোরে ঘাড় নাড়ল। না, না। ও তখন জোর আপত্তি করেছিল। এসব বাজে খেলা–অন্য কিছু ভাবো। দীপ্তি বলেছিল। পরে বাসায় ফিরে সোনালীকে মার্ডার ফানের কথা বললে সোনালীও আপত্তি করেছিল। কিন্তু শেষে দেখি, দীপ্তিই মার্ডার ফানের ব্যাপারে জেদ ধরেছে।
–আপনি যে প্রথমে সোনালীকে মার্ডার ফানের কথা বলেছিলেন, তা সোনালী কিন্তু আমাদের বলেনি।
আমার পাশ থেকে সোনালী বলল, ভুলে গিয়েছিলুম। এখন মনে পড়ছে, রত্না বাইরে থেকে ফিরে ওই প্রোপোজালটা দিয়েছিল।
কিষাণ সিং ফের হাত তুলে বললেন কথা বলবেন না, প্লীজ।
হঠাৎ কর্নেল একটু ঝুঁকে প্রশ্ন করলেন–ইয়ে রত্না, তোমার দাদা দিব্যেন্দুর কি কোনও সবুজ পাঞ্জাবি আছে?
রত্না বলল–হ্যাঁ। কেন?
অমনি একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। দিব্যেন্দু আমাদের কাছ থেকে তড়াক করে এক লাফ দিয়ে উঠে দরজার দিকে এগোল। একজন পুলিশ অফিসার ওর কলার ধরে ফেললেন। দিব্য ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছিল। পারল না।
এই সময় কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন–মিঃ সিং! আমার মনে হচ্ছে আপাতত এ পর্যায় এখানেই শেষ। অবশ্য আপনার ইচ্ছে করলে এগোতে পারেন। আমি একটু বাইরে যেতে চাই।
কিষাণ সিং একটু হেসে বললেন–ক্ষমা করবেন কর্নেল। দিস ইজ দা অফিসিয়াল প্রসিডিওর। আমরা এখানেই থামতে পারি না। বাড়ির সারভ্যান্টদের প্রশ্ন করা বাকি আছে।
কর্নেল জিভ কেটে বললেন–সরি, ভেরি সরি মিঃ সিং। দ্যাটস কারেক্ট। বলে টেবিল থেকে উঠে এসে আমার দিকে তাকালেন। তারপর কিষাণ সিং-এর দিকে ঘুরে বললেন মিঃ সিং! আমার এই হতভাগ্য বন্ধুটিকে কি বাইরে যাবার অনুমতি দেবেন?
কিষাণ সিং হেসে বললেন–অবশ্যই।
–এস জয়ন্ত, আমরা একবার বাইরে খোলা হাওয়ার গিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করি।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। বাইরে লনে একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে বললুম–কর্নেল, তাহলে দিব্যকে মনে হচ্ছে গ্রেফতার করা হলো।
কর্নেল আনমনে জবাব দিলেন তাই মনে হচ্ছে। দিব্যেন্দুর ওই সবুজ জামাটাই ভাইটাল এ কেসে। অবশ্য যদি চোপরার কথাটা সত্যি হয়, তবেই। যাক গে, এস– আমরা একবার নদীর ধারটা ঘুরে আসি।
নদীর ধারে যেতে হলে এই ছোট রাস্তা ধরে যেতে হবে, কিন্তু কর্নেল ওদিকে গেলেন না। সোজা অকুস্থলের পাথরটার কাছ দিয়ে ঝোপঝাড় ভেঙে চললেন। দেখলুম, দীপ্তির লাশটা সরানো হয়েছে। পাথরের একধারে কিছু রক্ত লেগে আছে। ঘাসে ও মাটিতেও আছে। সেটা সত্যিকার রক্ত হতেও পারে, আবার সোনালীর পেন্টও হতে পারে। কিন্তু একবার তাকিয়েই চোখ ফেরালুম। যেন দীপ্তিকে দেখতে পাচ্ছিলুম–একটু ঝুঁকে পাথরে গাল রেখে শুয়েছে। তাজা ফুলের মতো একটা মেয়ে–স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য নিয়ে জন্মেছিল এই কুৎসিত পৃথিবীতে। খুব কষ্ট নিয়েই পা বাড়ালুম। জানতুম কর্নেল বিস্তর পাহাড়ে চড়েছে। তাই এই ঢালু দুর্গম জায়গায় ওঁর কোনও কষ্ট না হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু আমার মতো আনাড়ির পক্ষে মারাত্মক। একখানে পাথরে পা স্লিপ করে গড়িয়ে পড়লুম এবং গড়াতে গড়াতে প্রায় পনের কুড়ি ফুট নীচে একটা গর্তে গিয়ে আছাড় খেলুম। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছি, শুনি কর্নেল ওপরে দাঁড়িয়ে হাসছে।
রেগে বললুম–আর কখনও কোথাও যাব না আপনার সঙ্গে। গেলেই খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়ব এবং বিদঘুটে কাণ্ড ঘটবে! ভ্যাট!
ওপর থেকে নেমে এসে কর্নেল একটু হেসে বললেন–ডার্লিং, মাঝে মাঝে আছাড় খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। ছেলেবেলায় মানুষ প্রায়ই আছাড় খায়। এতেই বোঝা যায় প্রকৃতি ওইভাবে তাকে স্বাস্থ্য আয়ু সাহস ও সহ্যশক্তি যোগান দেন। বড় হয়ে আছাড় খাবার ব্যাপারে সতর্ক হয় মানুষ। এটা প্রকৃতির বিরুদ্ধতা। এ জন্যেই তো প্রকৃতি সুযোগ পেলেই মনে করিয়ে দেন যে… ।
কর্নেল প্রায়ই উদাত্তকণ্ঠে লেকচার দিচ্ছিলেন, হঠাৎ থেমে কি যেন দেখতে থাকলেন কুঞ্চিত ভুরু। তারপর বাইনোকুলারটি চোখে তুললেন। কিন্তু সর্বনাশ! নির্ঘাৎ বাতিকগ্রস্ত প্রকৃতিবিদ কোনও বিরল প্রজাপতি অথবা পাখি দেখতে পেয়েছেন এবং তার মানে এবার নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে হয়তো গোটা দিনটাই পাখিটার পিছনে বনবাদাড় নালা ডিঙিয়ে ঘোরাঘুরি করবেন–আমাকেও হন্যে করবেন!
কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে সম্মোহিত মানুষের মতো–নিশির ডাকে মানুষ যেমন যায়, এগোতে থাকলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলুম। বাংলোয় ফিরব। শরীর ক্লান্ত। মনও ভাল নেই। সেই ঢাল জায়গা বেয়ে অনায়াসে লেজে ভর করে দাঁড়ানো গিরগিটির মতো কর্নেল ফাঁকা বরাবর অন্তত একশো ফুট এগোলেন। তারপর একটা প্রকাণ্ড পাথরের সামনে হাঁটু ভাজ করলেন। ওই অবস্থায় ওঁকে প্রায় তিন মিনিট চুপচাপ থাকতে দেখলুম। তারপর ঘুরে আমার দিক হাত নেড়ে বললেন–জয়ন্ত, দেখে যাও।
পৌঁছানো আমার পক্ষে বেশ কষ্টকরই হলো। কিন্তু কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল। গিয়েই যা দেখলুম, অবাক হয়ে গেলুম। রণধীর চোপরার কথা মিথ্যে নয়–একটা সবুজ পাঞ্জাবি সাবধানে পাথরের ফাটলে রাখা হয়েছে।
কর্নেল বললেন–দিব্যের বাঁচা কঠিন হয়ে গেল। চোপরা বলেছে একটা বেঁটে মোটাসোটা নোক দেখেছিল। আসলে একটা জামা পরা অবস্থায় এই পাঞ্জাবি পরলে দূর থেকে তাই-ই দেখাবে। জয়ন্ত, দেখতে পাচ্ছ। পাঞ্জাবিতে রক্তের ছোপ লেগে আছে।
