চোপরা একটু ভেবে নিয়ে বললে–আমি কিন্তু স্ট্রেটকাট কথাবার্তা বলা পছন্দ করি। এজন্যই দিব্যের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে বেধে যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস দিব্যকেই সতর্ক করতে চেয়েছিল দীপ্তি। এই সঙ্গে লক্ষ্য করবেন, দিব্যের সঙ্গে ওর বিয়ে প্রায় ঠিক। অথচ ও দিব্যকে এড়িয়ে চলছিল ইদানিং। অতএব আমার ডিসিশানে দাঁড়াচ্ছে, দীপ্তি দিব্যের কার্যকলাপ টের পেয়েই ঘৃণা করে সরে এসেছিল।
এবং আপনার ঘনিষ্ঠ হয়েছিল!
–কারেক্ট স্যার। ভেরি ভেরি কারেক্ট। দিব্যের উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী আমি। আমি ছাড়া দিব্যের সঙ্গে লড়ার তাকত এখানে কারো নেই, দীপ্তি জানত। কিংবা এও হতে পারে, আমি অয়েলরিফাইনারির ডিরেক্টরের পি.এ.। আমার সঙ্গে মেশার মধ্যে দীপ্তির একটা উদ্দেশ্য থাকতেও পারে। তা হলো- দিব্যকে সতর্ক করে দেওয়া সাবধান, জানি কর্তৃপক্ষের কানে তুলে দিতে পারি! ইজ ইট ইল্লজিক্যাল?
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন রাইট, রাইট। মিঃ সিং! এবার আপনি কিছু জানতে চাইলে প্রশ্ন করুন।
কিষাণ সিং বললেন না। আমার প্রশ্ন নেই। নেক্সট রত্না চ্যাটার্জি।…
.
রত্না সাদা মুখে এল। যন্ত্রের মতো হাত তুলে নমস্কার করল। দেখলুম ওর পায়ের কাছে শাড়ির পাড় থরথর করে কাঁপছে।
–আপনি রত্না চ্যাটার্জি?
হুঁ।
বাবার নাম, ঠিকানা, পেশা এসব কিছুই ওকে জিজ্ঞেস করা হলো না, এতে অবাক হলুম। কিষাণ সিংয়ের কাছে একটা ফাইল ছিল। ফাইলটা খুলে আধ মিনিট কী দেখার পর উনি মুখ তুললেন। তারপর বললেন-দীপ্তির সঙ্গে গত ১৩ই সেপ্টেম্বর সকালে আপনি পাতালকালীর মন্দিরে গিয়েছিলেন কি?
রত্না মাথা দোলাল।
-কেন?
রত্না একটু ইতস্তত করে আস্তে বলল–যে জন্যে সবাই যায়!
মন্দিরে যাবার কথা কে তুলেছিল? আপনিনা দীপ্তি?
–দীপ্তি।
দীপ্তি ভক্তিমতী মেয়ে ছিল–এমন কথা আমরা এখনও কারো কাছে শুনিনি। ওর মামা-মামী এবং মামাতো ভাই-বোন বরং বলেছেন, দীপ্তির ওসব বিশ্বাস ছিল না। আপনি কী বলেন?
হ্যাঁ। ও নাস্তিকটাইপ ছিল। বরাবর ধর্মটর্ম নিয়ে ঠাট্টা করত।
–তাহলে বলুন দীপ্তি পাতালকালীর মন্দিরে নিছক বেড়াতে গিয়েছিল?
আমাকে তাই বলেছিল। পরে অবশ্য…
–হুঁ, বলুন।
পরে আমার সন্দেহ হয়েছিল, ওর যেন অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে।
–সেটা কী?
কারও সঙ্গে দেখা করা।
–কেন এমন মনে হলো আপনার?
–ওর চোখমুখের ভাব দেখে। খুব খুঁজছিল–মানে ভিড়ের সব মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। তা লক্ষ্য করে আমি ওকে বলেছিলুম, কাকেও খুঁজছিস নাকি রে? ও জবাব দিয়েছিল, না, এমনি। চেনা কেউ আছে নাকি দেখছি। কিন্তু কারও সঙ্গে ও কথা বলেনি শেষ পর্যন্ত। অবশ্য, আমার খটকাটা থেকেই গিয়েছিল। ফেরার পথে যখন ওকে চেপে ধরলুম, ও কবুল করল না। আগের মতোই নিছক বেড়াতে আসার কৈফিয়ত দিল। তখন বললুম– তোর কি হঠাৎ দেবদেবতায় বিশ্বাস ফিরে এসেছে? দীপ্তি হাসল শুধু। ভাবলুম, দাদার সঙ্গে একটা কিছু গণ্ডগোল হয়েছে, তাই হয়তো। মনে অশান্তি চলছে বড্ড। পাতালেশ্বরীর কাছে মনে মনে তাই প্রার্থনা করে গেল। অবশ্য খটকাটা আমার থেকেই গেল।
একটু ভেবে ও ফাইলটা দেখে কিষাণ সিং বললেন বাড়ি থেকে মন্দির এবং মন্দির বাড়ি সারাক্ষণ আপনি ওর সঙ্গে ছিলেন?
-হ্যাঁ।
যাবার সময় কিসে গেলেন?
–রিকশোয়।
–ফিরলেন কিসে?
রণধীরদার গাড়িতে। হঠাৎ পেয়ে গেলুম। ও স্টেশন থেকে আসছিল।
–আমরা সেটা জানি। রণধীর চোপরার গাড়িটা আপনাকে আগে নামিয়ে দিয়ে পরে দীপ্তিকে পৌঁছে দিতে যায়। অথচ আগেই দীপ্তির মামার বাসাটা পড়ে। তাই না?
–হ্যাঁ। ব্যাপারটা আমার খারাপ লেগেছিল নিশ্চয়। চোপরার সঙ্গে ইদানীং ওর ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। দাদার জন্যে আমার কষ্ট হত। কিন্তু এসব তো দীপ্তিকে বলা যায় না।
যাকগে, এবার বলুন, গাড়িতে আপনারা কী আলোচনা করেছিলেন?
–সোনালীর জন্মদিনের কথা। রণধীরদা বরাবর সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দেয়। ন্যাচারালি ওর সঙ্গে এ নিয়ে কথা হচ্ছিল।
–আপনারা কলকাতা গিয়ে কর্নেল সরকারকে নেমন্তন্ন করবেন, একথাও নিশ্চয় উঠেছিল?
হুঁ।
-চোপরা কর্নেল সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করেছিলেন?
না। মানে জিগ্যেস করল যে ভদ্রলোক কে? আমরা ওঁর পরিচয় দিলে ও খুব উৎসাহ দেখিয়ে বলল, দারুণ জমবে! গোয়েন্দাদের কখনও দেখিনি। তারপর কথায় কথায় ফাংশানের ডিটেলস এসে পড়ল। তখন রণধীরদা বলল, এক কাজ করা যায়। অ্যাজ ইউ লাইক ইট খেলার বদলে অন্য কোনও ফান হোক না? মার্ডার ফান! গোয়েন্দা ভদ্রলোককে নিয়ে মজা করা যাক।
ঘরের সবাই নড়ে বসলেন। আমরা কজন, সোফায় বসে আছি যারা, তারাও ঘুরে টেবিলের দিকে তাকালাম। আড়চোখে দেখি, চোপরা শুকনো হাসছে, কর্নেল হেসে উঠলে ওই ভাবটা ঘুচে গেল।
কর্নেল বললেন–তাহলে দীপ্তির মাথায় মার্ডার ফানের প্রস্তাবটা প্রথম ওঠেনি, বোঝা গেল।
আমাদের পাশ থেকে চোপরা বলে উঠল–দ্যাটস ন্যাচারাল! আমি আগাথা ক্রিস্টি প্রচুর পড়েছি। তা থেকেই ওটা মাথায় এসেছিল। নিশ্চয় এটা কোনও ক্রাইম নয়!
কিষাণ সিং হাত তুলে বললেন–আপনি কোনও কথা বলবেন না, প্লীজ।
রত্না ক্রমশ আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠেছে। সে বলল–কিন্তু এটা সত্যি যে দীপ্তি নিজেই ভিকটিম হতে চেয়েছিল।
–ওই গাড়িতে বসেই কি ভিকটিম হবার প্রস্তাব দীপ্তি দিয়েছিল?
