—হ্যাঁ।
–আপনাকে মিঃ অনিরুদ্ধ ব্যানার্জি কাছে এনে রেখেছেন আপনার স্বভাব শোধরাতে। অস্বীকার করে লাভ নেই। অনিরুদ্ধবাবুর কাছেই আমরা সব শুনেছি।
না। মেসোমশাই আমার চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন বলে ডেকেছিলেন। আমার বোন রত্নার কাছে জানতে পারেন।
–আপনার বোন রত্নার নামেও কিছু রেকর্ড আছে দিব্যবাবু।
দিব্য মুখ তুলল। সাদা হয়ে গেছে মুখটা।
রত্না একসময় নকশালপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তাই ওকেও আপনার বাবা এখানে পাঠিয়ে দেন। আমাদের ধারণা, আপনারা ভাইবোন দুজনেই সেই দলের সঙ্গে এখনও যুক্ত। অস্বীকার করতে পারেন?
দিব্য হাঁফাতে হাঁফাতে বলল–মিথ্যা। একেবারে মিথ্যা। কে বলল এসব?
রেকর্ড। আচ্ছা, এবার বলুন, গত সপ্তাহে মিঃ চোপরা আর আপনি সান ভিউ রেস্তোঁরায় ঘুষোঘুষি করেছিলেন। আপনাদের সঙ্গে আরও একজন ছিল। তাই না?
–হ্যাঁ। চোপরা আমাকে জাত তুলে গাল দিয়েছিল।
–আপনাদের তৃতীয় লোকটির নাম বলুন।
ও আমার বন্ধু। দিল্লিতে থাকত। নাম রাজীব শেরগিল। এখানে বেড়াতে এসেছিল। ওর কথাতেই তর্ক বাধে। শেষে ঝগড়া হয় চোপরার সঙ্গে। প্রভিন্সিয়ালিজম নিয়ে।
–আমরা জানি রাজীব শেরগিলের বয়স চল্লিশের ওপারে। আপনি তিরিশের নীচে। বন্ধুতার অবলম্বনটা কী?
দিল্লিতে আলাপ হয়েছিল। আলাপ থেকেই বন্ধুতা। কেন? ওই জয়ন্তবাবু যদি এই বৃদ্ধ কর্নেলসায়েবের বন্ধু হতে পারেন–আমার বেলা দোষ হবে কেন?
কর্নেল হো হো করে হেসে উঠলেন। কিষাণ সিং বললেন–আপনি নিশ্চয় জানেন, ওয়াটারট্যাংকের কাছে যে লোকটির লাশ পাওয়া গেছে–সে লোকটাই সেই রাজীব শেরগিল?
দিব্য মুখ নামিয়ে বলল–হ্যাঁ।
–আমরা আপনাকে ওই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে গ্রেফতার করতে পারি।
দিব্য হাঁফাতে হাঁফাতে বলল–কেন? আমি ওকে খুন করিনি। কেন ওকে খুন করব?
কিষাণ সিং একটু হেসে বললেন ঠিক আছে। এবার বলুন, এই সিগ্রেটের টুকরো দুটো মার্ডার ফানের ক্লু হিসেবে আপনিই কি ফেলে রেখেছিলেন ওখানে?
কাগজের মোড়ক খুললে দিব্য দেখে নিয়ে বলল–আমি তো মোটে একটা টুকরো ফেলেছিলুম। আর…এ কী! দুটোই যে আমার ব্রাণ্ডের!
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন–বোঝা যাচ্ছে, খুনী ক্লুর ওপর গুরুত্ব দিতে চেয়েছে।
কিষাণ সিং বললেন–ছোরার বাঁটে আঙুলের ছাপ থাকবে।
দিব্য বলে উঠল–হাতে দস্তানা পরলে?
অমনি কিষাণ সিং একটু ঝুঁকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন–আপনি বলছেন! মাই গুডনেস! কীভাবে জানলেন? পরেছিলেন তাই না?
দিব্য থতমত খেয়ে বললে-জাস্ট কমনসেন্স!
এনা! আপনি ওখানে গিয়ে বসুন। অ্যাণ্ড নেক্সট মিঃ রণধীর চোপরা।
.
রণধীর স্মার্ট হয়ে হাসিমুখে ঢুকল। নমস্তে করে বসল। কিষাণ সিং তার প্রাথমিক পরিচয় যথারীতি নিয়ে জেরাপর্বে চলে গেলেন। লক্ষ্য করলুম, দিব্যর সঙ্গে ওর ঝগড়া বা দীপ্তিসংক্রান্ত কোনও প্রশ্নই করছেন না। আজ সকালের ঘটনাই তুলছেন।
–আচ্ছা মিঃ চোপরা, আপনি যখন পুবদিকে বড় রাস্তায় গেলেন, সেখান থেকে আপনাদের মার্ডার ফানের জায়গাটা কি দেখা যচ্ছিল?
-হ্যাঁ। কারণ ওখানটা উঁচুতে। এই টিলার দক্ষিণ অংশ ওটা। আর আমি ছিলুম অনেকটা ফাঁকা বড় রাস্তায়। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল জায়গাটা।
কাকেও দেখতে পেয়েছিলেন। মানে–আপনি চলে আসার পর?
–হ্যাঁ।
কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন। কিষাণ সিং বললেন–দেখতে পেয়েছিলেন?
–হ্যাঁ।
–সে কে?
-চিনতে পারিনি। সবুজ ফুলহাতা জামা ছিল গায়ে। প্যান্ট দেখা যাচ্ছিল না ঝোপের আড়ালে। মুখটা ওপাশে ছিল বলে দেখতে পাইনি। বেশ মোটাসোটা লোক।
-মানে ফ্যাটি?
–হ্যাঁ। প্রকাণ্ড। তবে বেঁটে বলেই মনে হচ্ছিল।
–তাকে দেখে আপনার কিছু মনে হয়নি?
হয়েছিল। ভাবলুম, খেলাটা বরবাদ হয়ে গেল হয়তো। এক্ষুণি হুলুস্থুল বাধবে। কিন্তু লোকটা ঝোপের আড়ালে ডুবে গেল। তখন ভাবলুম, কেউ বেড়াতে বেরিয়েছে। উপত্যকার দিকে সোজাসুজি নেমে গেল। তারপর আর তাকে দেখিনি।
-সবুজ ঝোপঝাড়ের মধ্যে সবুজ জামা! চোখে পড়া তো অস্বাভাবিক!
চোপরা একটু ইতস্তত করে বলল–না, মানে–তখন আমার ওখানেই মন পড়ে ছিল কি না! দ্যাটস ন্যাচারাল। তাই না স্যার?
কিষাণ সিং জবাব দিলেন না। কর্নেল বললেন রাইট, রাইট।
তাছাড়া স্যার, ব্যাপারটা আমার খুব গোলমেলে লাগছিল।
কর্নেল বললেন–কেন বলুন তো?
দীপ্তির মার্ডার মোটিভটা শুনে যদিও খুব ফানি মনে হয়েছিল। পরে মনে হলো–দীপ্তি কি কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানে আমাকেই যেন
–ইঙ্গিত? কিসের?
–মানে, অয়েল রিফাইনারিতে সাবোটাজের। দ্যাটস অলসো ন্যাচারাল।
–ঠিক বলেছেন। কিন্তু দীপ্তির সঙ্গে তো আপনার ইদানিং ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল?
–হ্যাঁ। একটু একটু। আই লাইকড হার।
–দুজনে একসঙ্গে ঘুরেছেন, কিংবা নিভৃতে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছেন?
–হুঁউ। দ্যাটস ন্যাচারাল।
-ওইসব সময় দীপ্তি আপনাকে অনায়াসে তেমন কিছু গুপ্ত ব্যাপার থাকলে জানাতে পারত?
–তা তো পারতই।
কিন্তু জানায়নি। তাই না?
না। সম্ভবত গত রাতেই ও তেমন কিছু আঁচ করে থাকবে। তাই…।
–এক মিনিট। তাহলে তো আজ ভোরে ওকে যখন নিয়ে এবাড়ি এলেন, তখন বলতে পারত আপনাকে?
ও চাপা মেয়ে ছিল। কিংবা হয়তো সাবোটাজকারীদের কেউ গতরাতে বারান্দায় আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল। তাকেই দীপ্তি সতর্ক করতে চেয়েছিল।
মিঃ চোপরা! আপনি বয়সে তরুণ হলেও খুব বুদ্ধিমান। খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা বলেছেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, কারা উপস্থিত ছিল তখন? জয়ন্তবাবু, দিব্য, রত্না আর সোনালী। এখন বলুন–আপনার ধারণা অনুযায়ী কে সাবোটাজকারী দলের লোক হতে পারে? খুব ভেবে বলবেন কিন্তু।
