–হ্যাঁ। তবে এ নিয়ে দিব্যর সঙ্গে কোনওরকম মনকষাকষি দেখেনি। আমরা একসঙ্গেই বেশিরভাগ সময় থাকি। তেমন কিছু ঘটলে টের পেতুম। দিব্যও এসব মাইণ্ড করার ছেলে না।
ইদানিং দীপ্তির মধ্যে কোনও বিশেষ ভাবান্তর টের পাচ্ছিলে কি?
সোনালী একটু ভেবে বলল–তেমন কিছু দেখেনি। তবে…
-তবে?
মাঝে মাঝে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকত। জিগ্যেস করলে কিছু বলবে মনে হতো–কিন্তু শেষ অব্দি বলত না। শুধু বলত–শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।
–আচ্ছা, ওকথা থাক। আজ সকালে তুমি দীপ্তিকে ওভাবে রেখে বারান্দায় চলে এলে! তখন বারান্দায় রত্না ছিল। তাই না?
-হ্যাঁ। আমরা দু’জন ছিলুম।
–ওদিক থেকে কোন শব্দ শুনতে পেয়েছিলে? কিংবা কাকেও যেতে দেখেছিলে?
না।
–ভেবে বলো।
সোনালী জোরের সঙ্গে মাথা দোলাল। আমরা দুজনেই ওদিকে তাকিয়েছিলুম।
তারপর প্রথমে দিব্য না চোপরা ফিরে এল?
–চোপরা।
–কোনদিক থেকে?
পুবদিক।
–তার মধ্যে কোনও ভাবান্তর ছিল?
নাঃ। হাসতে হাসতে এল।
–ভেবে বলো। কারণ তোমার উইশফুল থিংকিং হতে পারে।
সোনালী ভেবে নিয়ে জবাব দিল-মনে হচ্ছে, হাসতে দেখেছি। তারপর একটু গম্ভীর হয়েছিল মনে পড়ছে। একটু…হ্যাঁ কর্নেল, ওকে একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। কারণ রত্না ওকে ডাকলে শুনতে পেল না। তখন রত্না বলল, খুব ঘাবড়ে গেছ মনে হচ্ছে! ও যেন চমকে উঠে আবার হাসতে লাগল।
দিব্য এল কোনদিক থেকে? কতক্ষণ পরে?
–পশ্চিমদিক থেকে। মিনিট তিন-চার পরে। দিব্যকে কিন্তু খুব নার্ভাস মনে হচ্ছিল। এখন মনে পড়ছে। ও এসেই বলল–খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে যেন!..বলেই সোনালী নড়ে উঠল। কর্নেল! মনে পড়ছে, দিব্য যেন হাঁফাচ্ছিল।
বলো কী!
-হ্যাঁ। রত্না ওকে ধমক দিয়ে বলল–দাদা সবতাতেই নার্ভাস হয়ে পড়ে। আমি ঠাট্টা করে বললুম–হবু ব্রাইড ইজ মার্ডারড। কষ্ট হচ্ছে না বুঝি? তা শুনে দিব্য রাগ দেখিয়ে বলল–খুব ডেঁপো মেয়ে হচ্ছ। সেই সময় দেখি জয়ন্তবাবু ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বোকার মতো। পলিমাটিগুলো ছড়িয়ে চলে আসার কথা। অথচ উনি যেন কী দেখছেন। তাই আমি দৌড়ে গেটে গেলুম ওকে ডাকতে।
তার মানে জয়ন্তকে তুমি ফিরতে দেখনি?
না। মানে, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে ওইসব কথাবার্তা বলছি তো। তাই ওদিক আর তাকাচ্ছিলুম না!
-রত্না আর তুমি বারান্দায় থাকার সময়ও কেউ ওখানে গেলে তাহলে তোমার চোখে পড়ার চান্স বেশি ছিল না।
সোনালী ব্যস্ত হয়ে বলল না না, ছিল। তখন…
–অবশ্য দক্ষিণের ঢালু থেকে ঝোপ ঠেলে কেউ এলে তাকে পেতে না।
হ্যাঁ। তা পেতুম না।
-ঠিক আছে সোনালী। তুমি জয়ন্তের কাছে গিয়ে বসো। নাকি মিঃ সিং কিছু প্রশ্ন করবেন?
সবাই মাথা দোলালেন। সোনালী আমার পাশে এসে নিঃশব্দে বসে গেল। কিষাণ সিং ডাকলেন–দিব্যেন্দু চ্যাটার্জিকে ডাকো..
.
দিব্যেন্দুর প্রাথমিক পরিচয়পর্ব শেষ হবার পর যথারীতি জেরা শুরু হলো। আমি ও সোনালী দুজনেই তাকিয়ে রইলুম দিব্যের দিকে।
কিষাণ সিং বললেন–মার্ডার ফানের কথা কখন কোথায় প্রথম কার কাছে শোনেন?
কাল রাত্রে সোনালী রত্না আর দীপ্তি তিন জনের কাছেই।
–তিনজনের কাছে? দিস ইজ অ্যাবসার্ড। নিশ্চয় প্রথমে একজনই বলেছিল। কে?
দিব্য ভড়কে গিয়ে বলল–হ্যাঁ, মানে তখন বারান্দায় তিনজনই ছিল। প্রথমে অবশ্য সোনালীই বলল।
–শুনে আপনি কী বললেন?
বাধা দিলুম। বললুম– এ বড্ড বাজে ব্যাপার। অন্য কোনও ফানের প্ল্যান করা যাক। ওরা শুনল না। অগত্যা আমি মত দিলুম।
–কেন বাধা দিয়েছিলেন?
ব্যাপারটা..ব্যাপারটা আমার কাছে উদ্ভট মনে হয়েছিল।
–ফান মানেই উদ্ভট কিছু।
–তাহলেও দীপ্তিকে আমি ডেডবডি করাটা পছন্দ করিনি।
কর্নেল বলে উঠলেন দীপ্তিকে তো তুমি ভালবাসতে দিব্য? না–না, লজ্জার কারণ নেই। আমরা আধুনিক যুগের মানুষ।
দিব্য মাথাটা একটু দোলাল।
–তোমার সঙ্গে তো ওর বিয়ের কথা ছিল?
–হ্যাঁ। কিন্তু…
–বলো, বলো!
ইদানিং দীপ্তি আমাকে এড়িয়ে থাকতে চাইত যেন। আমি অবশ্য তাতে কিছু মাইণ্ড করিনি। ও বড্ড খামখেয়ালি মেয়ে ছিল। আমার ধারণা, শিল্পীরাই খামখেয়ালী।
দীপ্তি ইদানিং চোপরার সঙ্গে মেলামেশা করত কি?
দিব্য মুখ নামিয়ে বলল–হ্যাঁ। আজ ভোরেও চোপরা ওকে গাড়ি করে এখানে পৌঁছে দেয়। অথচ কথা ছিল, আমিই ওকে নিয়ে আসব। তাই বেরুতে যাচ্ছি, দেখি চোপরার গাড়িতে ও আসছে। মানে গাড়িটা তখন গেটে ঢুকছিল।
কিষাণ সিং বললেন–মিঃ চ্যাটার্জি! গত আগস্টে রানীডিহির ইভনিং লজ নামে একটা বাড়ি থেকে আপনাকে জুয়াখেলার জন্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তখন আপনি মাতাল অবস্থায় ছিলেন। খবর পেয়ে মিঃ ব্যানার্জি–মানে আপনার মেসোমশাই আপনাকে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। শুধু এই নয়–আরও দুবার আপনাকে মারামারির অভিযোগে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল এবং আপনার মেসোমশাইয়ের হস্তক্ষেপে ছাড়া পান। এসব কারণেই রিফাইনারিতে আপনার চাকরি পাবার অসুবিধা হচ্ছে। দিস ইজ দা রেকর্ড। এবার বলুন, ঠিক এসবের জন্যেই কি দীপ্তির সঙ্গে আপনার ছাড়াছাড়ি হয়েছিল?
সোনালী মুখ ফিরিয়েছে। আমি অবাক। কর্নেল দিব্যের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঘরটা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকল। কিষাণ সিং আবার বললেন–জবাব দিন মিঃ চ্যাটার্জি।
দিব্য ঠোঁট কামড়ে বলল–না।
–আপনার বাবা মা কলকাতায় থাকেন। তাই তো?
