আমার নাম-ধাম, কর্নেলের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি শেষ হলো। তারপর গত রাতের ঘটনা নিয়ে জেরা চলল। আমি যা যা জানি, জবাব দিয়ে গেলুম। ওঁরা নোট করে নিলেন। তারপর কর্নেলের কাশির শব্দ হলো–এক মিনিট। উইথ ইওর কাইণ্ড পারমিশান প্লিজ!
কিষাণ সিং বললেন–হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন কর্নেল।
–আমি জয়ন্তকে কিছু প্রশ্ন করব।
–অবশ্যই করবেন।
জয়ন্ত! তাহলে তুমি বলছ যে সোনালীর মুখেই তুমি শুনেছ মার্ডার ফানের প্রস্তাবটা দীপ্তিই তুলেছিল?
-হ্যাঁ।
–তুমি বলছ যে গত রাতে দীপ্তির মুখে খুব নার্ভাসনেস দেখেছিলে!
–হ্যাঁ।
এবং আজ তার উল্টো অর্থাৎ মরীয়া মনে হচ্ছিল ওকে?
হ্যাঁ
দীপ্তিই তাহলে মার্ডার ফানের মোটিভ হিসেবে…
বিরক্ত হয়ে বললুম–বলেছি তো! রিফাইনারির সাবোটাজের কথা বলেছিল।
–ওক্কে। এবং দীপ্তিই বলেছিল, মোটিভের ক্লু হিসেবে একটুকরো কাগজ হাতে ধরে থাকবে–তাতে সংকেত বাক্যে সাবোটাজের উল্লেখ পাওয়া যাবে?
–সবই তো বলেছি।
–কিন্তু আমরা ওর হাতে তেমন কোনও কাগজের টুকরো পাইনি!
–সেজন্য কী আমি দায়ী?
সবাই হেসে উঠলেন আমার জবাব শুনে। কর্নেল বললেন–আচ্ছা, আচ্ছা! মাত্র আর একটা প্রশ্ন! তুমি যখন নদীর ধারে যাও, কিংবা সেখান থেকে ফিরে আসো, তখন কোনও শব্দ শুনেছিলে?
–হুঁ। অনেক শব্দ।
অফিসাররা নড়ে উঠলেন। কর্নেল ব্যর্থ হয়ে বললেন–অনেক শব্দ? কিসের?
–পাখিটাখির।
সবাই হাসলেন। কর্নেল বললেন–কাকেও দেখেছিলে, জঙ্গলে অথবা খুনের জায়গায়?
–হুঁউ। তবে খুনের জায়গায় নয়। পশ্চিমের একটা টিলায়।
ফের সবাই নড়ে বসলেন। কর্নেল বললেন–দেখেছিলে? চিনতে পেরেছিলে?
হুঁউ
কিষাণ সিং বললেন–কে সে? চোপরা না দিব্যেন্দু?
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার। বায়ুসেবনে বেরিয়েছিলেন।
কর্নেল গোমড়ামুখে কী অস্ফুট বললেন। কিষাণ সিং দরজার দিকে ইশারা করে কাকে বললেন–সোনালী ব্যানার্জি! জয়ন্তবাবু, আপনি প্লীজ ওখানটায় বসুন।
কোণের সোফায় গিয়ে বসলুম। বুঝলুম, এখন বেরুনো যাবে না। সিগ্রেট ধরিয়ে টানতে থাকলুম। সোনালী পাথরের মূর্তির মতো ঘরে ঢুকল এবং নমস্কার করে ওঁদের সামনের চেয়ারে বসল।
নামধাম পরিচয় পর্ব হলো। তারপর জেরা চলতে থাকল।
মিস ব্যানার্জি, ঠিক কখন প্রথমে আপনারা মার্ডার ফানের কথাটা ভেবেছিলেন এবং প্রথম কে ভেবেছিল?
দীপ্তি। কদিন আগে কর্নেলকে বাবা আমার জন্মদিনে নেমন্তন্ন করতে পাঠালেন। রত্না আমার সঙ্গে যেতে চাইল। দীপ্তিও তা শুনে যাবে বলল। কর্নেলের বাড়ি থেকে ফেরার সময় রাস্তায় ট্যাক্সিতে দীপ্ত বলল–এই ভদ্রলোক তাহলে গোয়েন্দা? ওকে নিয়ে তোর জন্মদিনে একটা ফান করলে কেমন হয়? তারপর …
–ডেডবডি সাজতে কি দীপ্তিই চেয়েছিল?
–হ্যাঁ। ট্যাক্সিতে বসেই সব ঠিক হয়ে যায়।
হঠাৎ কর্নেল বললেন–ট্যাক্সির নাম্বারটা কি লক্ষ্য করেছিলে সোনালী?
–আমি করিনি। ওসব কেই বা লক্ষ্য করে? কেন বলুন তো?
–জাস্ট এ চান্স! যদি দৈবাৎ করে থাকো।
করিনি।… বলেই সোনালী নড়ে উঠল। হ্যাঁ, আমি করিনি। কিন্তু …।
–কিন্তু দীপ্তি…।
দীপ্তি করেছিল?
–হ্যাঁ ব্যাপারটা এখন মনে হচ্ছে, ভারি অদ্ভুত। জানেন? হাওড়া স্টেশন থেকে ট্যাক্সি করে আমরা ভবানীপুরে মামার বাসায় গেলুম, সেটাই আমাদের ইলিয়ট রোডে কর্নেলের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার সময়ও একই ট্যাক্সি। দীপ্তি এটা লক্ষ্য করেছিল। বলেছিল ব্যাপার কী রে? এই একটা ট্যাক্সিই পাচ্ছি খালি? আমি অবশ্য ট্যাক্সিওয়ালাকে লক্ষ্য করিনি। বলেছিলুম–তোর চোখের ভুল। বাইরের লোক তো তুই, তাই সব ট্যাক্সিওয়ালাকে একই লোক বলে ভুল করছিস! যেমন সব চীনেম্যানকে দেখে একই লোক। মনে হয়!
কিষাণ সিং বললেন–বেশ ইন্টারেস্টিং তো!
কর্নেল বললেন হাওড়া স্টেশনের ট্যাক্সি ভবানীপুরে নিয়ে যায় তোমাদের। তারপর সম্ভবত ওই ট্যাক্সিটাই তোমার মামার বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিল এবং তোমরা রাস্তায় নামতেই নিজে থেকে অফার দেয়।….
সোনালী সায় দিয়ে বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ। লোকটা আমাদের ডেকে বলল-আইয়ে মেমসাব! দীপ্তি বলল–সেই ট্যাক্সিঅলা না? আমি আর রত্না গ্রাহ্য করিনি। ট্যাক্সি পাওয়াই বড় কথা।
-রাইট। তোমরা যখন আমার বাসায় গেলে, আমি অভ্যাসমতো জানালায় দাঁড়িয়েছিলুম। দেখলুম ট্যাক্সিটা তোমাদের নামিয়ে দিয়েই ফিরল। কিন্তু চলে গেল না। ওধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নাম্বারটা আমার মনে আছে।..বলে কর্নেল পকেট থেকে নোটবই বের করলেন। বললেন–লিখে নিন মিঃ সিং। এক্ষুণি কলকাতায় খোঁজ নিতে হবে। এটা বিশেষ জরুরী।
কিষাণ সিং একজন অফিসারকে তক্ষুনি ফোনের কাছে পাঠালেন। তারপর কর্নেল বললেন–সোনালী, দীপ্তির ব্যক্তিগত জীবনের দু-একটা কথা তোমার মুখেই শুনতে চাই।
বলুন। যা জানি, বলব।
–ইয়ে, ওর কি কোনও প্রেমিক ছিল? লজ্জার কারণ নেই, বলো।
সোনালী মুখ নামিয়ে বলল–দিব্যের সঙ্গে একসময় ওর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাছাড়া দিব্যের সঙ্গেই ওর বিয়ের কথাও চলছিল। দিব্য রিফাইনারিতে চাকরিটা পেয়ে গেলেই বিয়েটা হতো।
–আই সী! কিন্তু ঘনিষ্ঠতাটা একসময় ছিল বলছ কেন?
–ইদানিং দীপ্তি যেন দিব্যকে এড়িয়ে চলছিল। আর…
বলো!
–আর রণধীরদার সঙ্গে একটু বেশি মেলামেশা করছিল।
–মানে তোমার বাবার প্রাইভেট অ্যাসিস্ট্যান্ট ছেলেটির সঙ্গে?
