কর্নেল যেই দীপ্তির একটা হাত তুলে নাড়ি পরীক্ষা করতে গেলেন, অমনি রত্না আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সব নিষেধ ভুলে খিলখিল করে হেসে উঠল। সোনালীও নিঃশব্দ ধমক দিতে গিয়ে তাল হারাল। এবং সেও হেসে ফেলল। দেখাদেখি আমিও হো হো করে হেসে উঠলুম। দিব্যেন্দু আমার পাঁজরে চিমটি। কাটল। চোপরা একটু পিছনে দাঁড়িয়ে হাসছে। ভৃত্যগোষ্ঠী আমাদের হাসি দেখে প্রথমে হতবাক, স্তম্ভিত–পরে মজাটা টের পেয়ে গেছে। তাদেরও দাঁতগুলো ভোরের লালচে আলোয় ঝকমক করতে দেখলুম।
রত্নার হাসি শুনেই কর্নেল ঘুরেছিলেন। কিন্তু ওঁর মুখে কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। উনি সিরিয়াস হয়েই নাড়ি পরখ করছেন। এবং ওঁর চোখে সেই সুপরিচিত তীক্ষ্ণতা লক্ষ্য করে আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেলুম।
সোনালী হাসতে হাসতে বলে উঠল দীপ্তি! দি গেম ইজ ওভার! উঠে পড়!
কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। রত্না হাসতে হাসতে বলল কর্নেল! এবার কিন্তু মার্ডারারকে আপনার খুঁজে বের করা চাই। অনেক ক্লু আছে!
সোনালী দীপ্তির দিকে এগিয়ে ধমকের সুরে বলল–আঃ! ওঠ না! এই দীপ্তি! ওঠ!
কর্নেল গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন দীপ্তি উঠবে না।
সোনালী বললে উঠবে না মানে?
–ওর ওঠার ক্ষমতা আর নেই।..বলে কর্নেল আমার দিকে দ্রুত ঘুরলেন। জয়ন্ত, শীগগির যাও। অনিরুদ্ধবাবুকে খবর দাও। এবং ফোনে থানায় জানাতে বলো।
বাধা দিয়ে দিব্যেন্দু বলল–কিন্তু স্যার, পুলিশ এলে ফানটা মাঠে মারা যাবে।
কর্নেল হঠাৎ গর্জন করে উঠলেন–নো, নো মাই ইয়ং ফেণ্ড! ইট ইজ নো ফান! এটা সত্যিকার খুন। দীপ্তিকে কেউ সত্যিকার ছোরা দিয়ে খুন করেছে।
দিব্যেন্দু, রত্না ও চোপরা একসঙ্গে বলে উঠল–অসম্ভব! আমিও বলে উঠলুম– কর্নেল! কী বলছেন! এ তো নিছক মজা করার জন্যে…
কর্নেল ফের গর্জে উঠলেন শাট আপ! যা বললুম– করো গিয়ে। কুইক!
আমি যন্ত্রের মতো পা বাড়ালুম। পিছনে স্তব্ধতা। এতক্ষণে টের পেয়েছি, কর্নেল সত্যি রসিকতা করছেন না এবং দীপ্তি সত্যি সত্যি খুন হয়ে গেছে। আমার পা কাঁপতে লাগল। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে যেতে টাল সামলালুম।
বারান্দায় উঠে এবার পিছু ফিরে দেখি, দলটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।..
.
কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে থেকে অনেক হত্যাকাণ্ড দেখেছি আমি এযাবৎ। কিন্তু এটি সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অদ্ভুত। পনের মিনিটের মধ্যে রানীডিহির পুলিশ এসে গিয়েছিল। এখানে একটা অয়েল রিফাইনারি থাকায় কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর লোকজনও ছিল। আর ছিল রাজ্যের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কুশলী অফিসারগোষ্ঠী। পরবর্তী আধঘণ্টায় তারা সবাই এসে পড়লেন। কর্নেল এই হত্যাকাণ্ডকে সাধারণ খুন বলে গণ্য করেননি, তা বোঝা যাচ্ছিল।
যেখানে মানুষ খুন হয়, সেখানে অফিসাররা কী পদ্ধতিতে রুটিন তদন্ত করেন– আমার দেখা আছে। এখানে তার ব্যতিক্রম ঘটল না। নীচের উপত্যকাটাও একদল অফিসার ঘুরে দেখলেন। অকুস্থলের তদন্তে যা দেখা গেল তা অদ্ভুত। সোনালী থিয়েটার ক্লাবের যে ছোরাটা দীপ্তির পিঠে আটকে দিয়েছিল, তা পাওয়া গেল দীপ্তির বুকের তলায়। সেই লাল রঙ আর সত্যিকার রক্ত একাকার হয়ে গেছে। সত্যিকার ছোরাটার বাঁটের গড়ন দেখেই অবাক হতে হয়–একেবারে হুবহু নকল ছোরাটার মতন। নকল ছোরাটা ছিল ফলার দুভাগ করা…ভেতরে ফাঁপা এবং স্প্রিং আছে। ডগাটা একেবারে ভোঁতা ভিজে মাটিতেও ঢোকানো যায় না। বাঁট ধরে কোথাও রেখে চাপ দিলে ডগাটা ভেতরে ঢুকে যায় এবং ভাগকরা জায়গা থেকে একটা ক্লিপ বেরিয়ে শরীরে আটকে যায়! তখন দেখে মনে হয়, আধখানা শরীরে ঢুকে গেছে। ভেতরে স্পঞ্জে রং থাকে। স্পঞ্জে চাপ পড়ামাত্র ছিটকে রঙটা বেরিয়ে আসে। থিয়েটারের খুনখারাপিতে ভারি চমৎকার কাজ দেয়। এক্ষেত্রে খুনী ওটা দীপ্তির পিঠ থেকে খুলেছে। খোলার পর আসল ছোরাটা মেরেছে এবং নকলটা বুকের তলায় লুকিয়ে রেখেছে।
কর্নেলের সঙ্গে ডিটেকটিভ অফিসার কিষাণ সিংয়ের কথাবার্তা আমি শুনেছি। দুজনেই একমত যে খুনী আমাদের দলেরই কেউ। দীপ্তিকে ফেলে রেখে সরে যাওয়ার পর সে ওর কাছে ফের যায় এবং সম্ভবত বলে যে ছোরাটা খুলে যাবে মনে হচ্ছে। তাই ওটা ভালভাবে আটকানো দরকার। এই অছিলায় সে হত্যার কাজটি সেরে ফেলেছে। কর্নেলের মতে–খুবই যুক্তিসিদ্ধ এটা। অপরিচিত লোক হলে অমনটা সম্ভব হতো না।
আমরা ক্লু রেখেছিলুম : পলিমাটি, দিব্যেন্দুর ব্রাণ্ডের সিগ্রেটের টুকরো এবং চোপরার লাইটার। এসবই আছে। কিন্তু সবটা শোনার পর ডিটেকটিভ অফিসাররা এসব আর আমল দেননি। শুধু কর্নেল সেগুলো সযত্নে কাগজে মুড়ে পকেটে রেখেছেন। ও দিয়ে কী হবে কে জানে!
অকুস্থল থেকে ফিরে ব্যানার্জি সায়েবের বাংলোয় আমাদের ডাকা হলো। দীপ্তির মা বাবা কেউ নেই–মামার কাছে মানুষ হচ্ছিল। মামা ভবেশ চক্রবর্তী রিফাইনারি অফিসের হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট। দীপ্তির মামা-মামী সবাই এসেছেন। ওঁরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। সোনালীর মা সোনালী ও রত্নাকে ক্রমাগত ভর্ৎসনা করে যাচ্ছেন। অনিরুদ্ধ স্তম্ভিত। খুব ভয় পেয়েছেন মনে হলো। সোনালীর জন্মদিনের আনন্দটাও মাঠে মারা গেল!
ড্রয়িং রুমে কর্নেল ও একদঙ্গল অফিসার বসার পর প্রথমে ডাক পড়ল আমার। স্মার্ট হয়ে ঢোকার চেষ্টা করলুম। কিন্তু বুক কাঁপছিল। চেয়ারে বসার পর প্রশ্ন শুরু হলো। কর্নেল চুপচাপ চুরুট টানছেন।
