দীপ্তি যেন বিরক্ত হলো। বললবাজে বকিসনে, রত্না। জয়ন্তবাবু কলকাতায় থাকেন, ভুলে যাস্ নে। আদাড়ে গাঁয়ে শেয়াল রাজা আমি।
কথা কেড়ে রত্না বলল-রানী বলো, দীপ্তি।
সবাই হাসল। চোপরা বলল–কাল ফাংশানের প্রোগ্রাম কি এখনও আমায় জানানো হয়নি কিন্তু। একেবারে লাস্ট মোমেন্টে বলবে, তখন ম্যানেজ করতে পারব না বলে দিচ্ছি। প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নিশ্চয় রত্না?
রত্নাকে একটু বিরস দেখাল। বলল–বেশি কিছু করা যাবে না। মেসোমশাই বলেছেন–খুব ধুমধাম করা হবে না। বেশি কেউ আসছেনও না। লোকাল লোক আর বাইরের মিলে বড় জোর জনা দশ বারো। অবশ্য ড্রইংরুমটা বড়ো। স্টেজ হবে না। দীপ্তিই নাচবে-গাইবে!
দীপ্তি বলল–এবং তুমিও।
রত্না কী বলতে যাচ্ছিল, সোনালী ও একজন পরিচারিকা ট্রে নিয়ে এল। সোনালী ফিসফিস করে বলল-কর্নেল গম্ভীর মুখে কী একটা প্রকাণ্ড বই পড়ছেন। বাবা পাশে তেমনি গম্ভীর মুখে বসে আছেন। কিন্তু মুশকিল হয়ে গেছে। মা জানতে পেরেছেন সব। বারণ করেছিলেন। আমার ভয় করছে বাবার কানে না তোলেন!
রত্না বলল-এই রে! সেরেছে! মাসিমাকে জানাল কে?
দিব্য বলল–আমি তো কিছু বলিনি। নিশ্চয় দীপ্তি বলেছে।
কাঁচুমাচু হয়ে দীপ্তি বলল–মানে, ওঘরে যখন সোনালী আর রত্নার সঙ্গে এনিয়ে আলোচনা করছিলুম, মাসিমার কানে গিয়েছিল। আমি বেরোলে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন–মার্ডার-টার্ডার কী সব বলছি? উনি যা মানুষ, হইচই করে ফেলবেন–এই ভয়ে বলতে হলো। উনি আমাকে নিষেধ করছিলেন।
চোপরা কফিতে চুমুক দিয়ে বলল–তাহলে দি গেম ইজ ফিনিশ। উনি বাধা দেবেন। আই নো ইট।
সোনালী একটু ভেবে বলল–এক কাজ করা যাক। টাইমটা পাল্টে সকাল ন’টার বদলে ভোর ছটা। অত সকালে মায়ের ঘুম ভাঙবে না। রণধীরদা, তুমি কিন্তু ভোর পাঁচটায় আসছ। দিব্য, রত্না, দীপ্তি–সবাই ঠিক ওই সময়ে। জয়ন্তবাবু, আপনার ঘুম ভাঙবে তো?
বললুম–হ্যাঁ। তবে কর্নেলেরও ভাঙবে। এবং উনি অভ্যাসমত বেড়াতে বেরোবেন।
সোনালী বলল–বাঃ! তাহলে তো চমৎকার সুযোগ। উনি ফিরলেই আমরা ঝটপট দীপ্তিকে ওখানে রেখে চলে আসব। খবর দেবে–এই রে! মার্ডারটা কার প্রথম চোখে পড়বে ঠিক করা হয়নি যে!
রত্না বলল-দাদাই দিক না। দাদাও ধরো মর্নিংওয়াকে বেরিয়েছিল। ফিরে এসে চোখে পড়েছে! ব্যস!
দিব্য বলল–বেশ। কিন্তু মোটিভ কী রাখছ খুনের? বলে সে দীপ্তির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে থাকল।
রত্না মুখ টিপে হেসে বলল–মোটিভ ইজ প্রেমের প্রতিহিংসা। দাদা, চোপরা এবং জয়ন্তবাবু তিনজন প্রেমিক, একজন প্রেমিকা।
দীপ্তি হইচই করে বলল–যাঃ!
তার মুখ রাঙা দেখাচ্ছিল। বললুম–এতে সংকোচের কী আছে মিস দীপ্তি? জাস্ট এ গেম। অভিনয়। আপনি নিশ্চয় প্রেমিকার ভূমিকায় থিয়েটারে অভিনয় করেছেন।
সোনালী বলল–একশোটা করেছে। তুলনাহীন অভিনয়।
দীপ্তি হঠাৎ ঘুরে বলল–আচ্ছা, ধরুন যদি এমন হয়–মানে, আপনারা তিনজনের একজন কোনও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন এবং আমি সেটা টের পেয়েছিলুম বলেই আমাকে… মানে…
চোপরা হো হো করে হেসে বলল–চমৎকার! কিন্তু ষড়যন্ত্র কিসের?
ধরুন, এখানে অয়েল রিফাইনারিতে কোনও সাবোটাজ করার জন্য …..
দিব্য বাধা দিল–এক মিনিট। ব্যাপারটা খুব জটিল আর কষ্টকল্পিত।
দীপ্তি যেন জেদ ধরল। কেন? এমন হচ্ছে না আজকাল? সরকারী প্রজেক্টে বিদেশী এজেন্টের লোকেরা অন্তর্ঘাত করার চেষ্টা করেছে না?
চোপরা বলল–ব্রিলিয়ান্ট! খুব স্বাভাবিক মোটিভ। কিন্তু তার তো ক্লু থাকা চাই।
দীপ্তি বলল–ধরুন, আমার কাছে কোনও টুকরো কাগজ থাকবে এবং তাতে কোনও সাংকেতিক কিছু লেখা থাকবে! ভাববেন না, সে আমি নিজেই ম্যানেজ করব’খন। কাগজটা ছেঁড়া হবে এবং আমার মুঠোর মধ্যে লুকানো থাকবে।…
সোনালী হাসতে হাসতে বলল-বুঝেছি। দীপ্তি এই তিনজনের প্রেমিকা হতে চায় না! পছন্দ হচ্ছে না। তাই বাপস! অয়েল রিফাইনারিতে সাবোটাজ! বাবাকেও জড়াচ্ছে! তবে এই মোটিভটা খুব সিরিয়াস। গেমটা আরও জমবে। কর্নেলের বুদ্ধি গুলিয়ে যাক্ না!
আমি কিন্তু চমকে উঠেছিলুম। দীপ্তির মুখে কী একটা টের পাচ্ছিলুম। সেটা ঠিক কী, বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। একটা দৃঢ়তাই কি দেখলুম? অস্বস্তি হলো। সেই মুহূর্তে কর্নেলকে দেখা গেল দরজায়। আমরা তাকালুম। কিন্তু কর্নেল ফের ঢুকে গেলেন। সোনালী চাপা হেসে সন্দিগ্ধ মুখে বলল–শুনলেন না তো কিছু?
.
সে-রাত শুতে গিয়ে দেখি কর্নেল বেজায় গম্ভীর। আমি শুয়ে পড়লুম। উনি টেবিল ল্যাম্পের সামনে বসে একটা প্রকাণ্ড বই পড়তে থাকলেন। বললুম–ব্যাপার কী? সরাদিন ট্রেনজার্নির পর ওই বুড়ো হাড়ের ভেল্কি দেখানো কেন? আলোয় আমার ঘুম আসে না।
কর্নেল বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই বললেন–এক মিনিট, জয়ন্ত। টি ই লরেন্স চ্যাপটারটার আর এক প্যারা বাকি। তুমি প্লীজ একটুখানি ধৈর্য ধরো। লাভবান হবে।
–আমার কিসের লাভ?
–থ্রি জিরোর তত্ত্ব আঁচ করেছি ডার্লিং! দৈনিক সত্যসেবক-এ এটা ছাপা হলে কাগজের বিক্রি বাড়বে এবং তোমারও বেতনের ইনক্রিমেন্ট হবে। লাভটা তো তোমারই।
অতএব ধৈর্য ধরলুম। কিন্তু সকাল-সকাল ঘুমিয়ে না পড়লে ভোর পাঁচটায় ওঠা কঠিন হবে। মনে মনে হাসলুম। ওঁকে নিয়ে সোনালীরা যা মজা করতে যাচ্ছে, উনি তো টেরও পাচ্ছেন না। মার্ডার গেমটা যে নিছক ফান, তা টের পাবার মুহূর্ত অব্দি উনি ওই থ্রি জিরোর তত্ত্বের সঙ্গে দীপ্তির এই অদ্ভুত হত্যাকাণ্ড জড়িয়ে কী না নাজেহাল হবেন! মাথায় একটা মতলব গজালো। দীপ্তি কর্নেল যাওয়ামাত্র যেন ধরা না দেয়। অন্তত আধঘণ্টা ওঁকে নাজেহাল করা যাবে। তারপর ফাঁস করা হবে যে ব্যাপারটা ফান। ভোরে এই প্রস্তাবটা ওদের দেব।…
