চোপরা বিস্ময়মেশানো আতঙ্কে বলল–সর্বনাশ! ডেডবডি?
সোনালী ধমক দিয়ে বলল–ভ্যাট, কিস্যু বোঝে না! রিয়েল ডেডবডি নয় নকল। আমরা দীপ্তিকে ডেডবডি করব। আমাদের থিয়েটার ক্লাবের একটা টিনের ছোরা আছে। ছোরাটার ডগাটা চাপ দিলে ভেতরে ঢুকে যায় এবং বডিতে আটকে পড়ে। কেমন? দীপ্তির বুকে সেটা আটকে থাকবে।
দীপ্তি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। এবার বলে উঠল–না, না! পিঠে!
–বেশ, পিঠেই। পিঠে আটকে দিয়ে লাল রঙ ছড়িয়ে দেব। সে আমি ম্যানেজ করব’খন। একেবারে টাটকা দল-দলা রক্তের মতো দেখাবে। দীপ্তি মড়া সেজে পড়ে থাকবে। এবার ক্লু। ক্লু থাকবে একটা পোড়া দেশলাই কাঠি, আধপোড়া সিগারেট তিন চারটে…
দিব্য বলল–তাহলে আমাকে ধরে ফেলবে। আমি চেইন স্মোকার।
চোপরা বলল–আমাকেও। আমিও চেইন স্মোকার।
সোনালী বলল–তাহলে অন্য ক্লুর কথা ভাববো। জয়ন্তবাবু কী বলেন?
বললুম–কিন্তু তার আগে বলুন, আপনারা খুনী হিসেবে একজনকে নিশ্চয় ধরে রাখছেন! সে রোলটা কে নিচ্ছেন?
–দিব্য। দিব্য, তুমি রাজী তো?
দিব্যেন্দু আমতা হেসে বলল–বেশ। কিন্তু…
সোনালী বলল–কোনও কিন্তু নয়। তুমিই কিলার। এবার জয়ন্তবাবু বলুন।
বললুম–ক্লু খুব সহজ হওয়া চাই। কারণ, এটাতো জাস্ট এ গেম। নিছক খেলা! কর্নেলের যা স্বভাব, প্রথমে সত্যিকার খুন ভেবে খুব সিরিয়াস হয়ে পড়বেন এবং তক্ষুণি পুলিশ ডাকতে বলবেন। ফোরেন্সিক বিশেষজ্ঞ আসতে বলবেন। এবং অ্যাম্বুল্যান্স ইত্যাদি এসে যাবে।
সোনালী ব্যস্তভাবে বলল–সর্বনাশ! তাহলে তো ওঁকে…
বাধা দিয়ে বললুম–উনি ডেডবডি দেখে তেমন কিছু করার আগেই আপনারা দৌড়ে গিয়ে তখন বলবেন, আপনিই হত্যাকারীকে খুঁজে বের করুন! দেখি, আপনি কেমন গোয়েন্দা! না পারলে পুলিশ তো আছেই।
সবাই হেসে উঠল। সোনালী বলল–ইউরেকা! একটা ক্লু আমার মাথায় এসেছে। নীচের দিকে নদীতে এখন ফ্লাডটা কমেছে। কিন্তু পলি জমে আছে পাড়ের জঙ্গলে। দিব্যর পায়ে জুতোর সেই কাদা লেগে থাকবে। এবং দীপ্তির ডেডবডির কাছে কিছু কাদা ফেলে রাখা হবে। যতক্ষণ খেলা চলবে, দিব্য সেই জুতোই পরে থাকবে। কেমন? জয়ন্তবাবু, কর্নেল অত খুঁটিয়ে কি লক্ষ্য করবেন?
বললুম–কে জানে! তবে বুড়ো বড্ড সেয়ানা।
দিব্যকে নার্ভাস দেখাচ্ছিল। বলল–তাহলে সন্দেহ তো একজনের ওপরেই পড়ার মতো ক্লু রাখা হচ্ছে। এমন সব চিহ্ন রাখো, যাতে কর্নেল প্রত্যেককেই সন্দেহ করেন।
রত্না সায় দিয়ে বলল–এই! দাদা কিন্তু ঠিকই বলেছে রে! রণধীরদা, তোমাকে সন্দেহ করার মতো কী চিহ্ন রাখা যায় বলে তো?
চোপরা একটু ভেবে নিয়ে বলল–আমার লাইটারটা ফেলে রাখব কোথাও। ডেডবডির কাছাকাছি। তার মানে, আমি ও দীপ্তি ধরো কথা বলছিলুম ওখানে। আমি চলে এলুম, দীপ্তি থাকল। তারপর খুন হয়ে গেল ও।
সোনালী বলল–চমৎকার। আমরা সাক্ষী দেব, মানে আমিই বলব যে দীপ্তি আর রণধীরদার ঝগড়া হচ্ছিল ওখানে। বাংলোর এই বারান্দা থেকে শুনেছি।
চোপরাকেও এবার নার্ভাস দেখাল। সে বলল–তাহলে দুজন মোটে সাসপেক্ট?
সোনালী বলল–আরেকজন হলে ভাল হতো। কর্নেলকে গোলমালে ফেলা যেত। কিন্তু পুরুষমানুষ ছাড়া মার্ডারার হয় না। মানায়ও না!
দিব্য আপত্তি করে বলল–মোটেও না। মেয়েরাও ছোরা চালায়।
সোনালী, রত্না, দীপ্তি একসঙ্গে বলে উঠল–না, না! মোটেও না।
আমি একটু হেসে বললুম–হ্যাঁ, ছোরাটোরা মেয়েদের মার্ডার উইপন নয় সচরাচর। রিভলবার বরং চালাতে শুনেছি। তবে সেটা বিরল কেস। সচরাচর বিষই মেয়েদের মার্ডার উইপন! এক্সকিউজ মি, এ কিন্তু স্বয়ং কর্নেলেরই সিদ্ধান্ত।
চোপরা বলল–মহিলা গোয়েন্দাকাহিনীকার আগাথা ক্রিস্টিরও এই মত।
মেয়েরা একসঙ্গে সায় দিয়ে হেসে বলল–খানিকটা কারেক্ট।
সোনালী বলল–তৃতীয় পুরুষমানুষ অবশ্য জয়ন্তবাবু আছেন। কিন্তু…
বললুম– কর্নেল আমাকে হিসেবে ধরবেনই না। সুতরাং আমারই খুনী হবার স্কোপ ছিল এবং আপনারা কর্নেলকে পরাস্ত করতে পারতেন।
দিব্যেন্দু অমনি ব্যস্ত হয়ে উঠল। বলল–সোনালী! তোমরা বরং জয়ন্তবাবুকেই খুনী করো।
সোনালী রত্না ও দীপ্তির দিকে তাকাল। ইতিমধ্যে ওদের ফানটা আমার দারুণ ভাল লেগে গেছে। কর্নেলকে নিয়ে এমন মজা করার সুযোগ কখনও পাইনি। তাই বলে উঠলুম-ঠিক আছে। আমিই খুনী হলুম। নদীর পলিতে হেঁটে আসব আমিই। আর দিব্যবাবু বরং অন্যতম সাসপেক্টেড হয়ে ওঠার জন্য অন্য কোনও ক্লু রাখবেন।
দিব্যেন্দু বলল–আমি…আমি ওখানে আমার একটা বিশেষ ব্ৰাণ্ডের সিগ্রেটের টুকরো ফেলে আসব। এই সিগ্রেট জয়ন্তবাবু বা রণধীর খান না। খান কি?
আমি ও চোপরা ওর ব্রাণ্ড দেখে বললুম–না।
সোনালী খুব খুশি হয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল-এবার কফি খাওয়া যাক। এতক্ষণ তৈরি নিশ্চয়। কফি খেতে-খেতে আরও ডিটেলস আলোচনা করা যাবে।
ওকে সতর্ক করে দিয়ে বললুম–দেখবেন, কর্নেল যেন এদিকে না এসে পড়েন! কী অবস্থায় আছেন, দেখে আসবেন কিন্তু।
সোনালী মাথা দুলিয়ে চলে গেল। আমি দীপ্তির দিকে তাকালুম। দীপ্তি কি নার্ভাস হয়ে পড়ছে ক্রমশ? তাকে কেমন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল। হেসে বললুম– ভয় পেয়েছেন দীপ্তি?
দীপ্তির হাসিতে শুকনো ভাবটা ঢাকা গেল না। রত্ন বলল-ও ভয় পাবে কী? আপনি তো জানেন না, আমাদের থিয়েটার ক্লাবের সবচেয়ে পাকা অভিনেত্রী ও। নাচতে গাইতেও পারে। কাল সোনালীর জন্মদিনে ওর কীর্তি দেখে আপনার তাক লেগে যাবে।
