চোখ খুলতেই দেখি আমার বৃদ্ধ বন্ধুটি কখন নিঃশব্দে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন এবং আমাকে দেখছেন। বললেন–তুমি চোখ বুজে হাসতে অভ্যস্ত, তা তো জানতুম না ডার্লিং! নিশ্চয় তেমন কিছু ব্যাপার ঘটেছে। আর শোন, তোমার ওই হাসিটুকুর মধ্যে দুষ্টু ছেলের আদল লক্ষ্য করছিলুম। নিশ্চয় কোনও মতলব ভাঁজছিলে।
গম্ভীর হয়ে বললুম–ভাঁজছিলুম। আপনি তো গোয়েন্দা– নাকি মনের চিন্তার আভাস মুখেও বুঝতে পারেন। আপনিই বলুন, কী মতলব ভাঁজছিলুম?
কর্নেল আমার পাশেই খাটে পা ঝুলিয়ে বসলেন। তারপর বললেন-জয়ন্ত, আমি অন্তর্যামী নই। তবে এটুকু টের পাচ্ছি যে তোমরা কজন যুবক যুবতী মিলে একটা কিছু ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যাক্ গে–এবার শোনো থ্রি জিরোর ব্যাপারটা। পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি বইটার তিরিশ পাতায় লরেন্সের কাহিনী আছে। খুব মন দিয়ে পড়ছিলুম আর মনে হচ্ছিল, সত্যি-বড় বিচিত্র মানুষ ওই লরেন্স! কী বিপুল ইচ্ছাশক্তি! কী সাহস আর ধৈর্য! পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার ক্ষমতাও কী অসাধারণ! ওঃ!
ওঁর যেন ভাবাবেগের ঘোর লেগে গেল। চোখ বুজে যেভাবে মাথা নাড়া দিলেন, বারকতক, মনে হলো রোমাঞ্চ সামলাচ্ছেন। অবাক হয়ে বললুম–ব্যাপারটা কী? হঠাৎ লরেন্সকে নিয়ে এত উচ্ছ্বাস কেন?
কর্নেল চোখ খুলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন–তুমি জানো না জয়ন্ত! একটা প্রচণ্ড প্রাণশক্তি না থাকলে তুরস্ক সরকারের অস্ত্রশস্ত্র আর রসদবাহী মালগাড়ির ওপর মাত্র জনাকতক বেদুইন গ্যাংস্টার নিয়ে হামলা করা যায় না। বোঝে ব্যাপারখানা। মালগাড়িতে সশস্ত্র সেনারাও ছিল। তাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে লরেন্স নিতান্ত সাধারণ অস্ত্র নিয়ে লড়লেন! এবং…
বাধা দিয়ে বললুম–শুনেছি, মানে ছবিতে দেখেছি–আগে থেকে ডিনামাইট পোঁতা হয়েছিল লাইনের তলায়। যাই বলুন, এটা নিছক সাবোটাজ! এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজ যেকোনও বাচ্চাই করতে পারে। লরেন্সের মহিমাটা টের পাচ্ছি না।
কর্নেল তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–পাচ্ছ না বুঝি?
নাঃ।
কর্নেল হঠাৎ হাসলেন একটু। তারপর মাথা নেড়ে বললেন-হ্যাঁ, তা ঠিক। সাবোটাজ করতে খুব একটা বীরত্ব লাগে না! রাইট, রাইট! সাবোটাজ!
কর্নেল বারবার সাবোটাজ শব্দটা আওড়াতে-আওড়াতে ফের টেবিলে গিয়ে বসলেন। বইটা খুললেন। তখন বিরক্ত হয়ে বললুম–আবার পড়তে বসলেন নাকি?
কর্নেল বইটা খুলে কী দেখে নিয়েই বন্ধ করলেন এবং টেবিল-বাতির সুইচ অফ করে বললেন-জয়ন্ত, আশা করি এবার তোমার সুনিদ্রা হবে।
ওঁর ছোট টর্চটা জ্বলতে জ্বলতে কোণের অন্য বিছানার দিকে এগোল। একটা চাপা শব্দ হলো অন্ধকারে। বুঝলুম, উনি শুয়ে পড়লেন।
এবং কয়েক মিনিট পরেই ওঁর নাক ডাকা শুরু হলো। কী অদ্ভুত মানুষ!….
.
অচেনা জায়গায় আমার ঘুম হয় না। তাতে ভোরে ওঠার তাগিদ ছিল। রাতটা প্রায় জেগেই কাটালুম। পাশের ড্রইং রুমের দেয়ালঘড়ির ঘণ্টা প্রত্যেকবারই শুনেছি। যখন তিনবার বাজল, তখন টের পেলুম ঘুমের টান আসছে। অমনি সিগ্রেট ধরালুম। কর্নেলের নাক ডাকা মাঝে মাঝে বন্ধ হচ্ছে। অস্ফুট কী যেন বলছে–হয়তো ঘুমের ঘোরে। আবার নাক ডাকছে। সিগ্রেট খাওয়ায় কাজ হলো। ঘুম আর এলও না। চারটেয় আমি উঠে বাথরুমে ঘুরে এলুম, তারপরে ঘুমের ভান করে পড়ে রইলুম। পাঁচটায় কর্নেল উঠলেন। বাথরুমে গেলেন। তারপর যথারীতি টুপি ও ছড়ি নিয়ে বেরোলেন। দরজাটা আস্তে বাইরে থেকে ভেজিয়ে দিলেন। ওঁকে খুব ঠকাচ্ছি ভেবে আমার মনটা খুশি।
পাঁচটায় বাইরের (দক্ষিণে) সেই বারান্দায় পায়ের শব্দ পেলুম। কোথায় গাড়ির আওয়াজ হলো। বেরিয়ে দেখি, সোনালী রত্না দিব্য তৈরি হয়ে আমার অপেক্ষা করছে। বারান্দায় কফি খেতে খেতে চোপরা এল। কথামতো সে দীপ্তির বাসা থেকে দীপ্তিকে সঙ্গে এনেছে। কফি খাওয়া শেষ হলে সোনালী বলল-জয়ন্তবাবু! কুইক! চলুন, আমরা সাইট সিলেকশনটা করে ফেলি।
সোনালী একটা ব্যাগে থিয়েটারের ছোরা আর পেন্টের সরঞ্জাম নিয়েছে। আমরা তক্ষুণি গেট পেরিয়ে ছোট একটা রাস্তায় গেলুম। তার ওধারে ঘন গাছপালা ঝোপঝাড় ঢালু হয়ে নীচের উপত্যকায় নেমে গেছে। রাস্তা থেকে আন্দাজ পনের ফুট দূরে ঝোপের মধ্যে একটা বড় পাথর পাওয়া গেল। গাছপালা ঘাস এবং পাথরটা শিশিরে চবচবে হয়ে আছে। আমি ভেবেই পেলুম না, কীভাবে দীপ্তি মড়া হয়ে এখানে শোবে। দীপ্তির দিকে তাকালুম। এখন দেখি, সে যেন মরীয়া। তার মুখেচোখে দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ পাচ্ছে। সে বসে পড়ল এবং সোনালী তার পিঠে ছুরিটা সেট করতে থাকল। দিব্য বলল–জয়ন্তবাবু! আপনি সোজা এই রাস্তা দিয়ে এগোলে ঘুরতে ঘুরতে নদীর ধারে পড়বেন। সেখান থেকে পলি এনে ছড়িয়ে বাংলোয় যাবেন নিজের ঘরে। রণধীর, তুমি বরং পূর্বে এগিয়ে ওই বড় রাস্তায় যাও। আমি যাচ্ছি পশ্চিমে বড় রাস্তায় ঘুরতে। সোনালী আর রত্না যাবে বারান্দায়। সবাই বাংলোয় ফিরে আধঘণ্টা অপেক্ষা করবে। তারপর এখানে আসবে একেবারে কর্নেলকে নিয়েই।
দীপ্তি ওই অবস্থায় বসে খুঁতখুঁতে গলায় বলল–এতক্ষণ পড়ে থাকতে হবে এই ঠাণ্ডায়?
সোনালী ধমক দিয়ে বলল– প্রোপাজালটা কিন্তু তোমারই। ভুলে যেও না।
দীপ্তি করুণ মুখে ফের বলল–যদি কর্নেলের ফিরতে অনেক দেরী হয়ে যায়।
