কর্নেল টাকে হাত বুলিয়ে বললেন–তোমার পরামর্শ খুব উৎকৃষ্ট জয়ন্ত। যুক্তি আছে। তোমার অনুমানও সম্ভবত ঠিক।
উৎসাহে বললুম–আলবাৎ ঠিক। একটা ব্যাপার তো পরিষ্কার বোঝা যায়, লোকটা সেই দলেরই লোক। কোনও কথা ফাঁস করে দিতে চেয়েছিল অনিরুদ্ধবাবুকে। তা টের পেয়ে তাকে মেরে ফেলল ওরা। তাছাড়া….
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন–বলে যাও ডার্লিং!
–অনিরুদ্ধবাবু কে? না–উনি এক তৈল শোধনাগারের ডিরেক্টর। দ্বিতীয় পয়েন্ট লক্ষ্য করুন : লোকটা যে বই বেছে নিয়ে চিঠি রেখেছিল, সেটা পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি। এবং পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি একান্তভাবে তৈলশিল্পকেন্দ্রিক। এই যোগাযোগ কি আপনি আকস্মিক মনে করছেন?
কর্নেল সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন–অপূর্ব জয়ন্ত! এজন্যেই সব কেসে আজকাল তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাই। ব্রিলিয়ান্ট! বলে যাও ডার্লিং!
সবার আগে সেই বইটা আপনার পরীক্ষা করা দরকার!
–হ্যাঁ!
–অনিরুদ্ধবাবুর উচিত ছিল, রিফাইনারিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা।
কারণ?
–আমার ধারণা, ওখানে কোনও অন্তর্ঘাত ঘটাবার ষড়যন্ত্র চলেছে। সে কথাটাই লোকটা বলতে এসেছিল। সুযোগ পায়নি। তাই দেখা করতে বলে ওইভাবে। এবং খুন হয়ে যায়।
–রিফাইনারিতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখনই করেছেন অনিরুদ্ধবাবু।
–আমার আরও ধারণা, রিফাইনারির অফিসার ও কর্মীদের মধ্যে ওই দলের লোক আছে।
–অসম্ভব নয়, জয়ন্ত।
আমি আরও কিছু তত্ত্ব খুঁজছি, দেখি কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন এবং মেঝেয় কয়েকপা হেঁটে আমার দিকে হঠাৎ ঘুরে হো হো করে হেসে উঠলেন। বললুম– আমাকে তাচ্ছিল্য করতে পারেন, কিন্তু আমি বাজী রেখে বলতে পারি–একচুলও অযৌক্তিক কথা বলিনি।
কর্নেল বললেন–তাহলে জয়ন্ত, সব রহস্য ফাঁস হয়ে গেছে বলা যায়। কিন্তু একটা পয়েন্ট তুমি আমল দিচ্ছ না যে যদি কোনও অন্তর্ঘাত সম্পর্কে অনিরুদ্ধবাবুকে কেউ সতর্কই করতে চাইত, তাহলে চিঠি বা ফোনেই জানাতে পারত! দেখা করতে আসা, ওই বিশেষ বইটা চেয়ে নেওয়া এবং…জয়ন্ত, শুধু তাই নয়, যে পাতায় চিঠিটা ছিল, তার পেজমার্ক কত জানো? থ্রি জিরো–মানে তিরিশ!
বলেন কী!
–ওই পাতায় কী আছে, তাও জেনে নিয়েছি। চ্যাপ্টারটা পুরো লেখা হয়েছে সেই সুবিখ্যাত টি. ই. লরেন্স সাহেবকে নিয়ে। অর্থাৎ লরেন্স অফ অ্যারাবিয়ার কার্যকলাপ। আশা করি, লরেন্স সম্পর্কে তুমি বিশদ জানো। এমনকি সিনেমাতেও তার ক্রিয়াকলাপ দেখে থাকবে।
হাত তুলে বললুম–দেখেছি। আশ্চর্য ছবি!
.
ষোলো সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ সোনালীর জন্মদিনের একদিন আগেই আমরা দুজনে রানীডিহি পৌঁছলুম। রিফাইনারি থেকে দূরে চমৎকার পাহাড়ী এলাকায় ডিরেক্টর সায়েবের বাংলো এবং অন্যান্য অফিসারদের কোয়ার্টার। ছবির মতো দেখাচ্ছিল ঘরবাড়িগুলো। প্রাকৃতিক দৃশ্যও অপূর্ব।
সবে শুক্লপক্ষের চাঁদ উঠেছে। কর্নেল ড্রয়িং রুমে গল্প করছে। আমি দক্ষিণের বারান্দায় গিয়ে বসলুম। টিলার ওপর বাংলোটা। তাই জ্যোৎস্নায় নীচের উপত্যকাটা ভাগ্নি রহস্যময় দেখাচ্ছিল। বারান্দার ওপরে একটা হাল্কা আলোর বাল্ব রয়েছে। আলোটা নিভিয়ে দিলে বাইরের সৌন্দর্য পুরোপুরি ফুটত ভেবে সুইচ খুঁজছি, এমন সময় সোনালী, রত্না, দীপ্তি আর একটি অচেনা যুবক এল। সোনালী বলল–আলাপ করিয়ে দিই জয়ন্তবাবু। রত্নার দাদা দিব্যেন্দু। মানে আমারও মাসতুতো দাদা। দির্য, তোমাকে তো এঁর কথা বলেছি। জয়ন্ত চৌধুরী ….
দিব্যেন্দু নমস্কার করল হাসিমুখে।–দৈনিক সত্যসেবকে আপনার রিপোর্টগুলো আমি কিন্তু মন দিয়ে পড়ি। খুব ইন্টারেস্টিং!
রত্না বলল–তার চেয়েও ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা এবার আলোচনা করা যাক দিব্য। সোনালী, তুই শুরু কর।
চারটি মুখে ষড়যন্ত্রসঙ্কুল হাসি দেখছিলুম। বললুম–কী ব্যাপার?
সোনালী দ্রুত এদিক ওদিক দেখে নিয়ে চাপা গলায় বলল–জয়ন্তবাবু, ভয়ে বলব, না নির্ভয়ে? আপনি নিশ্চয় ওই গোয়েন্দা ভদ্রলোকের অ্যাসিস্ট্যান্টের রোলেও কাজ করেন?
হেসে ফেললুম। ব্যাপার কী? অবশ্য, আমি ওঁর নিছক ভ্রমণসঙ্গী।
সোনালী ফিসফিস করে বলল-কর্নেলকে নিয়ে আমরা একটু মজা করলে মানে জাস্ট এ ফান–আপনার আপত্তি হবে না তো?
–মোটেও না। বরং আমি আপনাদের দলে ঢুকে পড়ব। কিন্তু সাবধান, বুড়ো ভারি ধুরন্ধর।
রত্না বলল, –এত নাম ডাক শুনেছি। এত অদ্ভুত ব্যাপার নাকি করতে পারেন! এবার দেখা যাক্ হাতে নাতে!
সোনালী বলল–আমরা একটা মার্ডার কেস সাজাব, বুঝলেন?
হ্যাঁ, বলে যান।
এই সময় ড্রয়িং রুমের দরজা থেকে একটি মুখ উঁকি মারল চিনলুম। একটু আগেই আলাপ হয়েছে। অনিরুদ্ধের পি. এ. রণধীর চোপরা! বেশ স্মার্ট হাসিখুশি যুবক। এসে বিশুদ্ধ বাংলায় বলল–ডিসটার্ব করলুম না তো?
সোনালী উৎসাহ দেখিয়ে বললব্যস, মেঘ না চাইতেই জল। রণধীরদা, তোমাকে দলে নিলুম তাহলে। ব্যস, আমরা মোট ছ’জন ব্যাপারটা জানলুম। এবার প্ল্যানটা বলি। আমরা একটা চমৎকার মার্ডার কেস সাজাব। কিছু ক্লু রাখব। দেখব, কর্নেলের গোয়েন্দা বুদ্ধি কতখানি।
রত্না বিরক্ত হয়ে বলল–আহা, বলেই ফেল না বাবা। শুধু ভূমিকা করছিস।
সোনালী সিরিয়াস হয়ে চাপা গলায় বলতে শুরু করল–ওই যে গেট রয়েছে, তার বাইরে ঝোপঝাড়গুলোর মধ্যে একজায়গায় আমরা একটা ডেডবডি রাখব।
