–কিসের?
–এই নিছক একটি মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের তিনশো কিলোমিটার ভ্রমণের?
কর্নেল চোখে মুগ্ধতা ফুটিয়ে বললেন–জয়ন্ত, ডার্লিং! রানীডিহির সৌন্দর্য তুলনাহীন। মর্ত্যের স্বর্গ।
–হাতি! আমি শুনেছি, রানীডিহি শিল্পনগরী। আকাশ বাতাস কুচ্ছিত ধোঁয়া আর গ্যাসে ভরা। নরক বিশেষ।
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন–হ্যাঁ। কিন্তু সোনালীদের কোয়ার্টার যেখানে অবস্থিত, সেখানে গেলে পৃথিবীর যাবতীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নমুনা তুমি পাবে। নদী, পর্বতমালা, অরণ্য…
–এবং দুর্লভ প্রজাপতি পাখি কীটপতঙ্গ!
–ডার্লিং, আমি কথা দিচ্ছি, এবার আমি প্রকৃতিবিদ হিসাবে রানীডিহি যাবো না। যাবো…
ওঁকে থামতে দেখে বললুম–হুঁ, বলুন।
–যাবো আমার আসল মূর্তিটা পোশাকের তলায় লুকিয়ে নিয়ে।
–তার মানে?
–প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটার হিসেবেই।
চমকে উঠে বললুম–সে কী! কেন?
কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন–একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে জয়ন্ত। এটা না ঘটলে শ্রীমতী সোনালীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আমি অতদূরে কিছুতেই যেতুম না। স্বীকার করছি, জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খ্যাতি আছে। কিন্তু তার চেয়েও একটা জরুরী বিষয় সম্প্রতি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তোমাকে আগাগোড়া সবটা বলছি। ভাল করে শোনো।
কর্নেল আমাকে যা শোনালেন, তা সংক্ষেপে এই: এক সপ্তাহ আগে অর্থাৎ ৩রা সেপ্টেম্বর সোনালীর বাবা অনিরুদ্ধবাবু কর্নেলের সঙ্গে দেখা করেন। তারও দুদিন আগে রানীডিহিতে ওঁর কোয়ার্টারে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, তাই কর্নেলের পরামর্শ চাইতে আসেন। সেদিন ছিল রবিবার। বেলা একটায় লাঞ্চের পর উনি অভ্যাস মতো গড়াচ্ছেন, পরিচারিকা এসে খবর দেয় যে এক ভদ্রলোক জরুরী ব্যাপারে দেখা করতে এসেছেন। অনিরুদ্ধবাবু বিরক্ত হন। এটা দেখা করার সময় নয়। তাছাড়া উনি কোয়ার্টারে অপরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা করেন না। অফিসেই যেতে বলেন। পরিচারিকা সব জানে এবং বুঝিয়ে বলা সত্ত্বেও সেই লোকটি শোনেনি। বলেছে, দেখা না করলেই চলবে না। এবং এই দেখা করার পিছনে নাকি অনিরুদ্ধবাবুরই বিশেষ স্বার্থ আছে। অনিরুদ্ধবাবু বিরক্ত হলেও কৌতূহল দমন করতে পারেননি। তাই বলেন–ঠিক আছে, তুমি আধঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলল। এই আধঘণ্টা ভাতঘুম বাঙালীর মজ্জাগত এবং অনিরুদ্ধবাবু মনে মনে ভীষণ বাঙালী। যাইহোক, পরিচারিকা গিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে বললে সে ততক্ষণ সময় কাটানোর জন্যে একটা বই চায়। এটাই অদ্ভুত যে সে অন্য কোনও বই পছন্দ করেনি। আলমারিতে পশ্চিম এশিয়ার অর্থনীতি নামে প্রকাণ্ড ইংরেজি বই ছিল, সেটাই চায়। তারপর পরিচারিকা বইটি তাকে দিয়ে চলে আসে। আধঘণ্টা পরে অনিরুদ্ধবাবু ড্রয়িং রুমে যান। কিন্তু লোকটিকে দেখতে পান না। টেবিলে সেই বইটি পড়ে থাকতে দেখেন। বইটি রাখতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করেন, একটা ভাজ করা কাগজ উঁকি মারছে ফাঁকে। কাগজটা খুলে পড়ার পর হতভম্ব হয়ে যান উনি। তাতে ডটপেনে ইংরেজিতে লেখা আছে : যা বলতে এসেছিলুম, বলা হলো না। ওরা আমাকে ফলো করে এসেছে টের পেলুম। তাই চলে যাচ্ছি। আজ রাত এগারোটায় আপনি জলের ট্যাংকের পিছনে আমার সঙ্গে দেখা করুন। আমি সেখানে থাকব। আপনি কাকেও দেখামাত্র বলবেন–জিরো নাম্বার? সে যদি বলে–জিরো জিরো জিরো, তাহলে জানবেন সে আমিই। অন্য কিছু ঘটলে তখুনি পালিয়ে আসবেন। জিরো জিরো জিরো। ভুলবেন না।
নামের বদলে তিনটে শূন্য বসানো। বলা বাহুল্য, অনিরুদ্ধ এই অদ্ভুত চিঠি পেয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। ভাবেন, পুলিশের কাছে যাবেন। কিন্তু শেষ অব্দি কৌতূহল তার সব মতলব দাবিয়ে রাখে। যথাসময়ে সেই জলের ট্যাংকের কাছে যান। জায়গাটা খেলার মাঠ ও বড় রাস্তার সঙ্গমে রয়েছে। কিছু ঝোপঝাড় ও পাথরও আছে। উনি গিয়ে একটা লাশ দেখতে পান। পিঠে ছুরিমারা হয়েছে। তখনও রক্ত তাজা। সুতরাং ভীষণ ভয় পেয়ে পালিয়ে আসেন।
সকালে লাশটার খবর পেয়ে পুলিশ আসে। অনিরুদ্ধবাবু নিজেকে এ ব্যাপারে জড়াতে চাননি। লোকটাকে সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। যাইহোক, অনিরুদ্ধবাবুর মনে পড়ে যায় কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কথা। পরদিনই কলকাতা এসে দেখা করেন। সেই চিঠিটাও নিয়ে আসেন।
কর্নেল এই সাতটা দিন কি সব করেছেন, আমাকে কোনওরকম আভাস দিলেন না। শুধু বুঝলাম, হঠাৎ এই প্রখ্যাত ব্যক্তিটি রানীডিহি হাজির হলে পুলিশমহলে ঔৎসুক্য জাগতে পারে এবং সম্ভাব্য শত্রুপক্ষ–যারা সেই অজ্ঞাতনামা লোকটিকে খুন করেছে, তারাও সতর্ক হয়ে যায়–তাই সোনালীর জন্মদিনের অছিলা। অবশ্য, সোনালী এসব ব্যাপার জানেই না। সে তার জন্মদিনে আর সবাইকে নেমতন্ন করার জন্য কলকাতা এসে বাবার কথামতো কর্নেলকেও নেমতন্ন করে গেল।…..
কর্নেল চুপ করলে বললুম–ব্যাপারটা রহস্যময়। আমার মনে হচ্ছে, সেই সঙ্গে বিপজ্জনকও বটে। সচরাচর আপনি যে সব ব্যাপারে নাক গলান এবং কৃতিত্ব অর্জন করেন, এটা তত সহজ মোটেও নয়। আপনার লাইফ রিক্সের কথা ভেবেছেন তো?
কর্নেল একটু হাসলেন। কিছু বললেন না।
বললুম–এসব ব্যাপারে নাক না গলানোই উত্তম, আমার মতো সরকারী লোকেরা যা পারে, করুক! আপনি গোয়েন্দাবিদ্যায় যত ধুরন্ধরই হোন, ভুলে যাবেন না যে এই কেসে খুনী কোনও ব্যক্তিবিশেষ নয়, সম্ভবত একটা দল এবং এতে কোনও ব্যক্তিগত অভিসন্ধি কাজ করছে না। কে বলতে পারে, কুখ্যাত মাফিয়া দলের মতো কোনও আন্তর্জাতিক গুপ্তদল এর পেছনে আছে কি না? তাদের কী উদ্দেশ্য, তাও তো আপাতত আপনার জানা নেই।
