তখন চিকনডিহির বাংলো বিলকুল ফাঁকা। আমরা বেরিয়ে এসে একটা ঝাউবনের কাছে চুপচাপ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এই অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা নিয়ে এবার কণ্টডিহির পথে হেঁটে যাব। সেই সময় নির্জন তালাবন্ধ বাংলোর দিক থেকে কে ডাকল–হ্যালো ইয়ং ফ্রেণ্ডস! চমকে দেখি-কর্নেল সরকার।
আমরা ওঁকে শেষ দলটির সঙ্গে চলে যেতে দেখেছিলুম না? সবটাই রহস্যময় মনে হল। একি কোনও চতুর ফাঁদ পুলিশের? সেই ফাঁদে না পড়ার জন্য আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।
এসে হাসি মুখে বললেন, বরং আজ রওনা না দিলেই পারতেন আপনারা। বাংলোর চাবি আমি নিয়েছি। আসুন না, গল্পগুজব করে আর একটা রাত্তির কাটিয়ে দিই। এমন জায়গা ফেলে আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।
অমু দিগু ও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কিন্তু ইয়ে, খাওয়াটাওয়া…
কর্নেল জোরে হাসলেন।…আমার লোক এসে পড়বে এক্ষুণি। বলা আছে– আজ রাতটা এখানে কাটাব। আসুন। কোনও অসুবিধে হবে না।
দিগু বলল, কিন্তু আর একটুও থাকতে ইচ্ছে করছে না।
অমুও বলল, হা কী হবে? এমন একটা ইয়ের পর-ওঃ, হরিবল!
আমি বললুম– না কর্নেল, আমরা যাই। ভীষণ খারাপ লাগছে।
কর্নেল গম্ভীর মুখে মাথা দোলালেন, দ্যাটস নথ দা টুথ মাই ফ্রেণ্ডস।
চমকে উঠলুম, কেন? দিগুও ফুঁসে উঠল একই সঙ্গে কী বলতে চান আপনি? আর অমু হাতের মুঠো পাকিয়ে বলল, তাহলে টুথটা কী!
নিজেদের মনকে প্রশ্ন করুন, জবাব পাবেন। কর্নেল ছড়ি দিয়ে বালির ওপর ঢ্যারা এঁকে ফের বললেন, আপনাদের প্রত্যেকের মনে এই চিহ্নটা রয়েছে–জাস্ট এ ক্রস। দুট রেখা যে বিন্দুতে মিলেছে দেখছেন, ওটা হলো মিঃ মজুমদারের মৃত্যু। ব্যাপারটা লক্ষ্য করুন, তাহলে আমরা চারদিকে চারটে রেখা পেয়ে যাচ্ছি। আপনারা তিনজন তার তিনটে–অ্যাণ্ড দা ফোর্থ..হু ইজ হি? পুলিশ বলছে জানলার নিচের লোকটা। গোরস্থানের দিকে তার জুতোর চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর কী পাওয়া গেছে, জানেন? একটা ভাঙা কবরের কোণায় বালিতে ঢাকা একটা সমুদ্র-শামুক, তখুনি দিগু ছটফট করে বলল, আমি জানতুম–! কিন্তু কিছু বুঝিনি।
১৯৪২ এ এখানটা সমুদ্রের বানে ডুবেছিল। তাই অনেক বড়োবড়ো সমুদ্র শামুক এখানে পাওয়া যায়। খুব কঠিন খোল।–
দিগু কাঁপছিল। বলল, হা-হা, আমার কবিতায়
ওয়েট। কর্নেল হাত তুললেন।…যে কন্ট্রাক্টার সেই যুদ্ধের বাজারে সরকারকে কফিনের কাঠ সাপ্লাই করেছিল, তা বাজে কাঠ। তাই উইয়ের ঢিবিতে জমাট বেঁধে যায়।
দিগু বলল, সংহত কফিনে—
হ্যাঁ। তার মধ্যে শামুক ছিল এবং তার ভিতর লুকানো ছিল উজ্জ্বল স্ফটিকের মতো ভয়ঙ্কর বিষাক্ত পদার্থ ড্রাই এওজিন–যা জলে গলে যায়। বরফের সঙ্গে ভেজাল দিলে ধরা পড়ে না। মিঃ মজুমদারের মৃত্যুর কারণ তাই। ফোরেনসিক এক্সপার্টরা বলেছেন। তা–মিঃ দিগন্ত সেন, আপনি নিশ্চয় কোনওভাবে ওটার কথা। জানতেন, কবিতার মাধ্যমে আন্দাজে ঢিল ছোঁড়ার মতো কাকেও সতর্ক করে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু পুলিশকে বলেননি। আর পুলিশ কবিতা নিয়ে মাথা ঘামায় না। বিশেষ করে একালের কবিতা!..হেসে উঠলেন কর্নেল।
আমি বললুম– তাহলে কোন ফাঁকে খুনী মিঃ মজুমদারের গ্লাসে ড্রাই এওজিন রাখল?
আপনারা যখন মিসেস মজুমদারের চিৎকার শুনে দৌড়ে গিয়েছিলেন, তখন।
কিন্তু ভারত তো বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল।
লোকটা রাতকানা। আর তখন জ্যোৎস্নাও ছিল ক্ষীণ। তাছাড়া ওই ব্যস্ততা আর আতঙ্কের সময় লনের দিকে তাকানোর কথা তার নয়। সে ভাবছিল–মেমসাহেবের ঘরে ঢুকবে কি না।
দিগু বলল, জীপে আসবার পথে দূর থেকে একটা লোককে বালি সরাতে দেখেছিলুম ওই গোরস্থানে। সন্দেহ হয়েছিল। পরে এক ফাঁকে ওদিকে যাই। কিন্তু তখনই আমার কিছু কথা মনে পড়ে যায়। থমকে দাঁড়াই। একটু ভাবি। কোনও ফাঁদে ফেলবার জন্যে আমাকে এখানে ডাকা হয়নি তো? যাইহোক, গিয়ে ব্যাপারটা আবিষ্কার করি। কিন্তু আমি ভেবেছিলুম-ডায়মণ্ড স্মাগলিং, এর ব্যাপার।
এই সময় অমু বলল, আমি তোকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে কবরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর আরও অদ্ভুত ভঙ্গিতে তুই চলে এলি। প্রতিটি জুতোর ছাপ মুছতে মুছতে!
দিগু বলল, হ্যাঁ–ফাঁদে পড়ার ভয়ে।
কর্নেল বললেন, ফাঁদ! রাইট, রাইট। বাই এনি চান্স–মিঃ সেন, রাত্রিদেবীর সঙ্গে আপনার পরিচয় ছিল?
ভীষণ ছিল–হিন্দুস্থান পার্কে থাকার সময় থেকে।
এগেন বাই এনি চান্স বিহ্বলবাবু আসতে বলার পর রাত্রিদেবী আপনাকে কিছু লিখেছিলেন? ভয় নেই–আমি প্রাইভেট হ্যাঁনড। পুলিশ নই।
হ্যাঁ। সাংঘাতিক একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
যেমন?
মিঃ মজুমদারকে কোনও এক ফাঁকে খুন করতে হবে। তারপর রাত্রি আমার হবে।
আপনি সেই মতলব নিয়ে এসেছিলেন?
হুঁ।
আমি কাঁপছিলুম। রাত্রি! রাত্রি! কী সর্বনাশ, কী ধুরন্ধর! দিগুকে সে…।
অমু বলে উঠল, আশ্চর্য! কর্নেল! কর্নেল! রাত্রি আমাকেও তাই লিখেছিলেন। আমিও মিঃ মজুমদারকে খুন করতে এসেছিলুম। ঠিক একই পুরস্কার রাত্রি আমার হবেন।
কর্নেল আমাকে প্রশ্ন করলেন, অ্যাণ্ড মিঃ সকাল গুপ্ত?
গলা কাঁপল জবাব দিতে।…হ্যাঁ। আমাকেও। কিন্তু দ্যাট ইজ অ্যাবসার্ড, অসম্ভব।
দিগন্ত অস্থির হয়ে বলল, আমি তো খুন করিনি! এখানে এসে বিহ্বলবাবুকে খুন করার কথা আর ভাবতেও পারছিলুম না। সেটা হয়তো ভীষণ ভয়ে। জীবনে কখনও কারো গায়ে হাত তুলিনি। প্রেম আমাকে মানুষ খুন করাবে–প্রেমের এত বড় মর্যাদা দেবার সাহস আমার ছিল না।
