কর্নেল লাফ দিয়ে লনে নামলেন। আমরা নড়তেও ভয় পাচ্ছিলুম। লাশটার ওপর কুকুর ও শকুন পড়ল বলা যায়। এগোনো পিছন হাঁটু ভাঁজ, ফিতে মাপজোক। সেই খুটিনাটি ব্যাপারগুলোর দিকে আমার একটুও মন নেই। আমার মন রাত্রির দিকে। এখন একবার রাত্রিকে দেখে আসতে কী যে ইচ্ছে করেছে!
ওঁরা মজুমদারের ভাঙা গ্লাসটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। বারান্দার নিচে সশস্ত্র সেপাইরা সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে। আমি আর থাকতে পারলুম না। উঠলুম। অমু চাপা গলায় জিগ্যেস করল, কোথায় যাবি? যাসনে। আমরা খুনের আসামী।
গ্রাহ্য করলুম না। রাত্রি আমাকে টানছিল। নেশার ঝোঁকে ঘরে ঢুকে গেলুম। এত বড় দুর্যোগে রাত্রির পাশে দাঁড়ানো দরকার। তাকে সাহস দেওয়া জরুরী কাজ। রাত্রির ঘরে আলো থাকার কথা–নেই কেন? ছেঁড়া পর্দা তুলতেই চমকে উঠলুম।
জানালা দিয়ে যথেষ্ট আলো পড়েছে চাঁদের। রাত্রির বিছানা খালি–কেউ নেই।
দৌড়ে বেরিয়ে ডাকলুম কর্নেল! কর্নেল। মিসেস মজুমদার বিছানায় নেই।
সবাই একসঙ্গে আমার দিকে তাকাল। তারপর কর্নেল আর একজন অফিসার টর্চ হাতে দৌড়ে এলেন। ঘরে ঢুকে ব্যাপারটা দেখে নিলেন। অফিসারটি কাদের ডেরেক বললেন, চাকলাদার! এক্ষুণি দুজন সেপাই নিয়ে খুঁজুন। ভদ্রমহিলা লুনাটিক–আই মিন ডি এম-এর স্ত্রী কুইক!
চাকলাদার আর সেপাই দুজনের সঙ্গে আমিও বেঁকের বশে দৌড়লুম। কেউ বারণ করল না। কিন্তু রাত্রির জন্যে আর কিছু সইতে পারছিলুম না। আমার অবচেতনে লুকানো ডিনামাইট প্রেমের পিণ্ড ফেটে আগুন ও আওয়াজ দিচ্ছে। বালিয়াড়িতে উঠে ভাঙা গলায় চিৎকার করলুম, রাত্রি! রাত্রি! ওরা চারিদিকে আলো ফেলতে লাগল টর্চের। কিন্তু কখন আমি একা হয়ে পড়েছি দল থেকে। সামনে জ্যোৎস্নায় নির্জন বালিয়াড়ি ঘুমের দেশের মতো পড়ে রয়েছে। তারপর দেখলুম গোরা গোরস্থানের সেই ভাঙাচোরা মনুমেন্টটা। ওখানেই গোরস্থান। কয়েকপা এগোতেই চোখে পড়ল–কে যেন টলতে টলতে হেঁটে যাচ্ছে! হ্যাঁ– রাত্রি! বালির ওপর এগোতে তার কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়। কয়েকটি লাফে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালুম।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বলে উঠল–না, না! দোহাই তোমার-আমাকে মেরো না। খুন করো না আমাকে!
ধমক দিয়ে বললুম–আঃ কী হচ্ছে! রাত্রি, রাত্রি, শোনো
তার হাত ধরামাত্র সে চেঁচিয়ে ওঠার চেষ্টা করল–কিন্তু গোঁ গোঁ শব্দ হল শুধু–আর তখনই চাকলাদারের জোরালো আলো এসে পড়ল আমাদের ওপর।
অচৈতন্য রাত্রিকে ধরাধরি করে বয়ে আনলুম আমরা।
এসে দেখি রীতিমতো কনফারেন্স বসেছে ভিতরের বড় ঘরটায়। বাইরে অমু বসে রয়েছে। বারান্দায় সেপাইরা, ভারত আর ড্রাইভার দুজন ফিসফিস করে কথা বলছে। অমু চাপা স্বরে বলল, দিগুর স্টেটমেন্ট নিচ্ছে। আমাদেরও নেবে।
আমি ক্লান্ত। রাত্রিকে তার ঘরে নিয়ে গেল চাকলাদাররা। আমি রাত্রির কথা ভাবতে থাকলুম। কেন রাত্রি আমাকে দেখে চমকাল? কী উদ্দেশ্যে সে গোরস্থানে। যাচ্ছিল? আর আমাকে দেখামাত্র কেন অমন করল? কী ছিল আমার চোখে মুখে? সেই অবচেতন ডিনামাইট ফেটে যাবার পরের চিহ্নগুলো বা ভাজ, পোড়া পাথর, উষ্ণতা?
অমুর ডাক এল। সে মার্চ করে ঢুকল যেন। সেই মুহূর্তে মনে পড়ে গেল লনে টেবিল সাজানোর সময় যখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দৃশ্য দেখছিলুম, অমু তখন একবার বেরিয়েছিল। বালির ঢিপির আড়ালে তাকে হারাতে দেখেছিলুম। মাই গুডনেস! ওই ঢিবির ওদিকেই তো কবরখানাটা! তবে কি
না, আর ভাবব না। ভাববার কিছু থাকলে, রাত্রির কথা। রাত্রির বড় দুঃখের দিন এল, নাকি রাত্রির বড় সুখের দিন এল! অনেক টাকা পাবে রাত্রি। ইনসিওরেন্সের টাকা, সরকারী সহায়তাবাবদ টাকা।
কিন্তু হঠাৎ আমার গা ঘুলিয়ে হাসি ঘৃণা রাগ বিরক্তি অস্বস্তির হুটোপুটি বেধে গেল–মুরগির ঘরে শেয়াল ঢোকার মতো অবস্থা। কলকাতার হরকান্ত সেন লেনের তেলেভাজাওয়ালা ভুজঙ্গের সেই পিলেওঠা সুন্দর মেয়েটা যুবক ও কিশোররা বাগে পেলেই যার নতুন স্তনের নরমতার খবর নিত, তার নাম কী ছিল? নিশ্চয় রাত্রি নয়–অন্য কিছু। গোপালী? –গোপালী। গোপালীকে ভুজঙ্গ কলেজ অব্দি পড়িয়েছিল। তারপর গোপালী হলো রাত্রি। থিয়েটারে নেমেছিল কিছুকাল। ফিলমেও অল্পস্বল্প। খুব উঁট হয়েছিল কয়েকটা বছর। ভুজঙ্গ মারা গেছে। ভুজঙ্গের বউ তো গোপালীর দেড় বছর বয়সে মারা যায়। তারপর রাত্রি হিন্দুস্থান পার্কে সঁটের সঙ্গে বাস করত কোন এক মিলন গাঙ্গুলির বউ হয়ে। তারপর সে এক লম্বা কাহিনী। ডি এম কী বেকায়দায় পড়ে ওকে বিয়ে করে ফেলেছিলেন, জানিনে। তারপর মিলন গাঙ্গুলির অবস্থা বোঝা যায়। মাই! মাই! তবে কি সবটাই
না। জানলার নিচের লোকটা স্রেফ হ্যাঁলুসিনেশন। মার্লো পোঁতি লিখেছেন।
ঘৃণা-ঘৃণা জীবনকে থুঃ, থুঃ! রাত্রিকে–থুঃ থুঃ! ছেনাল খানকি বেশ্যাকে থুঃ থুঃ! তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে–থুঃ থুঃ।
সেপাইটা পিছন থেকে বলল, বমিবমি লাগছে স্যার? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে। দেখলুম। লোকটার চোখে সন্দিগ্ধতা! তারপর আমার ডাক এল।…
.
০৪.
সেই রাত কখন শেষ হলো, বালিয়াড়ির ওপর ফুড়ুত করে উড়ে এল সূর্য, তারপর উড়তে উড়তে চলল আরেক বালিয়াড়ির দিকে–অস্থির গরম কড়াইয়ে অসম্ভব ঠাণ্ডা থেকেও সেদ্ধ ভাজা ভাজা হলুম, সে বর্ণনা দিচ্ছি না। কিন্তু আমরা ভাল খেতে পেয়েছি, শোবার জায়গা না পেলেও। জেলাশাসকের হত্যাকাণ্ড। সরকারের বড় বাড়ি থরথর করে কেঁপেছে। চিকনডিহির বাংলো পুলিশ আর লোজনে থইথই করল সারাদিন। ফোরেনসিক এক্সপার্টরা দফায় দফায় পরীক্ষা করলেন সবকিছু। আমাদের জুতোর ছাপ নিলেন। কেন নিলেন, তা কর্নেল এসে জানালেন যখন আমরা দায়মুক্ত হয়েছি। আর একজন লোক সত্যি ছিল–ওঁরা প্রমাণ নাকি পেয়েছেন সেই জানলার নিচের লোকটি। তাই আমরা বেকসুর খালাস। খালাস তবে সরকারী সাক্ষী হতে হবে।
