কর্নেল বললেন, বাদশা জাহাঙ্গীর এবং শের আফগানের স্ত্রী নূরজাহানের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে! ভালমন্দ যাই হোক, জাহাঙ্গীর প্রেমের ঐরকম মর্যাদা। দিয়েছিলেন।
অমু বলল, বিশ্বাস করুন। হয়তো পারতুম, কিন্তু ওইভাবে কাপুরুষের মতো নয়। মদ খেয়ে বিহ্বলবাবুকে টেনে নিয়ে যেতুম বালিয়াড়িতে–তারপর গলা টিপে মারতুম। এই ছিল আমার প্ল্যান।
আমি বললুম– হ্যাঁ–ওইভাবে খুন করা নীচতার পরিচয়, প্রেমিকের নয়। প্রেমিক ডুয়েল লড়বে। ওইভাবে বিষ খাইয়ে কাপুরুষের মতো মারে যে–সে প্রেমে নয়, প্রতিহিংসায় উগ্র।
কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে দেয়ার ওয়াজ এ ফোর্থ প্রেমিক–তাকেও চিঠি লিখেছিলেন রাত্রি, দ্যাটস মাই পয়েন্ট।
তিনজনে একসঙ্গে বললুম– হ্যাঁ। ঠিকই।
কিন্তু কে সে? কোথায় গেল সে? গোরস্থানে জুতোর ছাপ রেখে সে রাত্রিদেবীকে ফেলে কোথায় পালালো বলুন তো?
তিনজনে ঘাড় নাড়লুম। জানি না। সেই সময় কর্নেল একটা অদ্ভুত কথা বললেন। বিহ্বলবাবু তাকে নাকি আসতে বলেছিলেন, কী একটা রহস্যময় ব্যাপার ঘটছে বলে তার সন্দেহ। সেটা এখানেই নাকি ঘটছে ঘটতে পারে কর্নেল উপস্থিত থাকলে সেটার রহস্য ফাঁস করার আশা আছে। বিহ্বলবাবু তা নিয়ে খুব ধাঁধায় পড়েছেন। বিহ্বলবাবুর দুর্ভাগ্য!
তারপর স্তব্ধতা ভেঙে আমি বললুম– কাল রাত্রে রাত্রি গোরস্থানের দিকেই যাচ্ছিলেন। কেন, অনুমান করতে পারেন কর্নেল?
কর্নেল জবাব দিলেন, নিশ্চয় ড্রাই এওজিনভরা শামুকটা ফেলতে। কারণ দিগন্তবাবু যেভাবে হোক কিছু আঁচ করেছেন–এটাই ভেবেছিলেন উনি। তাছাড়া দিগন্তবাবু যে ওটা আবিষ্কার করেছেন, এটাই তো ওঁর পক্ষে বিপজ্জনক ঘটনা। সব প্ল্যান ভেস্তে যেতে পারে। তবে ভেস্তে যায়নি। এর কারণ, দিগন্তবাবু বিষকে হীরে ভেবেছিলেন–স্মাগলিং অ্যাফেয়ার।
দিগন্ত বলল, তাহলে রাত্রি মাত্র একজনকেই প্রেমিক হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন। তার জন্যেই কি তিনি ওই সাংঘাতিক জিনিসটা লুকিয়ে রেখেছিলেন?
কর্নেল বললেন, তাই দাঁড়ায়। আততায়ীর প্রেমিকটিকে তিনি চিঠিতে জানিয়ে থাকবেন–
বাধা দিলুম–তা কেন? তাহলে তো তিনি যে কোনও সময় স্বামীকে ওই বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে পারতেন!
তাতে বিপত্তি ছিল, মাই ইয়ং ফ্রেণ্ড! তার চেয়ে নির্বাচিত প্রেমিকাকে দিয়ে কাজ করিয়ে অন্য প্রেমিকদের ওপর দায় চাপানো এবং সেই সঙ্গে নিজেও নিরাপদ থেকে যাবার উপায় তিনি বের করেছিলেন। তার অসুখ তো ভান–অভিনয় মাত্র। তিনি আততায়ীকে গ্লাসে বিষ রাখার সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। ব্রোমাইড খাইয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টায় আমি তো টের পেয়েছিলুম। সম্ভবত বিহ্বলবাবুও একটা কিছু আঁচ ইতিমধ্যে করেছিলেন তাই আমাকে আসতে লিখেছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য।
কথা বলতে বলতে সূর্য ডুবে গেল। কর্নেলের লোকটি সাইকেল চেপে এসে পড়ল। কিন্তু আর কেন থাকব? আমি বললুম–আমার থাকার উপায় নেই। কাজ আছে। আমার এখানে থাকতে একটুও ইচ্ছে করছে না।
দিণ্ড পা বাড়িয়ে বলল–ক্ষমা করবেন, কর্নেল। আমি যাই। তারপর আমাদের দিকে একবারও না তাকিয়ে লম্বা পায়ে চলে গেল।
অন্তু ইতস্তত করে বলল, যাবি সকাল থেকে যা না।
ক্রমশ একটা গভীর অন্ধ জেদ আমাকে পেয়ে বসছিল। কী ব্যর্থতা চারিদিকে! রাত্রিকে–যা বোঝা গেল, গ্রেফতার করা হবে এবার। প্রচণ্ড শূন্যতা ঝাঁপিয়ে পড়েছে আমার ওপর। রাত্রি-মোহময়ী রাত্রি! বললুম– না রে! আমি যাই। চলি কর্নেল। কর্নেল আর অমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
একেই বলে গোধূলিকাল। রাস্তা ছেড়ে সোজা যে পথে এসেছিলুম, চললুম। বালিয়াড়ি ও ঢিবিগুলো ডিঙিয়ে। দিগুকে ধরা দরকার। কিন্তু তাকে রাস্তায় কোথাও দেখতে পেলুম না। এখানে ওকে খুঁজে বের করা কঠিন।
একটু পরে এক জায়গায় থমকে দাঁড়ালুম। হাঁটু দুমড়ে যেন ক্লান্তি আমাকে চাপ দিল। টেনে ধরল বালির স্তূপ।….
তারপর পিছনে হঠাৎ দিগুর কণ্ঠস্বর শুনলুম–সকাল! ও কী করছিস?
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
সকাল, কাল আসবার পথে কবরে তুই
অমনি বালি মাখানো বড় ছুরিটা তুলে লাফ দিলুম তার দিকে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, কর্নেলের মিলিটারি আওয়াজ এল ঢিবির ওপর থেকে–খবদার! হাত ওঠান–হ্যাণ্ডস আপ!
আমি হুমড়ি খেয়ে বালির ছোট্ট স্কুপের পাশে সদ্য বেরকরা একজোড়া জুতো আর প্যান্টশার্ট বুকে চেপে, ছুরিটা সুদ্ধ আঁকড়ে ধরলুম। তারপর দৌড়ে যেতেই দিগু আমাকে পিছন থেকে চেপে ধরল। কর্নেল কাছে এসে বললেন, এইরকমটি আশা করেছিলুম।
না, কর্নেল একা নয়–অমু এসেছে। সে জুতোদুটো দেখে চেঁচাল–এই তাহলে চার নম্বর লোক!
না, আরও সব আসছে। পাঁচজন পুলিশ উঁচু বালিয়াড়ি দিয়ে নেমে আসছে আমার দিকে। আমি হাহাকার করার মতো বুক ফাটিয়ে গলা ভেঙে চেঁচিয়ে উঠলুম–আমি মিলন গাঙ্গুলী, দা ফোর্থ ম্যান। একই শরীরে থার্ড অ্যাণ্ড ফোর্থ ম্যান। সকাল গুপ্ত এবং মিলন গাঙ্গুলী। আমার স্ত্রী রাত্রিকে ফিরে পাবার লোভে মজুমদারকে খুন করেছি। তোমরা আমাকে মেরে ফেলল! লাথি মারো! আমি শালা মিলন গাঙ্গুলী…. কে আমার মুখে থাবার মতো হাত রাখল।
একটু পরে সবাই আস্তে আস্তে চলেছি রাস্তার দিকে। কর্নেল সরকারের গত রাত থেকে পেতে রাখা এত বড়ো ফাঁদটা টের পেয়েও পাইনি। আসলে আমার উপায় ছিল না। কিন্তু কী হবে বেঁচে? জীবনে এত ঘৃণা নিয়ে বাঁচা যায় না। কাল রাতে ওই ঘৃণাই রাত্রিকে খুন করবার জন্য তার গলায় আমার হাত উঠিয়েছিল– কিন্তু পুলিশের আলো তাতে বাধা দিয়েছিল।
