পাহাড়ের দক্ষিণ গা দিয়ে যে-পথ, সে-পথে তোমরা এসেছ বা গেছ। কিন্তু পশ্চিম গা দিয়ে গাড়ি চলার কোনও পথ আছে কি?
আছে স্যার। তবে কোনও তৈরি রাস্তা নয়। ঝোপঝাড় বিশেষ নেই। বালিয়াড়ি মতো আছে। ইচ্ছে করলে কেউ পাহাড় ঘুরে পশ্চিম থেকে উত্তর হয়ে পুবদিকে এসে আশ্রমের পথে উঠতে পারে। তারপর এইগেস্টহাউসের পিছনের সদর রাস্তায় আসা যায়।
মিঃ পানিগ্রাহী, পিছনটা তো আপনার ঘর থেকে দিব্যি দেখা যায়। কোনও গাড়ি দেখেছিলেন রাত্রে?
পানিগ্রাহী বললেন, অসম্ভব! রাত্রের বৃষ্টি ছিল অকল্পনীয়। ওই অবস্থায় কেউ গাড়ি বের করতে সাহস পাবে না।
কিন্তু আমি বাংলোর পূর্ব গেটে গাড়ির চাকার দাগ দেখেছি। হিলের দক্ষিণ দিককার জঙ্গলের রাস্তা–মানে আপনাদের যাওয়া-আসার রাস্তা অবশ্য পাথুরে। কোনও দাগ পাইনি। যদিও ভেবেছিলুম, এই পথেই রাত্রে বৃষ্টির মধ্যে একটা গাড়ি এসেছিল এবং চলে গেছে। ভেবেছিলুম নয়–গাড়ি যাওয়া-আসা ফ্যাক্ট। কিন্তু উত্তর অংশটা খুঁজিনি। এখন মনে হচ্ছে ওদিক দিয়েই গাড়িটা এসেছিল এবং চলে গিয়েছিল।
অ্যাবসার্ড! কে অত রাত্রে গাড়ি নিয়ে যাবে–আমার বাংলোয়?
খুনী যাবে–উঁহু, গিয়েছিল। সুমন্ত চলে আসার পরেই সম্ভবত কয়েক মিনিটের মধ্যে গাড়িটা গিয়েছিল ওখানে।
তাহলে তো আলো নজরে পড়ত!
ঠিক। আলো জ্বালেনি খুনী। অন্ধকারেই গিয়েছিল।
অসম্ভব! ওই বিপথে ঝোপঝাড় বালিয়াড়িতে
মিঃ পানিগ্রাহী, ধরুন, ওই জায়গা–তার মানে পুরো এলাকা খুনীর এত মুখস্থ যে সে বিন্দুমাত্র অসুবিধা বোধ করেনি। সে এমন লোক যে বাংলোর চারপাশের নাড়িনক্ষত্র তার জানা। তাই আলো জ্বালাতে হয়নি। আলো জ্বাললে অনেকের চোখে পড়ত। তাছাড়া চুপি চুপি আসতে চেয়েছিল সে।
কে হতে পারে সেভারতবাবু ছাড়া? নির্ঘাৎ ওই শয়তানটা। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী এবার আমার ধারণার কথা বলি। খুনী চুপি চুপি এসে বাংলোর দরজায় নক করেছিল। উঁহু, সে সোজা তন্দ্রার নাম ধরে ডেকেছিল। বোঝা যায়, তন্দ্রা তার সুপরিচিত। তাই সে তাকে তক্ষুনি দরজা খুলে দেয়। এবং তাকে সে রীতিমতো শ্রদ্ধাভক্তি করত বলেই তক্ষুনি সিগারেটটা হাঁটুর পাশে সোফার গায়ে ঘষে নিভিয়ে ফেলে। বলতে বলতে নিজের যুক্তির শক্তিমত্তা নিজেই টের পেয়ে পানিগ্রাহী লাফিয়ে উঠলেন।…মিলে যাচ্ছে, একেবারে দুয়ে দুয়ে চার মিলে যাচ্ছে। এখানে হোটেলওয়ালা ভারতবাবু ছাড়া তার তো আর কারও সঙ্গে আলাপ ছিল না। আর ওকে সে বয়সের খাতিরে হোকনজর রাখার সুবিধে হবে বলে অন্তরঙ্গ হয়ে শ্রদ্ধাভক্তি দেখাতে চেয়েছিল নিশ্চয়। বলে যান–আমার কাছে খুনীর চেহারা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এতক্ষণ ধারণা ছিল, তার লোক তাকে খুন করেছে। এবার বোঝা যাচ্ছে না, সে নিজেই ওকাজ করেছে। মিঃ শর্মা, তাহলে বুঝতে পারছেন তো? নিশ্চয় তন্দ্রা কিছু জেনে ফেলেছিল আঁটঘাটের খবর। তাই ভারত মরীয়া হয়ে উঠেছিল।
শর্মা বললেন, তাই দাঁড়াচ্ছে বটে। প্রথমে মুখোশপরা লোক লাগিয়ে রাংতার ছোরা দেখিয়ে ভয় পাইয়ে দেওয়া যথেষ্ট মনে হয়নি। কারণ, সেই মুখোশধারী সম্ভবত ফিরে গিয়ে বলে থাকবে যে আসামিরা ফার্মে ঢুকে পড়েছে। তার মানেই প্রতিদ্বন্দ্বী পানিগ্রাহীসায়েবের লোকের কানে যাওয়া! আরও বিপদের সম্ভাবনা এবার। কাজেই একেবারে খতম করাই ভাল। ভারতবাবুকে চেনে তন্দ্রা। কাজেই তাকে দেখল…
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, প্লীজ প্লীজ! আমাদের এখন আরও কিছু প্রমাণ সংগ্রহ বাকি আছে। সুমন্ত, এবার আমার আরও কিছু প্রশ্নের জবাব দাও।
— পানিগ্রাহী কটমট করে তাকালেন সুমন্তের দিকে। সুমন্ত গ্রাহ্য করল না। কর্নেলের দিকে তাকিয়ে সপ্রতিভ মুখে বলল, বলুন স্যার?
কর্নেল বললেন, একটা কাগজ তুমি আর তন্দ্রা পড়ছিলে শার্কে বসে থাকার সময়। তারপর তন্দ্রা কাগজটা কুচিকুচি করে ফেলে দেয়। কী সেটা?
একটা উড়ো চিঠি, স্যার। দুপুরে ডাইনিং হলে খেয়ে আমি আর তন্দ্রা ওপরে স্যুটে ঢুকলুম, দেখি–চিঠি পড়ে রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে :
ডাইনি মেয়ে দুটোকে–
তোরা যদি আজই হোটেল ছেড়ে না যাস, ভীষণ বিপদ হবে। তোদের যে পাঠিয়েছে, তাকে বলিস–পাখি উড়ে গেছে চিরকালের মতো …
এই সময় পানিগ্রাহী প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, অ্যাঁ! উড়ো চিঠির কথা তো বলোনি!
কর্নেল পকেট থেকে লম্বা সরকারী খাম বের করলেন। তারপর ভিতর থেকে কয়েকটা কুচি কাগজ বের করে বললেন, এগুলো চিনতে পারছ?
সুমন্ত সোৎসাহে বলল, হ্যাঁ স্যার। ওইটাই। বড়বড় আঁকাবাঁকা হাতের লেখা। ইংরেজিতে লেখা–হ্যাঁ, ওটাই বটে।
কর্নেল পানিগ্রাহীকে প্রশ্ন করলেন, আপনি চিনতে পারছেন, এ হাতের লেখা কার?
পানিগ্রাহী একবার দেখে নিয়ে বললেন, না। তাছাড়া অমন টুকরো কাগজের লেখা চেনা অসম্ভব আমার পক্ষে। তবে বাজী রেখে বলব, ও ভারতের লেখা। এক্সপার্টের কাছে পাঠান।…তারপর সুমন্তের দিকে কটমট করে চেয়ে বললেন, তুমি একটা ওয়ার্থলেস!
কর্নেল কুচিগুলো খামে ভরে সুমন্তকে বললেন, তাহলে চিঠিটা তোমরা। গতকাল দুপুরে খাওয়ার পর পেলে। তারপর কী করলে?
সুমন্ত বলল, টের পেলুম, পানিগ্রাহীদা ঠিক জায়গায় তাক করেছে। তাকে বললুম– ভয়ের কারণ নেই। পানিগ্রাহীদা নিশ্চয় পুলিস আর নিজের লোকজন নিয়ে তৈরি হচ্ছেন। উনি বলে দিয়েছিলেন, ২২ তারিখ রাত্রেই কিছু ঘটবে। কাজেই রাত্রি আসুক আগে। আমরা কড়া নজর রাখি। কিন্তু তন্দ্রা আমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলল।
