তোমাদের পায়ের দাগ নরম জমিতে নিশ্চয় থাকত। কিন্তু গোপালকিপোর ট্রাকটার চালিয়ে তা নষ্ট করে দিয়েছে। তবে মাচানের দুটো বাঁশের চাপে গর্ত থেকে গেছে। তোমরা মাচানের একদিক মাটিতে ঠেকিয়ে লাশটা ঠেলে ফেলে দিয়েছিলে। তাই লাশের মাথা ও পায়ের কাছে দুটো গর্ত দেখলুম। দুটো বাঁশের মাথায় চাপা পড়ে গর্ত দুটো হয়েছিল।
তাই হবে।
তারপর?
তারপর চুপিচুপি লোক চারটে চলে গেল। নিষেধ করে দিলুম ব্যাপারটা গোপন রাখতে। তা না হলে তারাও তো বিপদে পড়ে যাবে।
তুমি কী করলে।
প্রথমে আমি খাটিয়াটা নিয়ে গিয়ে শ্মশানে ফেলে দিলুম। তোষকটা আর দড়িগুলোসুষ্ঠু। তারপর ভিজতে ভিজতে ফিরলুম। তখন রাত একটা বেজে গেছে। আমি বাংলোয় গিয়ে রইলুম। আর কোন চুলোয় যাব, বলুন?… পানিগ্রাহীদার ওপর আমার খুব রাগ হয়েছিল। তাছাড়া কেমন সন্দেহও জাগতে শুরু করেছিল। ভারতবাবুর ব্যাপারটা গোলমেলে মনে হচ্ছিল… ।
পানিগ্রাহী ফুঁসে উঠলেন–যা-তা কী বলছ সুমন্ত?
কর্নেল বাঁধা দিলেন।..প্লীজ। সুমন্ত, তুমি বলো।
সুমন্ত বলল, ওই বাংলোয় রাত কাটানো কী দুঃসাধ্য তখন। যে-ঘরে যে বিছানায় শুয়েছি, তার একহাত দূরে তাকে কেউ স্ট্যাব করেছেউঃ! হরিবল। ঘুম তো হলোই না। বৃষ্টি ছাড়ল শেষরাত্রে। ভোরে উঠে বেরিয়ে চলে গেলুম পাহাড়ের ওপর আশ্রমে। অনেকক্ষণ কাটালুম। মাথা ঘুরছিল। তারপর সটান গেলুম সেলুনে। কারণ, বুঝতে পারছিলুম, আমার লম্বা চুল শক্ত হয়ে উঠেছে। তারপর সব জানতে পারলুম লোকের মুখে। সমুদ্রের ধারে-ধারে ঘুরে ঠিক করলুম, পানিগ্রাহীদার কাছে কৈফিয়ত নিতেই হবে। আগাগোড়া একটা ভাওতার মধ্যে কেন উনি আমাকে আর তাকে ঘোরালেন?..
পানিগ্রাহী লাফিয়ে উঠলেন কিন্তু কর্নেল তার হাত ধরে নিবৃত্ত করে বললেন, অধৈর্য হবেন না মিঃ পানিগ্রাহী। সুমন্ত ইজ রাইট। ভারতবাবুর গতিবিধির উপর নজর রাখতে চেয়েছিলেন তার প্রমাণ আপনার এই তৃতীয় চিঠিটি। এবং…
সুমন্ত বলে উঠল, পানিগ্রাহীদার হুকুমে অনেক কাজ করেছি। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমাকে বুকে বেলুন বেঁধে মডগার্লও সাজতে হলো! এখন আমার সবটাই এত অপমানজনক মনে হচ্ছে। এর মধ্যে ওঁর কোনও পলিটিক্যাল মোটিভ নেই! সবটাই ব্যক্তিগত। নিশ্চয় ভারতবাবুর ওপর অন্য কোনও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা আছে ওঁর।
আবার দুপক্ষকে সামলাতে হলো। কর্নেল বললেন, উত্তেজিত হবেন না কেউ–প্লীজ। আমরা কেসের খুব ভাইটাল পয়েন্টে এসে গেছি।
পানিগ্রাহী বললেন, ব্যক্তিগত ব্যাপার হবে যদি, সি.বি.আই. থেকে মিঃ শর্মাকে কি ছেলেখেলা করতে ডেকেছিলুম?
সুমন্ত বলল, দ্যাটন দা শো বিজনেস; ওটা আপনার চালাকি!
কর্নেল বললেন, প্লীজ, প্লীজ! আচ্ছা মিঃ পানিগ্রাহী, এই গেস্টহাউস থেকে বেরোতে হলে নিচের লাউঞ্জ পেরোতেই হবে–আমি লক্ষ করে এসেছি। তাহলে আপনার এখানে চেক ইন করা অব্দি কবার বাইরে বেরিয়েছেন, তার রেকর্ড আমরা ম্যানেজারের কাছে পেয়ে যাব। কী বলেন?
পানিগ্রাহী বললেন, একশোবার পাবেন। নিচে চব্বিশ ঘণ্টা কেউ না কেউ কাউন্টারে থাকে। হয় ম্যানেজার, নয় কোনও ক্লার্ক। নাইট ডিউটির ব্যবস্থা রয়েছে। চেক করুন, তাহলে বুঝবেন। মাত্র একবারই আমি বেরিয়েছিলুম–গতরাত্রে। জাস্ট সাড়ে দশটায়।
কর্নেল পকেট থেকে এবার আরেকটা নীলখামের চিঠি বের করে বললেন, এই চিঠিটা আমি বাংলোয় পেয়েছি। ওপরে লেখা রয়েছে প্রাপক শ্রী মদনমোহন পাণিগ্রাহী। কিন্তু চিঠিটার লেখকও শ্রী মদনমোহন পানিগ্রাহী। তারিখ ২১ জুলাই।
হ্যাঁ–আমি ওই চিঠিতেই সুমন্তকে মেয়ে সাজবার নির্দেশ দিয়েছিলুম। প্রাপকের নাম…।
বুঝেছি। ওটা আপনার সর্তকতা। চিঠিটা দেখেই আমার অবাক লাগে। তখনই জানতে পারি, আপনি কোথাও আছেন, এই চন্দনপুর-অন-সী-তেই। সম্ভাষণ করেছেন প্রিয় এস বলে। যাই হোক, এই চিঠিটা আপনার তন্দ্রাকে লেখা তৃতীয় চিঠির পরিপূরক। বাই দা বাই, সুমন্ত একটা সবে ধরানো সিগারেট নিবিয়ে ফেলে এসেছ কি তুমি?
সুমন্ত বলল, তাকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়েই আমি বেরিয়েছিলুম পানিগ্রাহীদার কাছে।
সবে ধরিয়ে দিয়েই বেরিয়েছিলে?
হ্যাঁ! ও সিগারেট খুব কম খেত। এই মানসিক অবস্থায় খেতে চাচ্ছিল না। আমি চলে আসার সময় ওকে বললুম–সিগারেট খাও, তাহলে ভয় করবে না। সিগারেটটা শেষ হবার আগেই আমি ফিরব। মোমবাতির আলো আছে–ভয় নেই। আর…বেডরুমে বিছানায় একটা ছোরা রেখেছিলুম। ছোরাটা সঙ্গে নিয়ে বেড়ানোর অসুবিধে ছিল–বেশ বড় ছোরা। তাছাড়া ছোরা নিয়ে বেড়ানোর কী দরকার, বুঝতে পারিনি। যাই হোক, ছোরাটা ওকে দিয়ে এসেছিলুম।
ছোরাটা বাংলোয় দেখতে পাইনি আমি।
আমরাও পাইনি স্যার। যখন তাকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখলুম, ছোরাটা খুঁজছিলুম তন্ন তন্ন করে। আমি তো জানতেই পারছিলুম, খুনী ওই ছোরাটাই মেরেছে তাকে।
রাইট। তুমি চলে যাওয়ার পর জঙ্গলের পথে কিংবা কোথাও গাড়ি দেখেছিলে কি?
না স্যার।.. বলে একটু ভেবে নিয়ে সুমন্ত ফের বলল, তবে পানিগ্রাহীদাকে নিয়ে যখন বাংলোয় যাই, তখন জঙ্গলের দিকে পাহাড়ের পশ্চিম পিঠে একটা আওয়াজ আমার কানে এসেছিল। গাড়ির আওয়াজ বলে মনে হচ্ছিল। পানিগ্রাহীদাকে বললুম– কথাটা কিন্তু উনি বললেন–মেঘ ডাকার শব্দ।
