এবার শর্মা মন্তব্য করলেন, না মিঃ পাণিগ্রাহী। এইসব রাত্রেই তাদের চমৎকার মওকা। আপনি কেন যে লোকাল থানায় মিঃ সেনাপতিকে কিছু বলে রাখেননি, সেটাই অবাক লাগছে আমার!
পানিগ্রাহী ফুঁসে উঠলেন, সেনাপতি! ও তো ভারতের লোক, মশাই! আমার সোর্স জানিয়েছিল…সেনাপতি-টেনাপতি সবাই সব জেনেও চুপ করে থাকবে।
শর্মা বললেন, কিন্তু আপনি এলাকার রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা মিঃ পানিগ্রাহী।
পানিগ্রাহী চটে উঠলেন।…ওঁদের ওই ল্যাক অফ ভিসনের জন্যেই তো আমরা আমলাতন্দ্রের বিরুদ্ধে চেঁচাই। আপনারা মশাই বাস্তব অবস্থা কিছুমাত্র টের পান না। স্বয়ং মিনিস্টার না লাগলে আপনাদের টনক নড়ে না। আমি কোন ছার! আমি কী করতে পারি লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের! যখন এম এল এ ছিলুম, তখন পারতুম। এখন এম এল এ নই স্রেফ নেতা। মিনিস্টাররাও একশোটা কথা বললে তবে একটা কথায় কান পাতেন। আমি তো মশাই যাত্রাদলের রাজা–ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার।
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, ফ্যাক্ট। তারপর কী হলো বলুন।
পানিগ্রাহী শান্ত হয়ে বললেন, আমি প্রথমে বাংলোয় যাওয়ার সিদ্ধান্ত করলুম। মাত্র গজ দশেক গেছি, দেখি, কে দৌড়ে আসছে। অন্ধকার ছিল–কিন্তু বিজলী চমকাচ্ছিল। সুমন্তকে চিনতে আমার ভুল হলো না। সুমন্তও আমাকে দেখতে পেয়েছিল। যাই হোক–ও আমাকে সাংঘাতিক খবর দিল। শার্কে বসে থাকার সময় কে ওদের মুখোশ পরে ছুরি নিয়ে তাড়া করে। দুজনে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমার ফার্মে ঢুকে পড়ে। বাংলোতে যায়। সেখানে তাকে একা রেখে সে আমাকে খবর দিতে আসছিল।
একা রেখে! এই কাণ্ডের পরও? শর্মা এই প্রশ্ন করলেন।
সুমন্ত বললে, হ্যাঁ–ওকে সঙ্গে আনিনি। কারণ বৃষ্টিতে ভিজে আর এইভাবে তাড়া খেয়ে তন্দ্রা প্রায় ভেঙ্গে পড়েছিল। তাছাড়া ওর দিকেই যেন ছোরাধারী লোকটার লক্ষ দেখেছিলুম বেশি। তন্দ্রা মেয়ে। আমার পক্ষে যা সম্ভব ওর পক্ষে তা নয়। তাই ওকে রেখে এসেছিলুম। বাংলোয় সে নিরাপদে থাকবে। ভিতর থেকে ভালোভাবে দরজা আটকাতে বলে আমি তবে বেরিয়ে এসেছিলুম।
পাণিগ্রাহী বললেন, সুমন্ত আমাকে খবর দিতেই আমি আরও উদ্বিগ্ন বোধ করলুম। আমার কাছে একটা লাইসেন্সড রিভলভার আছে। আমি আর সুমন্ত তক্ষুনি ফিরে গেলুম বাংলোয়।
কর্নেল বললেন, গিয়ে দেখলেন দরজা খোলা। আর বেডরুমে তন্দ্রা রক্তাক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে।
পানিগ্রাহী ব্যস্তভাবে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ–গিয়ে সেই ভয়ানক দৃশ্য দেখলুম। সুমন্তর এ ব্যাপারে মাথা খোলে সবসময়। সে আমাকে একটা চমৎকার পরামর্শ দিল। তা না করলে এই মার্ডারের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে পড়ুক বা না পড়ুক–পড়ার চান্স তো থাকেই, প্রচণ্ড স্ক্যাণ্ডাল রটে যাবে। আমার পলিটিক্যাল কেরিয়ার নষ্ট হবে। তখন ওর কথা মতো
মড়াবওয়া লোক আর একটা খাটিয়া যোগাড় করলেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করছি, কর্নেল।
সুমন্ত বলল, আমি বেরিয়ে প্রথমে গেলুম সমুদ্রের কাছে শ্মশানে। শ্মশান থেকে একটা মাচান নিয়ে এলুম। অনেক খাটিয়া বা মাচান ওখানে পড়ে থাকে দেখেছিলুম। এই মাচানটা টাটকা ছিল। সেটা বয়ে সোজা নাক বরাবর ফার্মের খোলা গেটে ঢুকে বাংলোয় আনলুম। আগে গেটটা খোলা রেখেছিলুম। তারপর মাচানে তন্দ্রার লাসটা চাপিয়ে ওপাশের বারান্দায় নিয়ে গেলুমতলায় পুরনো একটা ষেক দেওয়া হয়েছিল। রক্তগুলো ধুয়ে ফেলা উচিত ছিল। কিন্তু মোমবাতির আলোয় সেটা সহজ মনে হলো না। ভাবলুম, সকালে ধুয়ে ফেলব খন। হাসিরামকে সব জানাতে হবে। যাই হোক, লাশটা দুজনে বয়ে এনে বড়ো রাস্তার ধারে একটা বটতলায় রাখলুম। তখনও বৃষ্টি থামেনি। পানিগ্রাহীদাকে এখনে সবাই চেনে। উনি চলে গেলেন। আমি গেলুম ডোমপাড়ায়। গিয়ে বললুম– পাশের গ্রামের মড়া আমারই এক আত্মীয়া। বটতলায় বৃষ্টির মধ্যে আটকা পড়েছিলুম। মড়াবওয়া লোকগুলো সব মদদ খেয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করে মড়া ফেলে পালিয়েছে। আমি ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি। ওদের সাহায্য দরকার।…ওরা প্রথমে রাজি হলো না। সব তখন ঘুমের ঘোরে আর নেশায় টলছে তো! ওদের অনেক টাকা আর মদ খাওয়ানোর প্রস্তাবে রাজি হলো। চারজন লোক নিজেরা ঠিক করে দিল। তাদের নিয়ে পাশের খুঁড়িখানায় গেলুম। দেখি, তখনও সব মক্কেল রয়েছে। তিনটে বোতল কেনা হলো দিশী। ওরা সেখানে বসে খেল। তারপর আমার সঙ্গে বটতলায় এসে মড়া তুলল। অন্ধকার। বৃষ্টি পড়ছে। মাতাল হয়ে উঠেছে লোকগুলো। আমরা হরিধ্বনি দিতে দিতে এগোলুম।
কর্নেল বললেন, কিন্তু মড়া শেষ অব্দি শ্মশানে না নিয়ে মিঃ পানিগ্রাহীর ফার্মের জমিতে ফেললে কেন?
পানিগ্রাহী বললেন, ওটাই তো সুমন্তর অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি!
সুমন্ত বলল, শ্মশান থেকে মাচান লুকিয়ে আনা সোজা। কিন্তু মড়া নিয়ে যে যাব, শ্মশানের রেজিস্টারের চোখ এড়াবে না। ডেথ সার্টিফিকেট চাইবে। রক্তক্ত দেখতে পাবে, তাই
কর্নেল বললেন, একথা আগে ভাবোনি তোমরা।
না স্যার। তখন দুজনেরই মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন। অতটা তলিয়ে ভাবিইনি। অন্ধকার রাতে বৃষ্টির মধ্যে ঝোঁকের বশে চলেছিলুম।
তারপর?
ফার্মের গেটের কাছে গিয়ে ঠিক করলুম–অন্য উপায় ঠিক করা যাক। আফটার অল, তা আমার গার্লফ্রেণ্ড–গভীর ভালবাসা কিছু ছিল না, কিন্তু তাহলেও স্যার–আমার মরালিটি যেটুকু আছে, তাতে বাধল। পাণিগ্রাহীদার সামনেই বলছি–আমার সন্দেহ হলো, বা রে! একটি অসহায় মেয়ে ওঁর কাজে এসেই খুন হলো। আর উনি পুলিশকে জানাবার বা খুনীকে ধরিয়ে দেবার যেন নামই করলেন না! উপরন্তু লাশটা সামলাতে বলছে! আমার বিবেকে বাধল, স্যার! আমি ঠিক করলুম–এমন কিছু করা দরকার যাতে পানিগ্রাহীদা বাধ্য হয়ে তার মার্ডারের কথা পুলিশকে জানাবেন কিংবা নিজের সম্মানরক্ষার জন্য খুনীকে ধরতে নিজের প্রভাব খাটাবেন। কিন্তু কিছুই করছেন না। তাই রাগ হলো। ওঁকে তন্দ্রার মার্ডারের সঙ্গে আমি জড়াবো ঠিক করলুম। তাই লোকগুলোকে দাঁড় করালুম। বললুম– দেখ–এখন বৃষ্টির মধ্যে লাশ চিতেয় ওঠানো অসম্ভব। রেজিস্ট্রারবাবুও হয়তো আফিং খেয়ে ঘুমোচ্ছন। সেই ভোরবেলা ছাড়া কিছু করা যাবে না। বরং এক কাজ করা যাক। লাসটা কোথাও ফেলে দিই। এত বৃষ্টির মধ্যে কী করা যাবে তোমরাই বলো? এখানটায় ফেললে মিউনিসিপ্যালিটির মেথররা তুলে কোথায় ফেলে দেবে-সঙ্কার হবে না। তার চেয়ে এই ফার্মের জমিতে ফেললে কাজ হবে। এক হোমরা-চোমরা নেতার জমি। ভোটের জন্যে ওনারা সব করেন-কী বলো? মাতাল লোকগুলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ঠিক, ঠিক। পানিগ্রাহীবাবুর জমিতেই ফেলে যাই। নির্ঘাৎ সদগতি হবে লাসটার। না করে উপায় আছে? লোকে বলবে– ওই দেখ, সামান্য খরচা করে উনি মড়াটা পোড়াতে পারলেন না! উনি আবার গরীবের হয়ে কাজ করবেন?.বুঝতেই পারছেন স্যার, মাতাল সাদাসিধে মানুষ সব। তখন ওদের দিয়ে যা খুশি করানো যায়। আমরা গেট দিয়ে ঢুকে লাশটা কোণার দিকে ফেললুম।
