ম্যানেজার একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, মধ্যে কিছুক্ষণ ছিলুম না–স্যার। কখন গেছে, জানিনে। এসেছিল সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ। নিশ্চয় চলে গেছে।
ভিজিটরস বুকে রেকর্ড রাখা হয়েছে?
হ্যাঁ স্যার, দেখাচ্ছি।
থাক। চলে যাওয়ার সময়ের রেকর্ড নিশ্চয় রাখেননি?
রাখিনি স্যার–পরে মিঃ দত্তের কাছে জেনে নিয়ে রাখব ভেবেছিলুম।
ভেবেছিলেন কিন্তু … ঘড়ি দেখে শর্মা বললেন–এখন পৌনে বারো। এখনও তা জেনে নেননি। এটা দায়িত্বহীনতার পরিচয় কিন্তু। অমনভাবে আপনাকে বলা হল তখন!
বলে তিনি ম্যানেজারের কৈফিয়ত শোনার গরজ না দেখিয়ে হনহন করে গিয়ে সিঁড়িতে উঠলেন। কর্নেল তাকে অনুসরণ করলেন।
দরজায় কার্ড আটকানো ছিল : মিঃ সত্যচরণ দত্ত। দরজা খুলে দিলেন এক ভদ্রলোক–উজ্জ্বল গৌর রঙ। মাথায় টাক। পরনে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। বয়স পঞ্চাশ বাহান্ন। শক্ত সমর্থ গড়ন। মুখে যুবকের দীপ্তি রয়েছে। শর্মা পরিচয় করিয়ে দিলেন।… মিঃ পানিগ্রাহী।… প্রখ্যাত প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।
কর্নেল ঘরের কোণের দিকের সোফায় তরুণটিকে লক্ষ্য করে বললেন, আশা করি–উনিই শ্ৰীমতী এস রায়?
তরুণটি কাঁচুমাচু মুখে হাসল। পাণিগ্রাহী অবাক হয়ে হাঁ করে তাকালেন কর্নেলের দিকে। বুদ্ধিমান শ্ৰী শৰ্মা হো-হো করে হেসে উঠলেন।
কর্নেল তরুণটির পাশে গিয়ে বসে বললেন, সকালেই চুল কাটা হয়েছে দেখছি! মাই ইয়ং ফ্রেণ্ড, অনেক কথা আছে। আপাতত আমি মিঃ পাণিগ্রাহীর সঙ্গে আলাপটা সেরে নিই। বাই দা বাই, এই বেলুন দুট নিশ্চয় আমার তরুণ বন্ধুটির সুপরিচিত?
ঘরে হাসির শব্দ হলো দ্বিগুণ। পানিগ্রাহী বললেন, সুমন্ত, কর্নেল সরকারের নাম তুমি জানো না সম্ভবত। তার কাছে কিছু চাপা থাকে না। যাক গে, কর্নেল আমাদের অসীম সৌভাগ্য যে এমন সময়ে আপনাকে আমরা পেয়ে গেছি। বেচারা তন্দ্রার জন্যে কিছু করতে পারার সাহস এবার এসেছে আমার মধ্যে।
কর্নেল পানিগ্রাহীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি পি. এর জন্যে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন? কোন কোন কাগজে?
কলকাতার তিনটে ইংরেজি কাগজে।
দেখুন তো তন্দ্রাকে লেখা এই তিনটে ইনল্যাণ্ড চিঠি আপনার নাকি? বলে কর্নেল চিঠি তিনটে পানিগ্রাহীর হাতে দিলেন।
পানিগ্রাহী দ্রুত চোখ বুলিয়েই বললেন, হ্যাঁ–আমারই।
এই তিন নম্বর চিঠিটার তারিখ হচ্ছে ৮ জুলাই। যে নির্দেশ তাকে দিতে চেয়েছিলেন, তা এতে রয়েছে। আপনি সী ভিউ হোটলের মালিক ভারতবাবুর গতিবিধির ওপর চোখ রাখতে বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন, ভারতবাবুর মহিলাদের প্রতি দুর্বলতা আছে। কোন স্ত্রীলোকের সঙ্গে কীভাবে মিশনে জানাতে হবে। আচ্ছা মিঃ পানিগ্রাহী, তন্দ্রা যে এ ধরনের কাজে রাজী হবে এবং অছাড়াও ভারতবাবুর মতো ব্যবসায়ী মানুষকে পটানোর ব্যাপারে তার ক্ষমতা আছে তা আপনি কীভাবে জানলেন?
পাণিগ্রাহী একটু অপ্রস্তুত হলেন যেন।…না–মানে ওর ফোটোই ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বলে দিয়েছিল। আমার মহিলাদের সম্পর্কে… একটু হাসলেন পানিগ্রাহী— আধুনিক মহিলাদের ব্যাপারে আমার কিছু অভিজ্ঞতা আছে, কর্নেল!
ফটো দেখে কী বৈশিষ্ট্য টের পেয়েছিলেন?
সেক্সি গড়ন। বিশেষ করে চোখ দুটো। ওই চোখ আমি চিনি।
আরও অনেক ছবি আর দরখাস্ত আপনি পেয়েছিলেন কি?
নিশ্চয়। প্রচুর প্রচুর! আপনি দেখতে চাইলে…
থাক। তাদের মধ্যে তাকেই আপনি বেছে নিলেন?
দ্যাটস রাইট।…বলে পানিগ্রাহী একটু ইতস্তত করে ফের বললেন, থাক,
লুকোব না। এই সুমন্তর সুপারিশেই ওকে আমি নিই।
কর্নেল তার দিকে স্থিরদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, কিন্তু মিঃ পানিগ্রাহী, ভারতবাবুর কালো টাকা, নিষিদ্ধ ড্রাগের কারবার ইত্যাদি কুকর্মের ব্যাপারে নজর রাখার জন্য উপযুক্ত সরকারী কর্তৃপক্ষ রয়েছেন। আপনি তাদের জানালেই তো সেকাজ তারা সরকারী খরচ আর উৎসাহ-উদ্যমে চালাতে পারতেন। বরং আরও ভাল পারতেন তাদের সব বিশেষজ্ঞ আছেন। তা না করে আপনি নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে ব্যক্তিগত উদ্যমে সেকাজে কেন নামতে গেলেন?
পানিগ্রাহী ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। হন্তদন্ত বললেন, নামব না কী বলছেন কর্নেল? আপনি জানেন না, এর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক কেরিয়ার আর অ্যামবিশান জড়িয়ে আছে! গত ইলেকশানে ভারতবাবু আমার বিরোধীদলের প্রতিদ্বন্দ্বীকে জেতাবার জন্যে লাখ টাকা খরচ করেছিল। সে ওদের সমর্থক। ওদের পার্টির ফাণ্ডে সে নিয়মিত মোটা টাকা দেয়। ওদের একটা জীপও দান করেছে সে। এ এলাকায় আমার নামে যত কুৎসা রটানো হয়েছে, তার মূল ওই লোকটাই–তা জানেন?
তাই বুঝি?
নিশ্চয়। আর দেখুন, মিঃ শর্মার সামনেই বলছি স্থানীয় পুলিশ বলুন, এনফোর্সমেন্ট বলুন, কাস্টমস বলুন–আমার জানা হয়ে গেছে! সব ওই ভারতের কাছে টিকি বাঁধা রেখেছে। আপনার তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা কী করবে, আমার ভালই জানা আছে। আর সেজন্যেই তো খোদ দিল্লি থেকে একেবারে সি. বি. আই. এর বড়কর্তাকে আসার জন্যে ট্রাঙ্ককল করেছিলুম। আপনার সামনেই উনি বসে আছেন। জিগ্যেস করুন ওঁকে। এর জন্যে হোম মিনিস্টারকে ধরতে হয়েছিল পর্যন্ত।..বলে উত্তেজিত পানিগ্রাহী একটু দম নিলেন। ফের বললেন, এর আগে বিস্তর চেষ্টা করেছি সরকারের লোকজনকে দিয়ে। তাদের এই এক কথা–ভারতবাবুর ব্যাপারে সন্দেহজনক কিছু নেই। বুঝুন তাহলে। অথচ আমি জানি–ভালভাবেই জানি যে লোকটা নিয়মিত ড্রাগের চোরা কারবার চালায়। হোটেল থাকায় সুবিধে হয়েছে। বিদেশী গলার হোটেলে এসে ওঠে। কোনও সন্দেহ করার উপায় নেই। লেনদেন দিব্যি চলে। আসে বিদেশী ড্রাগ এল. এস. ডি. যায় গাঁজা আর কোকেন। আসে ভেনডিটা ক্যাপসুল, যায়। আফিং। আসে…
