শর্মা হাসলেন।–না, মিঃ আলি। অন্য ব্যাপার। পরে জানতে পারবেন।
কর্নেল শর্মার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, মিঃ শর্মা, এবার প্লীজ– আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিলে অনেক জটিলতা সেরে যায়।
শর্মা হেসে বললেন, অবশ্যই। বলুন, কী জানতে চান?
প্রথম প্রশ্ন : মিঃ মদনমোহন পানিগ্রাহী এখন কোথায়?
গভমেন্ট গেস্ট হাউসে।
উনি কবে এসেছেন?
একুশে জুলাই রাত্রে।
আপনি কবে এসেছে?
আজ সকালে।
আপনাকে উনি ডেকেছিলেন নিশ্চয়?
হ্যাঁ। গতকাল দুপুরে ট্রাঙ্ক করেন দিল্লিতে। প্লেনে কলকাতা চলে আসি। আবহাওয়া খারাপ থাকায় প্লেন দমদম পৌঁছতে তিনঘণ্টা দেরি করে। তারপর রাত বারোটায় একটা সরকারী জীপ নিয়ে একা রওনা হই। পৌঁছেছি আজ ঠিক সাতটায়। পৌঁছে পুলিশ ইন্সপেক্টর আচার্যকে ফোন করেছিলুম। তাকে গেস্ট হাউসে তক্ষুনি চলে আসতে বলেছিলুম।
পাণিগ্রাহী আপনার জন্যে অপেক্ষা করছিলেন?
হ্যাঁ। দুঃখের সঙ্গে জানালেন–সব প্ল্যান ভেস্তে গেছে। এমনকি উনিই উল্টে বিপদে পড়েছেন।
ওয়েট। কর্নেল হাত তুললেন।পানিগ্রাহী প্রকাশ্যে আসছেন না কেন?
শর্মা বললেন, আসলে হয়েছে কী জানেন? বিরোধী রাজনৈতিক দল তো ওঁর বিরুদ্ধে নানা স্ক্যাণ্ডাল বরাবর রটাচ্ছে। ওঁর ভয় হচ্ছে, এটা নিয়ে আবার কাগজে হই-চই শুরু হলে ওঁর কেরিয়ারটি খতম হয়ে যাবে। তাই উনি বলছিলেন, খুনের মীমাংসা হয়ে গেলেই বরং ফার্মে আসবেন। তার মানে প্রকাশ্য হবেন।
আমি এখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই, মিঃ শর্মা। খুবই জরুরী।
চলুন–আপত্তি নেই। তবে
বুঝেছি। আমরা গোপনেই যাব। ধরুন, গেস্ট হাউসে আপনার ঘরেই চলেছি।
দ্যাটস রাইট। মিঃ আলি, প্লীজ ইট ইজ টপ সিক্রেট।
আলি বললেন, ইয়েস স্যার।
দুজনে বেরিয়ে এসে নিচে নামলেন। ভারতবাবু সবিনয়ে এগিয়ে দিলেন লন অব্দি। হাঁটতে হাঁটতে কর্নেল বললেন, মিঃ শৰ্মা, যাবার পথে একবার শার্কের সামনে দিয়ে ঘুরে যাব।
তাই চলুন। বরং ফার্মের ওখানে খবর পাঠালে পুলিশ ড্রাইভার দিয়ে আমার জীপটা পাঠিয়ে দিত।
থাক। আমরা পায়ে হেঁটেই যাই। মেঘ করেছে–বোদ কমে যাচ্ছে। বলে কর্নেল একবার আকাশ দেখে নিলেন। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে।
দ্য শার্ক-এর সামনে এসে কর্নেল দাঁড়ালেন। ভিতরে ঢুকলেন না। সামনের লন ও জমিটা খুঁটিয়ে দেখে পা বাড়াচ্ছেন, সেই সময় নব বেরিয়ে এল ভিতর থেকে। কর্নেল বললেন, কতক্ষণ এসেছ নব?
এইমাত্র, স্যার। আসুন, ভেতরে আসুন।
না। পরে আসবখন। শোনো নব, এসেছ ভালই হলো। তুমি তো খুব কড়া নজরের মানুষ, এস–আমরা আশপাশটা খুঁজে দেখি।
কী খুঁজতে হবে স্যার? নব হাসল।…আবার কোনও খেলনা-টেলনা নাকি?
কর্ণেল গম্ভীর হয়ে বললেন, একজ্যাক্টলি। ঠিক তাই।
মুখোশটা স্যার?
হ্যাঁ–মুখোশ তো বটেই। আর–আর ইয়ে–ইয়ে-ধরো বেলুন।
বেলুন!
হ্যাঁ। একরকম বেলুন নিয়ে বাচ্চারা খেলে না? জল ভরা থাকে!
ওই তো স্যার, একটা পড়ে আছে।..বলে নব দৌড়ে গিয়ে রেস্তোরাঁর পিছন দিক থেকে একটা জলভরা বেলুন কুড়িয়ে আনল।
কর্নেল সেটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, জলটা পড়ে যায়নি। তবে সুতোটা ছিঁড়ে গেছে। নব, আরেকটা ঠিক এমনি বেলুন আমাদের দরকার।
নব লাফিয়ে উঠল।…স্যার, স্যার! ওইরকম একটা বেলুন পড়ে থাকতে দেখেছি। দাঁড়ান, এক মিনিট! আনছি। তখন দৌড়ে যেতে গিয়ে পায়ের চাপে পট করে ফেটে গিয়েছিল–ওই যে রাস্তার ওপর।
শর্মা অবাক হয়ে বললেন, বেলুনে কী আছে কর্নেল?
মিঃ পাণিগ্রাহী আপনাকে তাহলে সবটা বলেননি?
না তো–বেলুন সংক্রান্ত কোনও কথা নাঃ! ষ্ট্রেঞ্জ!
পানিগ্রাহীর সঙ্গে আজ সকালের দিকে কেউ দেখা করতে যায়নি?
না, না। তিনি তো গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। এক্কেবারে আউট অফ সারকুলেশন যাকে বলে। কেউ জানেও না, তিনি এখানে আছে–শুধু ম্যানেজার ছাড়া।
ম্যানেজার বিশ্বাসী?
নিশ্চয়। সে আমাদের ব্যুরোর লোক। ডেপুটেড স্টাফ।
তাহলে অনেকদিন যাবৎ আপনারা চন্দনপুর অন-সীর ওপর নজর রেখেছেন?
নিশ্চয়?
সেই সময় ফাটা চুপসে যাওয়া ধূসররঙের আর একটা বেলুন নিয়ে নব দৌড়ে এল।…ফেটে গেছে বলে অসুবিধা হবে না তো স্যার?
কর্নেল সেটা নিয়ে বললেন, না। পেয়েছি, এই যথেষ্ট। আচ্ছা, চলি নব। মুখোশটা না পেলেও আমার চলবে–ওজন্যে তুমি মিছে পরিশ্রম করো না। চলুন, মিঃ শর্মা।
দুজনে প্রায় আধ মাইল হেঁটে সরকারী অতিথিভবনে পৌঁছলেন। সারা পথ। দুজনে যা কথা হলো, তা এই কেস সংক্রান্ত নয়। আবহাওয়া, পঞ্চবার্ষিক যোজনা, আয়কর আদায় সমস্যা–এইসব। কর্নেল টের পাচ্ছিলেন–যাই করুন, তিনি আসলে একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরের ভূমিকা নিয়েছেন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর সরকারী অফিসার শ্রী শর্মা খুব সহজে তাকে কোনও সরকারী গোপনতথ্য জানাবেন না এবং সেটা বিধিবহির্ভূতও বটে।
নীচের লাউঞ্জে ম্যানেজার উঠে দাঁড়িয়ে শর্মাকে স্বাগত জানালেন। শর্মা চাপা গলায় বললেন, কোনও ভিজিটার এসেছিল আমার নাম করে?
না, স্যার।
মিঃ সত্যচরণ দত্তের কাছে?
একটি ছেলে এসেছিল স্যার। ফোনে জানাতেই মিঃ দত্ত. পাঠিয়ে দিতে বললেন।
সে কী! কীরকম ছেলে?
বছর একুশ-বাইশ বয়স হবে–ফরসা।
কর্নেল বললেন, মাথায় লম্বা চুল ছিল?
ম্যানেজার অবাক হয়ে বলল, না তো! ছোট-ছোট চুল।
কর্নেল গম্ভীর হয়ে গেলেন। শর্মা বললেন, যাক্ গে–সে মিঃ দত্তের ব্যক্তিগত ব্যাপার। ছেলেটি কখন গেল? কতক্ষণ ছিল?
