কর্নেল বললেন, হ্যামড়া। কাল রাত নটার পর মনে রাখবেন রাত নটার পর থেকে বৃষ্টি না থামা অব্দি অর্থাৎ রাত দুটো পর্যন্ত কোনও মড়া কারা রয়েছে, কার মড়া ইত্যাদি ডিটেলস খবর খুব জরুরী।…তিনি এবার শান্তভাবে চুরুট ধরালেন। ফের বললেন, এবার আমাকে সেই ছেঁড়া কাগজগুলো দিন।
.
০৮.
পানিগ্রাহী ও সুমন্তের বৃত্তান্ত
এখন বেলা এগারোটা। কর্নেল, কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর ডঃ শর্মা এবং এ.এস. আই. বরকত আলি একসঙ্গে সী-ভিউ হোটেলের লাউঞ্জে পৌঁছেই ঘড়ির দিকে তাকালেন। দেয়ালে একটা বিরাট গোল ঘড়ি টকটক আওয়াজ দিচ্ছিল। আওয়াজটা আকৃষ্ট না করে পারে না।
ভারতবাবু কথামতো আগেই চলে এসেছিলেন। অভ্যর্থনা জানিয়ে বললেন, ঘড়িটার বয়স স্যার তিন পুরুষ। আমার কর্তাবাবার আমলের বিলিতী জিনিস। আজকালকার পরিবেশে মানায় না।
তিন জনে সপ্রশংসদৃষ্টে ঘড়িটা দেখে নিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোলেন। চারতলা বিরাট হোটেল। দোতলায় তিনটে সিঙ্গল, তিনটে ডবল সুইট রয়েছে। প্রত্যেকটাই এয়ার কণ্ডিশনড। চমৎকার আধুনিক ব্যবস্থা। অনেকটা করে কাচের দেয়াল বিশাল দামী সব পর্দা ঝুলছে। চওড়া লাউঞ্জ রয়েছে ওপরে। সামনেও কাচের গোল দেয়াল। সেখানে বসলে মনে হয়, সমুদ্রে ভেসে আছে বাড়িটা। গাছের টব আছে অগুনতি। ভারতবাবু দেখতে সেকেলে টাইপ, কিন্তু একেলে রুচি তার হোটেলের আষ্টেপৃষ্ঠে ছাপ ফেলেছে।
ওপর-নিচে দুজন করে পুলিশ প্রহরী রয়েছে। আলির ইশারায় সুইট নম্বর সি খুলে দিল একজন সেপাই। এয়ার কণ্ডিশনড চালু করলেন ভারতবাবু। বন্ধ ছিল আজ সকাল থেকে। মিছিমিছি পয়সা খরচ করার পক্ষপাতী তিনি নন। তারপর বললেন, আমার থাকার কি দরকার হবে স্যার?
কর্নেল বললেন, না–আপনি আপনার জায়গার গিয়ে বসুন ভারতবাবু। তেমন দরকার পড়লে খবর দেব।
ভারতবাবু চলে গেলেন। সিঙ্গল সুইট হলেও দুজনের শোবার ব্যবস্থা রয়েছে। একটা খাট ছাড়াও সোফা-কাম-বেড রয়েছে একপাশের দেয়ালে। খাটের বিছানা খুব সুন্দরভাবে গোছানো। কর্নেল বিছানাটা সাবধানে পরীক্ষা করলেন। বালিশের নিচে একটা লেডিজ রুমাল পাওয়া গেল, কোণে একটা গিট। অকারণ গিট–ভিতরে কিছু নেই। আর একটা কোণা পরীক্ষা করে কর্নেল বললেন, তার একটা অভ্যাসের পরিচয় পাচ্ছি। রুমালে গিট দেওয়া আর কোণা চিবুনোর অভ্যেস। সচরাচর এই অভ্যাস সরলতার প্রতীক। গোবেচারা ধরনের, ভীতু, লাজুক মেয়েদের এ অভ্যেস লক্ষ্য করা যায়।
শর্মা বললেন, ঠিক, ঠিক।
শার্কের টেবিলে বসে সে কাগজ ছিঁড়ছিল–এও ওই অভ্যাসের অন্তর্গত কিন্তু। অনেক সময় এই স্বভাবের লোকেরা নিজের অজান্তে দামী কাগজপত্র, এমনকি নোটও ছিঁড়ে ফেলে। আমি মনস্তত্ত্ব নিয়ে সামান্য নাড়াঘাটা করেছি। বলতে পারি, এই টাইপের লোকেদের জীবনে একটা চাপা কোনও দুঃখবোধ থাকে–যা নানা কারণের জন্যে হতে পারে। বাল্যে অবহেলা, কিংবা মানসিক প্রচণ্ড আঘাত পাওয়া–কোনও তীব্র সাধ না মেটা ইত্যাদি। আমার ধারণা তন্দ্রার এরকম কিছু ছিল।
বিছানায় আর কিছু পাওয়া গেল না। ওয়াড্রোব খুলে কিছু কাপড় চোপড় পাওয়া গেল। কর্নেল বাথে ঢুকলেন। বাথ টয়লেট প্রিভি একত্রে। তোয়ালে সাবান টুথব্রাশ যা যা লাগে, সবই রয়েছে। অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেলেন না কর্নেল।
ফিরে এসে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ালগুলো তন্নতন্ন খুঁজলেন। একটা চকলেটের প্যাকেট পাওয়া গেল। কিছু প্রসাধনী। আর কিছু না।
এবার স্যুটকেস ও গোটানো বেডিংটা পরীক্ষার পালা। বেডিংটা এককোণে হোল্ডলে গোটানো রয়েছে। ভোলা হলো। তন্দ্রা একটু বিলাসী মেয়ে, তার পরিচয় সবখানে রয়েছে। কিন্তু সূত্র বলতে যা বোঝায়, মিলল না।
স্যুটকেসটা আগেই আলি তালা ভেঙে দেখেছিলেন। এখনও দেখা হলো খুলে। একটা ছোট্ট ফাইলে তার শিক্ষাদীক্ষার সার্টিফিকেট পাওয়া গেল। কলকাতার একটা কলেজের ছাত্রী ছিল সে-দুবছর আগে বি.এ. পাশ করেছে। কর্নেল বললেন, এই দুটো বছর তন্দ্রা চাকরি করে থাকলে অন্তত এসব ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট থাকত–সে সঙ্গে আনত নিশ্চয়। তা যখন নেই, তখন.. বলে হঠাৎ থামলেন তিনি। স্যুটকেসে কয়েকটা ভাঁজকরা জামা কাপড়ের নিচে তলার দিকে হাত চালিয়ে একটা নীল ইনল্যাণ্ড লেটার বের করলেন।
আলি শশব্যস্তে বললেন, আমি খুব খুঁটিয়ে কিছু দেখিনি স্যার। চোখ এড়িয়ে গেছল, দেখছি। কী ওটা?
কর্নেল বললেন, তাকে লেখা পানিগ্রাহীর তৃতীয় চিঠি। এটাই আমি এতক্ষণ খুঁজছিলুম।
তিনি চিঠিটা একান্তে নিয়ে গিয়ে খুললেন–কিছু মনে করবেন না আপনারা আগে আমি দেখে নিই।
আলির মুখটা গম্ভীর দেখাল। শর্মা মুচকি হাসলেন মাত্র।
চিঠিটা পড়া হলে কর্নেল বললেন, মিঃ শর্মা, সকাল থেকে আমি মূল যে জিনিসটা হাতড়াচ্ছিলুম-খুনের মোটিভ সম্ভবত পেয়ে গেছি। মোটিভটাই ভাইটাল ব্যাপার যে-কোনও খুনের কেসে। ডাক্তাররা যেমন বলেন, রোগ ধরা পড়াটাই চিকিৎসার অর্ধেক তেমনি মোটিভ ধরা পড়লেই খুনীকে ধরা সহজ হয়ে ওঠে। যাই হোক, মিঃ শর্মা বরাবর মুখ বুজে থাকলেও চন্দরপুর-অন-সীতে যে অকারণে আসেননি–তা আমার মাথায় ছিল, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে–মোটামুটি জানতে পেরেছি।
আলি চাপা গলায় সরল মুখে শর্মাকে প্রশ্ন করলেন ব্ল্যাকমানি কেস, স্যার?
