নব বলল, কেমন সন্দেহ লাগছিল–ছোরাটা কেমন যেন…
হ্যাঁ। তাই শেষ অব্দি নব আর ও ব্যাপারে উৎসাহী হয়নি। আমি মার্ডার কেসে দুটো দিকে সচরাচর লক্ষ রাখি। তাই থেকে সিদ্ধান্তে আসি। প্রথমটা হচ্ছে খুবই ইমপরট্যান্ট : ব্যক্তিগত মানসিক প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয়টা হচ্ছে : ফ্যাক্টস। তথ্য বা বাস্তব ঘটনা। নবকে আমরা তার ওই নিষ্ক্রিয়তার জন্য আইনত কিংবা বিবেকের দিক থেকে খুব একটা দায়ী করতে পারিনে। এই সমুদ্রতীরে আজকাল যুবক-যুবতীরা প্রচুর ফার্সের অবতারণা করেন। প্রায়ই বিকেলে আমি দেখেছি, আবহাওয়া ভাল থাকলে অনেকে ছদ্মবেশের খেলা–যাকে বলে অ্যাজ ইউ লাইক গেম, খেলে থাকেন।
নব বলল, অনেকটা রাতে শুতে যাবার সময় আমি একবার ভেবেছিলুম স্যার, ওটা হয়তো ওনাদের সেই তামাশাবাজি। প্রায় দেখি, খেলনার পিস্তল নিয়ে ওনারা…।
ঠিক বলেছ, নব। তামাশাবাজি! কিন্তু আমাদের পক্ষে গুরুতর ব্যাপার হচ্ছে, সেই তামাশাবাজির পরবর্তী ঘটনা–যা এই জমিতে দেখা গেল। এখন আমাদের ভাবতে হবে, সেই নিছক তামাশাবাজির সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনও যোগসূত্র আছে কি না।
আচার্য বললেন, আমার ধারণা, খুবই আছে। মেয়ে দুটিকে ওইভাবে বাইরে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল খুনীর। নিয়ে গিয়ে খুন করেছে।
শর্মা বললেন, আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা তা নয়। ওটা যে তামাশাবাজি, তা আমরা এখন জানলুম। প্রমাণ পেলুম। কিন্তু আসলে খুনীর ওটা একটা শো। খুন যে মুখোশধারীই করেছে, এটা দেখানো। পুলিশকে ভুল পথে চালানো তার উদ্দেশ্য ছিল।
কর্নেল বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন, মিঃ শর্মা। ওই তামাশাবাজি ঘটে যাবার পরে–আমি প্রমাণ যা পেয়েছি, তন্দ্রা আর তার সঙ্গী পানিগ্রাহীসায়েবের বাংলোয় যায়। নিশ্চিন্তে সিগারেট খায় দুজনে। ওখানেই বেডরুমে তাকে খুন করা হয়। তারপর এই জমিতে তার লাশ ফেলে যায় খুনী। কোন পথে লাশ এনেছিল, এখনও প্রমাণ পাইনি–যদিও সোজা বাংলো থেকে এই প্রাইভেট রাস্তা দিয়ে কিংবা গোলাপক্ষেত পেরিয়ে আসা তার পক্ষে সহজ ও স্বাভাবিক ছিল।
সেনাপতি বললেন, গোলাপক্ষেতে কোনও পায়ের দাগ পাইনি স্যার।
রাস্তাতেও পাইনি।
গোলাপক্ষেতে রক্তের কোনও চিহ্নও পাওয়া যায়নি।
রাস্তাতেও না। তাহলে লাশ কোন পথে এল?
সদর গেট দিয়ে আসতে পারে। কিন্তু গেট তো বন্ধ ছিল। ভোমরলাল!
ভোমরলাল এগিয়ে এল..বলুন স্যার!
সেনাপতি বললেন, সকালে আজ কখন গেট খুলেছ?
আপনাদের আসার একটু আগে।
তালা বন্ধ ছিল রাত্রে?
হ্যাঁ, স্যার।
অমনি গোপালকিশোর লাফিয়ে এল। ভোমরলাল, মিথ্যে বলো না। আমি লাশটা দেখে সদর গেট খুলেই দৌড়ে গেছি। তখন গেটের তালা খোলা ছিল ঝুলছিল কড়ায়। তুমি এখন ঢাকছ। চাকরি যাবার ভয়ে তো? ও আমি বুঝেছি।
ভোমরলাল ঘাবড়ে গেল। ঘাড় চুলকোতে লাগল।
গোপালকিশোর বলল, ভোমরলালের এ অভ্যাস আছে স্যার। ও সন্ধ্যে থেকে নেশা চড়ায়। তারপর নেশার ঘোরে রাত্রে গেটে তালা দিতে ভুলে যায়। এজন্যে সায়েব কতবার ওকে বকেছেন। গাঁজার কল্কেয় টান দিয়ে ও খাটিয়ায় গিয়ে মড়ার মতো পড়ে থাকে। তার ওপর কাল বৃষ্টি হচ্ছিল প্রচণ্ড। বেড়াল স্যারও একটা বেড়াল! জলকে বেজায় ডরায়।
সবাই হেসে উঠল। ভোমরলাল কঁচুমাচু মুখে বসে পড়ল একপাশে।;
সেই সময় কর্নেল এগিয়ে গেলেন ভিড়ের দিকে। তারপর তার অভ্যাস মতো একটু কেশে বললেন, আপনারা আশা করি সবাই স্থানীয় বাসিন্দা?
ভিড় থেকে একবাক্যে সাড়া এল।
আপনারা কেউ বলতে পারেন, গত রাত্রেধরুন, রাত নটার পরে, আগে নয় কিন্তু কেউ হরিধ্বনি শুনেছেন? ফার্মের মালী হাসিরাম আমাকে বলেছে, কাল অনেকটা রাত্রে সে কোথাও মড়া নিয়ে যাওয়ার হরিধ্বনি শুনেছে। কেউ আপনাদের মধ্যে
একজন মধ্যবয়সী সাধারণ মানুষ এগিয়ে এল ভিড় ঠেলে। বলল, হ্যাঁ– স্যার। বৃষ্টি তখনও হচ্ছিল। আমার স্টেশনারী দোকানের ঝপ বন্ধ করতে গিয়ে দেখলুম, ভিজতে ভিজতে কারা মড়া নিয়ে যাচ্ছে। হরিধ্বনিও দিচ্ছে। তখন রাত এগারোটা প্রায়। কলকাতায় মাল আনতে তোক পাঠাবার কথা ছিল আজ সকালে। তাই স্টক মিলিয়ে লিস্ট করছিলুম।
আপনার নাম?
আজ্ঞে, হরিহর মহাপাত্র। সোনালি স্টোর্স দেখেননি স্যার? অবজারভেটরির পাশেই। বাজারে জায়গা পাইনি–তাই একটেরে দোকান করেছি।
মড়া যারা বইছিল, তাদের চেহারা কীরকম?
অতটা লক্ষ করিনি। আবছা দেখেছিলুম। সঠিক বর্ণনা দিতে পারব না স্যার।
চারজন ছিল?
চারজন? হুঁ–তাই তো থাকে স্যার। না–না, পাঁচজন–পাঁচজন ছিল।
খাটিয়া ছিল নিশ্চয়?
খাটিয়া–মানে খাট-ফাট ছিল না–সেটা দেখেছি। দুটো বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা মাচা মতো ছিল যেন।
ভেবে বলুন।
হ্যাঁ-স্যার। ভেবেই বলছি। বৃষ্টির মধ্যে তো–আবছা হলেও রাস্তার আলো ছিল। এক পলক দেখেই নিজের কাজে ব্যস্ত হলুম স্যার। রাত্রিদিন তো কত মরছে নিয়ে যাচ্ছে। দূরের সব গ্রাম থেকেও লোকেরা এপথে মড়া নিয়ে সমুদ্রের ধারে শ্মশানে আসে। কত দেখছি অ্যাদ্দিন ধরে! হরিহরবাবু নিরাসক্ত দার্শনিক ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেন।
মিঃ সেনাপতি, এই ব্যাপারটা আপনি একটু খোঁজ নিন। গত রাত্রে যে মড়াটা এসেছিল, তা কোথা থেকে। শ্মশানেও লোক পাঠান। কারা বয়েছিল, তাও জানুন।
সেনাপতি অবাক হয়ে বললেন–মড়া! আচার্য আর শর্মা হেসে উঠলেন।
