একুশ তারিখে ওরা রাতে কটায় হোটেলে ফিরেছিল?
রাত দশটা নাগাদ।
কোনও বোর্ডার রাতে না ফিরলে আপনারা কী করেন?
থানায় জানিয়ে দিই, স্যার।
কখন জানান?
সেটা স্যার অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তবে–ভভারের দিকে থানায় খবর দেওয়া আমাদের রীতি। আসলে হয় কি জানেন? আকাশের অবস্থা ভাল থাকলে অনেকে সী বিচেই রাত কাটান। স্যার, বুঝতেই পারছেন, যা যুগ পড়েছে। সারারাত ড্রিঙ্ক করে তখন যে যেখানে পায়, শুয়ে পড়ে। ভোরবেলা বিচে গেলে আপনি দেখবেন–
তা দেখেছি বটে।
এমনকি মেয়েরাও স্যার–মেয়েরাও! রাত্রিবেলা আবহাওয়া ভাল থাকলে সী বিচে খুব অশ্লীল সব ব্যাপার ঘটতে থাকে আজকাল। ক্রমশ বাড়ছে এটা।
সেনাপতি বললেন, নানা, অতটা বাড়িয়ে বলবেন না মশাই। আমাদের লোক রোঁদে ঘোরে। গত বছরকার সেই রেপ কেসটার পর রাত্রে সী বিচে কড়া নজর রাখা হয়। তাছাড়া, আলো রয়েছে। কী সব যা-তা বলছেন?
ভারতবাবু ধমক খেয়ে ঘাবড়ে গেলেন–তা হয় স্যার–তবে কি না আজকাল যা যুগ পড়েছে। আজকাল ছেলে-মেয়ে বুড়োবুড়ি আইন-টাইন মানলে তো? সরকার তো নিজের ঘর সামলাতেই ব্যস্ত।
কর্নেল বললেন, তাহলে সেরকম কিছু ভেবেই তন্দ্রার ব্যাপারে থানায় জানাননি, বলতে চান?
হ্যাঁ, স্যার। এসব আকছার ঘটে কি না।
মিঃ আলি, তন্দ্রার জিনিসপত্র সার্চ করেছে?
আলি বললেন, করেছি স্যার। তেমন সন্দেহজনক কিছু পাইনি। মানে–এই কেসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেমন কিছু। শুধু এই চিঠি দুটোই যা পেয়েছি।
তন্দ্রার শিক্ষা-দীক্ষার সার্টিফিকেট?
আছে স্যার। বি এ সারটি…।
আর কোনও চিঠিপত্র?
কয়েকটা আছে ওর স্যুটকেসে। খুব পুরনো। মনে হলো বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজনের লেখা সব।
একটু পরে আমাকে একবার তার ঘরে নিয়ে যাবেন, মিঃ আলি।
নিশ্চয়, স্যার?
ভারতবাবুকে নিয়ে গিয়ে আপাতত লাশটা দেখান। দ্যাটস ইওর রুটিন জব।বলে কর্নেল সেনাপতির দিকে মৃদু হেসে কটাক্ষ করলেন।
সেনাপতি বললেন, ইয়েস মিঃ আলি। ভারতবাবু, যান দেখে আসুন।
ওঁরা চলে গেলেন লাশটার দিকে। কর্নেল ঘড়ি দেখলেন, নটা পনের। তারপর আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ পরিষ্কার। শুধু পাখিদের আনাগোনা আছে। সাত মাইল দূরে একটা বার্ড স্যাংচুয়ারি রয়েছে, তাই এত পাখির আনাগোনা। বাঁহনোকুলারটা আনলে ভাল হতো। কর্নেল আকাশ দেখতে থাকলেন।…
একটু পরে ভারতবাবুরা ফিরলেন জমি থেকে। ভারতবাবুর মুখটা কালো হয়ে গেছে এবার। প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। হাঁ, স্যার, তন্দ্রা ভাদুড়ী। উঃ ভগবান! অমন জলজ্যান্ত মেয়েটা–এ এক অসম্ভব দৃশ্য স্যার! এর বিহিত হওয়া দরকার। দেশে আইন-কানুন থাকতে এসব আর চলতে দেওয়া যায় না।
সেই সময় গেটের দিকে চ্যাঁচামেচি শোনা গেল। তারপর দেখা গেল নব ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে আসছে। আর তার পিছনে একদল লোক তাড়া করেছে। তাদের মধ্যে লালটুপিও দেখা যাচ্ছিল। এখানে কর্নেল বাদে সবাই চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেছেন আগের মতো। হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছেন।
নব প্রায় হুমড়ি খেয়ে টেবিলের কাছে পড়ল। সে প্রচণ্ড হাঁফাচ্ছিল। কর্নেল উঠে তার হাত ধরে টেনে তুললেন। ভিড়টাও এসে পড়ল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। কর্নেল সামরিক আওয়াজ দিলেন-বজ্রকণ্ঠ বলা যায়–স্টপ ইট! থামুন আপনারা।
ভিড়টাও হাঁফাতে থাকল খানিক তফাতে। নব শ্বাস-প্রশ্বাসের ফাঁকে বলে উঠল–পেয়েছি স্যার, পেয়ে গেছি! আজ সকালেই এটা পড়ে থাকতে দেখে সন্দেহ হয়েছিল। ঝোপের ধারে দেখেছিলুম স্যার!
কর্নেল তার হাত থেকে দোমড়ানো চকচকে কী একটা নিলেন। তারপর হাসিমুখে অফিসারদের সামনে সেটা ধরে বললেন, এই সেই মুখোশধারীর ছোরা!
হ্যাঁ–রাঙতামোড়া খেলনার ছোরা। আচার্য বললেন, স্ট্রেঞ্জ! সেনাপতি হাঁ করে চেয়ে থাকলেন। কেবল শর্মা খিকখিক করে হাসতে হাসতে বসে পড়লেন।
কর্নেল বললেন, গত রাতে শার্কে একটা মজার নাটক অভিনীত হয়েছিল। স্রেফ নাটক বা ফার্সই বলব। খেলনার মুখোশ আর খেলনার ছোরা নিয়ে একটা রোগা টিঙটিঙে লোক ঢুকে পড়ে লম্ফঝম্ফ করেছিল। অন্য সময় এই ব্যাপারটার কী প্রতিক্রিয়া ঘটত বলা যায় না। কিন্তু কল্পনা করুন, বাইরে অশান্ত সমুদ্র ভয়ঙ্কর গর্জন করছে। তুমুল বৃষ্টি পড়ছে। বিচের একপ্রান্তে নির্জন একটা বার-কাম-রেস্তোরাঁ হাঙরে ওইরকম রাত্রিবেলার বিশেষ একটা পরিবেশে কাকেও ভয় দেখিয়ে কাবু করতে এই খেলনার মুখোশ আর রাঙতার ছুরিটা যথেষ্টই। হলফ করে বলতে পারি, আমি থাকলেও একইভাবে ভয় পেতুম এবং ভুল করে বসতুম। নবও প্রথম মুহূর্তে ভুল করে বসবে–সত্যি কিছু ঘটছে ভেবে। কিন্তু নবর মত একজন অভিজ্ঞ সুদক্ষ সাহসী লোক প্রথম মুহূর্তে ভুল করে ধোঁকাবাজিতে পড়লেও পরক্ষণে তার সহজাত ক্ষমতা আর অভিজ্ঞ ইন্দ্রিয়সমূহের অনুভূতিবলে টের পেয়েছিল যে এই ঘটনার কোথাও একটা গুরুতর অস্বাভাবিকতা আছে। তার কিছুক্ষণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার কারণ ওই অবচেতন মানসিক দ্বন্দ্ব। হ্যামবর মতো লোকের পক্ষে এটা খুবই স্বাভাবিক। ভুলে যাবেন না, সে একজন নিরক্ষর মানুষ। এখনও প্রচুর সরলতা কোনও-না-কোনওভাবে প্রকৃতি তার মধ্যে টিকিয়ে রেখেছে। নবর মতো একজন খুনখারাপি মারামারিতে সিদ্ধহস্ত অভিজ্ঞ মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতির ফলে যুক্তিজ্ঞান আয়ত্ব করলে হয়তো সে হো-হো করে হেসে উঠত। নয়তো তক্ষুনি এগিয়ে দুথাপ্পড় কষে দিত। কিন্তু তার যুক্তিজ্ঞান কিছুটা সহজাত আর প্রকৃতি অবিশ্রান্ত ঘা মেরে মেরে যেটুকু তাকে দিতে পেরেছেন, তার যোগফল মাত্র। ভুলে যাবেন না, এদিক থেকে প্রতিটি নিরক্ষর মানুষের মধ্যে যে মৃদুতম আদিম ব্যাপারগুলি রয়েছে, তা আমরা প্রাণীদের মধ্যে পুরোপুরি দেখব। হাতে ঢিল না নিয়েও কিছু ছোঁড়ার ভঙ্গি করলে কাকটা যতই দেখতে পাক যে হাত খালি, তবু ভয় পেয়ে একটু সরে যাবে। কিন্তু নব প্রাণী নয়, মানুষ। তাই সে অবচেতন দোটানায় পড়েছিল। যাক্, এত বেশি ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। আশা করি, তার তত্ত্বালীন মানসিক অবস্থা বোঝাতে পেরেছি। ছোরাটার দিকেই তার বেশিমাত্রায় চোখ পড়া স্বাভাবিক। এবং পড়েছিলও। তার নিশ্চয় কোনও সন্দেহ জেগেছিল–হয়তো সেটা অবচেতন বিহ্বলতার মধ্যে।…
