প্রথম চিঠিটা :
বিজ্ঞাপনটি আপনার নজরে পড়েছে দেখে আমি আনন্দিত। আপনি দরখাস্ত পাঠিয়েছেন, কিন্তু কোনও ফোটো পাঠাননি। শিগগির ফোটো পাঠান। পি.এ.র পক্ষে দরকারী যোগ্যতা আপনার আছে। এবার কিন্তু বক্স নম্বরে পাঠাবেন না। আমার ঠিকানা দেওয়া হলো। বাই দা বাই, মাইনের কথা লিখেছেন। সর্বসাকুল্যে হাজার টাকা প্রায়।
এর তারিখ ২ জুলাই।
দ্বিতীয় চিঠিটা :
ফোটো পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ। এই চিঠিটা নিয়োগপত্র বলে জানবেন। পরে ফর্মাল নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন এখানে এসে। আকস্মিক কারণে আমি পনের দিনের জন্যে বাইরে যাচ্ছি। চন্দনপুরে ফিরব বাইশ-তেইশ তারিখ নাগাদ। আপনি একুশ তারিখ রওনা হোন। এই সঙ্গে পৃথক ইনসিওর করা খামে তিনশো টাকা পাঠালাম। এটা অগ্রিম। আপনার রাহাখরচ এবং চন্দনপুরে এসে যদি আমার জন্যে অপেক্ষা করতে হয়, সেজন্য হাতখরচ বাবদ। আপনার অসুবিধে হবে না। আমার লোক হোটেল বুক করে রাখবে। সী-ভিউ-তে একটা সিঙ্গল সুইট পাবেন। মনে রাখবেন নামটাসী-ভিউ। আমার প্রেসটিজের জন্যেই আপনাকে কিছু প্রেসটিজ মেনে চলতে হবে। আমার ফার্মে গিয়ে নিজে খোঁজ নেবেন না। এখানে রাস্তার লোককে জিগ্যেস করলেও জানতে পারবেন, আমি ফিরেছি কি না। আমার জন্য অপেক্ষা করবেন। আমি ফিরলেই নিজে হোটেল থেকে আপনাকে নিয়ে আসব। দিস ইজ ভেরি ইমপরট্যান্ট।…তারপর পুনশ্চ আরও কিছু নির্দেশ আপনি শীঘ্রই পাবেন। নির্দেশগুলি খুব গোপনীয়। তাই চিঠিতে জানাব কি না ভাবছি। যাই হোক, অপেক্ষা করুন।
এটার তারিখ ৭জুলাই।
আচার্য মন্তব্য করলেন, বিজ্ঞাপনটা তাহলে জুনের কাগজে বেরিয়ে থাকবে। সেনাপতি, সব বড় দৈনিকগুলোর বিজ্ঞাপন কলমে খোঁজ নিতে হবে। পেয়ে যাবেন। কলকাতায় লালবাজারে ট্রাঙ্ক করে ওঁদের বলুন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বের হয়ে যাবে।
সেনাপতি মাথা দোলালেন।
শর্মা বললেন, কিন্তু সমস্ত ব্যাপারটা কেমন অস্বাভাবিক লাগছে আমার। কর্নেল কী বলেন?
কর্নেল তাঁর চোখের দিকে শান্তভাবে তাকিয়ে বললেন, ঠিকই বলেছেন। ভারতবাবুকে এবার কিছু জিগ্যেস করব।
ভারতবাবু বিনয়ে নত হয়ে জবাব দিলেন, একশোবার, স্যার। অবশ্যই।
মেয়েটি মানে তন্দ্রা ২১ তারিখে একা এসেছিল বলছেন তাহলে?
হ্যাঁ, স্যার। একা। দুপুর বারোটার বাসে নেমেছিলেন।
লাগেজ ছিল সঙ্গে?
হ্যাঁ–একটা বেডিং আর বড়ো একটা স্যুটকেস।
লেডিজ ব্যাগ–মানে, যাকে ভ্যানিটি ব্যাগ বলা হয়–তেমন কিছু..
ছিল স্যার। কাঁধে ঝুলছিল। তার থেকে একটা পার্স বের করে টাকা মেটালেন। ওনার চোখে গোগো চশমা ছিল। পরনে…
থাক। আচ্ছা ভারতবাবু, তন্দ্রা ওদিন হোটেল থেকে প্রথম কখন বেরোয় মনে। আছে?
তিনটেয় একটি ঢ্যাঙা মতো মেয়ে এসে ওঁর খোঁজ করলেন। সব ঘরে ফোনের ব্যবস্থা আছে। আমি ওনাকে রিং করে ভিজিটারের কথা বললুম–। উনি বললেন, কী নাম? ভিজিটারকে জিগ্যেস করলে জানালেনবলুন, মিস এস রায়। ফ্রম ক্যালকাটা। তন্দ্রাদেবী তক্ষুনি ওনাকে পাঠিয়ে দিতে বললেন। ঘণ্টাখানেক পরে দুজনে দোতালা থেকে নেমে বেরিয়ে গেলেন।
ঢ্যাঙা মেয়েটির চেহারা মনে আছে?
আছে বই কি স্যার। তারপর তো সকাল দুপুর রাত্রি সব সময় দুজনকে একসঙ্গে দেখেছি। রাত্রেও থেকেছেন ওঁর সুইটে। গেস্ট হিসেবে খাওয়া-দাওয়াও করেছেন।
এবার চেহারা বলুন।
ঢ্যাঙা, হাত দুটো বেশ ছড়ানো লম্বা, মোটা হাড়ের গড়ন বলা যায়। বাঁ হাতে উল্কি ছিল। সবসময় সাজপোষাক বদলানো অভ্যাস। পাঞ্জাবি, বেলবটম প্যান্ট, নয়তো গেঞ্জি। কেমন যেন পুরুষালি চালচলন। গলার স্বরও মোটা। ঘাড়ের কিছু নিচে অব্দি খোলামেলা চুল।
সে মেয়ে, তা কিসে বুঝলেন?
সবাই হেসে উঠলেন এ প্রশ্নে। ভারতবাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, না স্যার-তা কি হয়? ছেলে না মেয়ে, তা বুঝব না আবার?
আজকাল ছেলেরাও লম্বা চুল আর মেয়েদের ঢঙে পোশাক পরছে। আশা করি, বিচ-এ লক্ষ্য করেছেন।
তা ঠিক, স্যার। তবে ওনার বুক–বুক ছিল যে।
ব্রেসিয়ার ছিল? বলে কর্নেল হাসি চাপলেন–ফের বললেন, না–মানে, কেউ কারও জামা তুলে পরীক্ষা করার কথা ওঠে না। আমি বলছি, বাইরে থেকে তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছিল কি না?
ভারতবাবু লাফিয়ে উঠলেন।..স্যার, স্যার! বুক আঁটো ছিল না ওনার। আজকাল যে বিদিশী মেম-সায়েবদের দেখাদেখি অনেকে ব্রেসিয়ার পরা ছেড়েছেন! বিচে কত সব ঘুরে বেড়ান–আমার হোটেলেও ওঠেন।
তার মানে ব্রেসিয়ার ছিল না?
ঠিক স্যার।
গতকাল–মানে ২২ তারিখ কখন ওরা হোটেল ছেড়ে বের হন, মনে আছে?
আছে, স্যার। আমার নজর কড়া রাখতে হয়। বুঝতেই পারছেন, আজকাল হোটেলের আইন-কানুন সরকার কড়া করেছেন। গতকাল ওনারা বের হন, বিকেল। সাড়ে চারটে নাগাদ। সময়টা মনে আছে। কারণ, এক মন্ত্রীমশায় ওসময় চেক আউট করলেন। আপনাদের আশীর্বাদে মন্ত্রীরাও সী ভিউ-এ এসে থাকেন অনেক সময়। সরকারী অতিথিভবনে যখন আরও বড় কোনও মন্ত্রী থাকলে…
রাইট। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অতিথিভবনে থাকলে রাজ্যের মন্ত্রীদের পক্ষে হোটেল ছাড়া উপায় কী? কর্নেল মন্তব্য করলেন।…আচ্ছা ভারতবাবু, ভিজিটরদের নাম বা সই নেবার জন্যে নিশ্চয় আপনার রেজিস্টার রয়েছে?
আছে স্যার। মিস এস রায়ের প্রথমদিনকার সই আছে। পরে আর নিইনি। কারণ উনি তো দেখলুম, মিস তন্দ্রার সঙ্গেই থাকছেন-টাকছেন।
