সেনাপতি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, কর্নেল, কর্নেল! আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ যে জেরার চোটে নবর মুখোশটা খুলে দিয়েছেন! ব্যাটা সেটা টের পেয়েই পালাল। উঃ! একটুও ভাবিনি–ও ব্যাটারই কাজ! শয়তান কখনও মানুষ হয়– না হয়েছে? চোখে ধুলো দিয়ে দিব্যি ইনফরমার সেজে কাটাচ্ছিল, একটুও টের পাইনি।
আচার্য হাঁসফাঁস করে বললেন, আমি বারবার বলেছি, ও ব্যাটা খুনে গুণ্ডা সম্পর্কে সাবধানে থাকা উচিত আপনাদের। অতটা বিশ্বাস করবেন না!
আচার্য স্থূলোদর মানুষ। তার লাল মুখ ঘেমে কালো দেখাচ্ছে। ভুড়িটা ফেটে যাবার উপক্রম হয়েছে। সেনাপতির একটা হাত ধরে কর্নেল আটকানোর চেষ্টা করছেন।
কিন্তু কর্নেলের মুখে শান্ত হাসি। সবার মনে হচ্ছিল যে এই হাসি নবকে চরম পয়েন্টে জেরা করে ফেলার জন্যে তৃপ্তির হাসি। শর্মা বসলেন অবশ্য। বসে সিগারেট ধরিয়ে বললেন, আগাগোড়া একটা বানানো গল্প বলে ব্যাটা কেমন ভুল পথে চালানোর চেষ্টা করছিল। হুঁ! মুখোশপরা একটা লোক। নাও, এখন পৃথিবী হাতড়ে বেড়াও তার জন্যে! এই ফন্দিটা একটুও টের পাইনি আমরা।
আচার্য বললেন, আসলে ও ইনফরমার, তাই বিশ্বাস করতে হচ্ছিল।
কর্নেল বললেন, ওকে বিশ্বাস করে কোনওবার কখনও ঠকেছেন, এমন ঘটনা আছে?
না–ঠকিনি। এবার অ্যাদ্দিনে ঠকলুম। অবশ্য আমি ঠকিনি আমার বরাবর সন্দেহ ছিল গু-খাওয়া গরু। খোলভুষি খাবে কেন?
কর্নেল বললেন, বাই দা বাই, মিঃ আচার্য–আপনি কি মুর্শিদাবাদের লোক?
আচার্য অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁ। কেন বলুন তো?
নিশ্চয় গ্রামাঞ্চলে বাড়ি ছিল?
হ্যাঁ। কেন, কেন? কিসে বুঝলেন?
ওই গ্রাম্য প্রবাদবচনে। বলে কর্নেল হেসে উঠলেন।…! একজ্যাক্টলি! বিষ্ঠাভক্ষণকারী প্রাণীরা এমনি হয়।
.
০৭.
তামাশাবাজি ও একটা মড়া
একটু পরে দেখা গেল, থানার এ. এস. আই. বরকত আলি এক ভদ্রলোককে সঙ্গে নিয়ে ফার্মের গেট পেরোচ্ছেন। এঁরা সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। আচার্য বললেন, মিঃ সেনাপতি, বসুন! সেপাইরা গেছে, নবও গেছে–এতক্ষণ ব্যাটাকে ধরে ফেলেছে। যাবে কোথায়? নবর হাত থেকে এখন ওকে বাঁচাতে হিমশিম খাবে সেপাইরা। আপনি ব্যস্ত হবেন না–দিস ইজ নট ইওর ফল্ট। ওই দেখুন আপনারা, আলিসায়েব আসছেন কাকে নিয়ে। মনে হচ্ছে, ঘটনার জালটা বেশ ছড়ানো। নব খুন করেছে কারো টাকা খেয়ে–তা বই তো নয়! অতএব পিছনে লোক রয়েছে আই অ্যাম সিওর, মশাই। কর্নেল কী বলেন?
কর্নেল বললেন, ফ্যাক্টস। ফ্যাক্টস থেকেই তো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব।
আলির সঙ্গের ভদ্রলোক রীতিমতো ভদ্রলোক। ধবধবে ধুতি পাঞ্জাবি পরা, গিলেকরা হাতা, গলায় সরু সোনার চেন, বয়সে অবশ্য প্রৌঢ়, পায়ে পাম্প-শু রয়েছে। তার হাতে মস্ত একটা বাঁধানো রেজিস্টার মতো রয়েছে। এই সব লোক দেখেই বলা যায়, ছায়ায় সারাক্ষণ থাকেন, তাই কীরকম চাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে হয়ে ওঠেন। পান খান। আঙুলে অনেক আংটিও রয়েছে। আলিসায়েব এসে একটি সেলাম ঠুকে কিছু বলতে মুখ খুলছেন সবে, কর্নেল হাসিমুখে বললেন, আশা করি, ইনি কোনও হোটেলের মালিক। আসুন, আসুন! ওটা নিশ্চয় হোটেল রেজিস্টার। সী-ভিউ নিশ্চয়। খ্রিস্টার হোটেল এখানে তো ওই একটিই। বলুন স্যার, নিশ্চয় সিঙ্গল স্যুট বুক করেছিল হতভাগ্য মেয়েটি?
সবাই হাঁ করে কর্নেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ভদ্রলোকের মুখও হাঁ–ভিতরে একটা খয়েরি রঙের মাংসখণ্ড–অবশ্যই সেটি রসনা–প্রকাণ্ড বিলিতী কুকুরের মতো বসে থাকতে দেখা যাচ্ছিল–এবং গলার গর্ত ও আলজিভটাও, নজরে পড়ছিল। ভীষণ ঘাবড়ে যাওয়া মূর্তি।
আলি বললেন, হ্যাঁ স্যার। মেয়েটির নামধাম সব পাওয়া গেছে। এই যে– রেজিস্টারটা দেখুন। কই ভারতবাবু, দিন।
ভারতবাবু টেবিলে ওটা রেখে একপাশে দাঁড়ালেন। এতক্ষণে মুখে সামান্য হাসি ফুটল। কথাও।…হাঁ স্যার। যা বর্ণনা পেলুম, আর আমার লোকেরাও এসে দেখে গেছে–উনিই তিনি। কাল রাত্তির থেকে নিখোঁজ। বৃষ্টি ছাড়ল না। তাছাড়া…
কর্নেল বললেন, এক মিনিট। তারপর একফালি কাগজে চিহ্ন দেওয়া পাতাটা খুললেন। অফিসার তিনজন মুণ্ডু বাড়িয়ে দিলেন।
তন্দ্রা ভাদুড়ী। স্থায়ী ঠিকানা : ১২৩/১৭ হরি মুদী লেন, কলকাতা-১৩। এসেছে ২১ জুলাই দুপুর বারোটায়। সুইট নম্বর সি, সিঙ্গল। স্পেশাল রেফারেন্স শ্রী-মদনমোহন পানিগ্রাহী, পানিগ্রাহী ফার্ম, ..
হোয়াট! লাফিয়ে উঠলেন সেনাপতি।
কর্নেল বললেন, তার মানে কোনও বিপদ-আপদের ক্ষেত্রে শ্রীপানিগ্রাহীর সঙ্গে হোটেল কর্তৃপক্ষকে যোগাযোগ করতে হবে। তন্দ্রা তাহলে কলকাতার কোনও রেফারেন্স দেয়নি–যা স্বাভাবিক ছিল। তাহলে দাঁড়াচ্ছে : পানিগ্রাহী মেয়েটিকে ভালই চেনেন। আর…।
আলি তার পকেট থেকে দুটো চিঠি বের করে বললেন, চেনেন স্যার? এই দেখুন, ওঁর সুইট তল্লাসী করে এই চিঠিদুট খুব ইমপরট্যান্ট মনে হলো বলে সঙ্গে এনেছি। সুইটে আমাদের তালা আটকানো হয়েছে এখন।
দুটই ইনল্যাণ্ড লেটার। দুটতেই তন্দ্রা ভাদুড়ীর নাম ঠিকানা ইংরজিতে টাইপ করা। এবং দুট চিঠিরই ভাষা ইংরেজি, টাইপ করা। প্রথমটার শুরু, ডিয়ার মিস ভাদুড়ী। দ্বিতীয়টার শুরু, মাই ডিয়ার মিস তন্দ্রা। দুটোর তলায় শ্রী মদনমোহন পানিগ্রাহীর সই। চিঠি দুট পড়ে জানা গেল, শ্ৰীপানিগ্রাহী তন্দ্রাকে পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টের চাকরি দিচ্ছেন।
