নব মাথা নিচু করে কাঁচুমাচু মুখে বলল, আপনার আশীর্বাদে তা পারতুম, স্যার!
কিন্তু তা করোনি।
আমার…আমার কী যেন হয়েছিল! এখন আফসোস হচ্ছে, স্যার।
কর্নেল তার মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, নাকি তুমি মোটেও বাঁধা দিতে চাওনি?
নব লাফিয়ে উঠল। তীব্র প্রতিবাদের সুরে বলল, ছি ছি! এ কী বলছেন স্যার! চোখের সামনে একটা খুনখারাপি দাঁড়িয়ে দেখার ছেলে নব নয়। আমার পরম শত্রুকেও যদি কেউ খুন করতে চেষ্টা করে আমি সামনে থাকলে তা প্রাণ গেলেও হতে দেব না। কত বড়বড় গুণ্ডা আর বদমাশ পিটিয়ে আমি ঠাণ্ডা করেছি। বালেশ্বরের ওদিকে গিয়ে নবর নাম বললে এখনও সাপ রাস্তা ছেড়ে সরে যায়!
কর্নেল তার কথার ওপর কথা ফেললেন।…সাপও রাস্তা ছেড়ে যায়। অথচ মুখোশপরা লোকটা দিব্যি ছোরা হাতে দুটি মেয়েকে খুন করতে ঢুকেছে–আর ঢুকেছেও তোমার ঘরে বলা যায়–তুমি অমনি বোবা বনে গেলে নব?
নব ফ্যালফ্যাল করে তাকাল… আমার বুদ্ধি গুলিয়ে গিয়েছিল যেন।
তোমার বুদ্ধি সামান্য একটা–তোমারই ভাষায় রোগা টিঙটিঙে লোককে ছোরা হাতে লম্ফঝম্ফ করতে দেখে গুলিয়ে গেল? দুঃখিত নব, এটা বিশ্বাস করতে পারছিনে।
নব বিব্রত মুখে হাত কচলাতে থাকল। এইসময় সেনাপতি যেন নবর। হয়েই সাফাই দেবার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, কর্নেল স্যার! নব আমাদের বিশ্বাসী। ও ভীষণ সাহায্য করেছে নানা ব্যাপারে। তাছাড়া ইনফরমারের গতিবিধি জানবার জন্যেও আমাদের ইনফরমার রয়েছে। নব ইজ কোয়াইট ক্লিন ইন অল রেসপেক্ট।
কর্নেল বললেন, একটা কথা মিঃ সেনাপতি। নবর ধরনের লোকেরা সচরাচর কীরকম হয়ে থাকে আমরা জানি। অতীতে সে বদমাইশি খুনোখুনি করেছে। তারপর সম্ভবত নানা ঘটনার চাপে ওর চরিত্র বা জীবনযাত্রার ধাঁচ বদলাতে বাধ্য হয়েছে সে নিজে, কিংবা হয়তো শুধু বাইরের চাপেই বদলে গেছে। সাধারণত এই ধরনের লোকই পুলিশের ইনফরমার হবার উপযুক্ত। পুলিশের কার্যকলাপের আওতায় এসে এরা কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা পাল্টা ভূমিকা নিতে শুরু করে। তাদের অহংবোধ উদ্দীপ্ত হয় এবং আইনের পথে প্রকাশ্যে, নিজের শক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে দেখে তাদের পক্ষে অনেক সময়। সমাজের একটি উপকারী মানুষ হয়ে ওঠাও বিচিত্র নয়। ব্যতিক্রমও আছে নিশ্চয়। এবার আসছি, এ ধরনের লোকেদের দ্বিতীয় একটি মানসিক বৈশিষ্ট্যের কথায়। যেহেতু তাদের তীব্র অহংবোধ এখন আইনের প্রশ্রয় পাচ্ছে এমনকি সামাজিক দিকে থেকে নৈতিক প্ররোচনা ও পিঠচাপড়ানি দুই-ই পাচ্ছে এরা বেপরোয়া হয়ে গুণ্ডা বদমাশ ঠ্যাঙাতে তৎপর হয়। তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিদ্বন্বিতার মনোভাব। তার কাছে এখন পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম খনী বা গুণ্ডা-বদমাশ যে নস্যি, এটা দেখানোর জেদ মাথায় উগ্র হয়ে ওঠে। ভাবটা এই : আরে যা ব্যাটা পুঁচকে! অমন কত মাল পকেটে ভরেছি অ্যাদ্দিন! …আমার মনে হচ্ছে, নবর মধ্যে এইসব ভাব থাকা স্বাভাবিক।
সেনাপতি মাথা দোলালেন।…হ্যাঁ, আছে। আই এগ্রি। নিশ্চয় আছে।
আছে। অথচ সে গতরাতে হাঙরের মুখোশপরা ছোরাধারী একটা রোগা টিঙটিঙে লোককে দেখে ঘাবড়ে গেল!…
নব বাধা দিয়ে বলল, না স্যার, না স্যার। ঘাবড়াইনি। হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। এ যে এক আজব ঘটনা স্যার!
এমন ঘটনার মুখোমুখি তাহলে কখনও হওনি বলছ! ভেবে বললো, নব।
হইনি বললে মিথ্যে বলা হবে। একবার আচমকা একটা লোক আমাকে ছোরা নিয়ে হামলা করেছিল… বলে নব সেনাপতির দিকে সায় নেবার ভঙ্গিতে তাকাল।…ঠিক না, স্যার? তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ছুরিসুদ্ধ থানায় নিয়ে গেলুম না, স্যার?
সেনাপতি বললেন, দ্যাটস রাইট।
কর্নেল প্রশ্ন করলেন, তাহলে, নব?
নব ঘামছিল। ভারি গলায় বলল, কী বলব–কী যেন হয়েছিল তখন! খুব হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম। আপসোস হচ্ছে–ইস্! আর একবার যদি ওরকমটি হতো!
কর্নেল একটু হাসলেন। তারপর বললেন, যাক্ গে, ছেড়ে দাও। যা হবার হয়েছে। এখন বলল, মুখোশটা কেমন ছিল?
এমনি একটা মুখোশ-বাচ্চারা যা পরে। বিচে বিকেলে বেচতে আসে ফেরিওয়ালারা। ভূতের মুখোশ, রাক্ষসের মুখোশকত রকম। কানে গাটার দিয়ে আটকাতে হয়। নাক ও চোখের ফুটো থাকে।
তাহলে বলছ খেলনার মুখোশ?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, আর ছোরাটা সেই রকম খেলনার নয়, আশা করি!
নব কেন যেন একটু অবাক হলো, খেলনার ছোরা?
সী-বিচে খেলনার মুখোশ আর রাঙতামোড়া ছুরি তলোয়ার তীর ধনুক বিক্রি হতে আমি দেখেছি। কর্নেল সকৌতুকে বললেন, ফের, নব, আমাদের বেশ অদ্ভুত গল্প শোনালে তাহলে!
অমনি নব এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সে আচমকা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
ঘটনাটা এমন আচমকা ঘটল যে সবাই হতভম্ব হয়ে পড়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্যে। নব যখন ফার্মের সদর গেট পেরিয়েছে, তখন দুজন সেপাই উপস্থিতবুদ্ধি মতে পাকড়ো, পাকড়ো শালা বদমাশকো বলে চেঁচাতে চেঁচাতে দৌড়ল। সেনাপতি, শৰ্মা, আচার্য এবার স্প্রিঙের পুতুলের মতো চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠলেন একসঙ্গে। আচার্য বজ্রকণ্ঠে আওয়াজ দিলেন, পাকড়ো শালা খুনী কো! সেনাপতি চেয়ার সরিয়ে রিভলভার খুলে বেরোবার চেষ্টা করতেই কর্নেল তার হাতটা ধরলেন। কোথায় যাবেন? বসুন। কর্নেল এতক্ষণ একটুও নড়েননি।
ওদিকে ফার্মের কিছু লোক আর ভিড় থেকে কয়েকজন মিলে দৌড়ে যাচ্ছে দেখা গেল।
