হ্যাঁ। আমাকেও বলেছে।
এখানে ওই বাংলো-ভূতের গল্প বেশ চালু আছে। বলে সেনাপতি হেসে উঠলেন।
আর কেউ ভূত দেখেছে বলেনি?
ভোমরলাল বলছিল, বৃষ্টির সময় ধুপ ধুপ শব্দ শুনেছে! বোঝা যায়–এ উদ্ভট ব্যাপার। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়া দিচ্ছিল রাত্রে। তাছাড়া লোকটা প্রচণ্ড গাঁজা টানে।
আর কিছু?
বুধন সিং বলল যে রাতে তার ঘুম হয়নি, টাট্টি পেয়েছিল। তখন অন্ধকারে কাছাকাছি কোথাও মড়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে হরিধ্বনি শুনেছে।
অত রাত্রে বৃষ্টির মধ্যে?
সেটাই পিকিউলিয়ার। তবে ও স্বীকার করেছে, তার কানের ভুল হতে পারে।
এবার কী করবেন মিঃ সেনাপতি?
সেনাপতি উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, রুটিন ওয়ার্কস ছাড়া আপাতত কী করা যাবে বুঝতে পারছিনে। মড়াটা তুলে মোহনপুর মর্গে পাঠাতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স আনবার জন্য ট্রাঙ্ককল করতে পাঠিয়েছি অজিতকে। তার আগে লাশটা সনাক্ত করতে হবে। সেটাই জরুরী এখন। লোকালিটিতে খবর পাঠানো হয়েছে। সব হোটেলেও খবর গেছে। তেওয়ারীকে দায়িত্ব দিয়েছি। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তবে সবচেয়ে মুসকিল কী জানেন? পানিগ্রাহী সায়েবের ফার্মে লাশটা ফেলে খুনী আমাদের খাটুনি বাড়িয়েছে। তিনি পলিটিসিয়ান ভীষণ প্রভাবশালী লোক। এ খুনের হেস্তনেস্ত না করলে বিধানসভা থেকে লোকসভাঅব্দি হইচই লাগিয়ে দেবেন।
ডাক্তার পট্টনায়ক একটু হেসে বললেন, ঠিকই। বিশেষ করে ভদ্রলোকের মহিলাদের প্রতি আগ্রহ প্রচুর। তরুণী ও সুন্দরী হলে তো কথাই নেই। এই হচ্ছে ওঁর চরম ভাইটাল পয়েন্ট।
সেনাপতি বললেন, দুর্বল পয়েন্ট বলুন, স্যার।
রোদ বেড়েছে ইতিমধ্যে। আকাশের আজ সাজগোজ করার ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে না। কৌপিনপরা সন্ন্যাসীর মতো ছাইমাখা গায়ে চুপচাপ বসে রয়েছে। ইউক্যালিপটাস গাছের পাতাগুলো বাতাসের টানে মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে চমকে ওঠা গরুর পালের মতো কান খাড়া করছে আর নামাচ্ছে। একজন-দুজন করে। লোক আসতে দেখা যাচ্ছিল। ভিড়ের অবস্থা কী হবে আঁচ করা যায়। ছোট্ট টাউনশিপ ইতিমধ্যে ছটফট করতে শুরু করেছে।
লোকজনের আসা লক্ষ করে ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো সেনাপতি, লাশ এক্ষুণি সনাক্ত হয়ে যাবে। হোটেলের লোকগুলো আসবার অপেক্ষা শুধু।
সেনাপতি সাহস পেয়ে বললেন, তাই আশা করছি। সনাক্ত হলেই খুনের মোটিভ বের করতে আমার দেরি হবে না। আর মোটিভ বেরোলেই খুনীর পাত্তা পাব।
কর্নেল সকৌতুকে বললেন, রাইট! রোগ কী জানতে পারলেই আরোগ্যের বাড়া সেটা। কী বলেন মিঃ পট্টনায়ক? আপনারা ডাক্তাররা তো তাই বলেন? ডায়গোনেসিস ইজ বেটার দ্যান কিওর কী না?
ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, অবশ্যই। কর্নেল, এবার কিন্তু আমি কেটে পড়তে চাই। ভিড় দেখলে আমার হাঁফ ধরে যায়। চলুন, এগোই।
কর্নেল বললেন, আমারও। ইয়ে–মিঃ সেনাপতি, আমরা যদি এখন ফার্মের কাউকে নিয়ে ওই বাংলোটা দেখতে যাই, আপনার কোনও আপত্তি আছে– মানে, আইদার অফিসিয়াল অর পারসোনাল?
নেভার। যান না স্যার, দেখে আসুন। বরং আপনাদের মতো দুজন জায়ান্ট হ্যাঁণ্ড পাশে পেয়ে আমি কী বোধ করছি, বোঝাতে পারব না। এই ভোমরলাল! ইধার আও। সায়েবদের বাংলো দেখিয়ে আনে। চাবি কোথায়?
— ভোমরলাল জানাল, চাবি হাসিরামের কাছে। তখন হাসিরামকে হুকুম করা হলো। হাসিরাম কর্নেল ও ডাক্তারের আগে আগে ধুকুর ধুকুর দৌড়ল।
.
বাঁদিকে গোলাপক্ষেত। একটু বিবর্ণ দেখাচ্ছে। পোকা লেগেছে সম্ভবত। কর্নেল বললেন, দিল্লীর কুতুবমিনারের পাশে যে গ্রামটা আছে–মেহেরৌলি। একবার এক সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে সেই গ্রামের মাঠে-মাঠে এলোমেলো ঘুরেছিলুম। ওখানেই শ্ৰীমতী ইন্দিরা গান্ধীর কিছু জমি আছে। তাই নিয়ে সেবার খুব বিতর্ক উঠেছিল। যাই হোক, সেই বিতর্কিত জমি দেখবার আগ্রহ আমার ছিল না। আমি অজস্র গোলাপক্ষেত দেখে আনন্দ কুড়োচ্ছিলুম। এক জায়গায় গোলাপক্ষেতে ময়ূর হেঁটে গেল। ভাবতে পারেন, সে কী হৃদয়গ্রাহী ঘটনা!
ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, কর্নেল! ভাববেন না–এখানেও ময়ূর বাস করে। ওই সরকারী অরণ্যে।
হঠাৎ কর্নেল হাস্যকর ভঙ্গিতে দৌড়ে হাসিরামের কাধ ধরে ফেললেন। ডাক্তার অবাক। হাসিরাম ঘাবড়ে গিয়ে শ্লেটে বাচ্চাদের আঁকা মূর্তির মতো সর্বাঙ্গে করুণ হয়ে পড়েছে। পট্টনায়ক দৌড়ে গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললেন, কী ব্যাপার?
কর্নেল হাসছিলেন।…কিছু না। হাসিরাম এবার আমাদের পিছনে থাকবে। কারণ কোনও বিশেষ চিহ্ন তার পায়ের তলায় ধ্বংস হোক, এটা বাঞ্ছনীয় নয়। এর পায়ের পাতা হাঁসের মতো চওড়া–লক্ষ করছেন? হাসিরাম, তুমি খুশি হবে কি না জানিনে, তুমি নির্ঘাৎ এই সমুদ্রে ছিলে পূর্বজন্মে।
হাসিরাম আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, ছিলুম বই কি স্যার। সেজন্যেই তো ভয়ে ঘুমোতে পারিনে। যেই তন্দ্রামতো আসে, মনে হয় সমুদ্রের তলায় চলে গেছি–দম বন্ধ হয়ে যায় স্যার।
কর্নেল ওর হাত থেকে চাবির গোছাটা প্রায় কেড়ে নিয়ে বললেন, পেছন পেছন এস।
সে ঠিক তাই করতে লাগল। পথটা একটা গেট পেরিয়ে আরেকটা পথে এসে মিশেছে, গেট খুলে বেরতে হলো। টিলার ঢালু গায়ে তেমাথা সৃষ্টি হয়েছে একটা। একটু চড়াই ভাঙতে হলো। পিচ-চটা রাস্তাটা সংকীর্ণ। একটু পরেই রাস্তার পিচ হঠাৎ শেষ হলো। কাঁচা রাস্তা–দুধারে ইউক্যালিপটাস গাছ আর ঝোপঝাড়। বাঁদিকে ঘুরে আন্দাজ বিশ মিটার দূরে বাংলোর গেটে শেষ হয়েছে। কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, ডানহাতি রাস্তাটা কোত্থেকে এসেছে হাসিরাম?
