হাসিরাম জবাব দিল, ওটা ফার্মের বাইরের রাস্তা স্যার। সরকারী জায়গা। ফরেস্ট বাংলোর নিচে দিয়ে চলে গেছে। একেবারে জঙ্গলে ঢুকেছে–তারপর চন্দনপুর বালেশ্বর রোডে মিশেছে।
কর্নেল কাঁচা রাস্তাটা তীক্ষ্ণদৃষ্টে লক্ষ্য করে বললেন, হুম! ডাঃ পট্টনায়ক!
বলুন কর্নেল।
এই টিলাটাও বেলে মাটিতে ভরতি। আবার জায়গায় জায়গায় বালিও যথেষ্ট দেখছি–ঘাস গজাতে পারেনি। কিন্তু..কী কাণ্ড!
কী, কী?
মোটর গাড়ির চাকার দাগ।
তাই তো বটে!
দুজনে হেঁটমুণ্ডে গেট অব্দি ঘুরে-ঘুরে দাগগুলো পরীক্ষা করতে ব্যস্ত হলেন। হাসিরাম একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল।
কর্নেল বললেন, গাড়িটা গেট অব্দি এসে ফিরে গেছে বোঝা যাচ্ছে। হুম, এখানে ঘোরানো হয়েছে। তাহলে…তাহলে এটা হচ্ছে সামনের ডান চাকা। কী বলেন?
হ্যাঁ–তাই মনে হচ্ছে।
কিন্তু দেখুন, বা চাকার দাগ একরকম–ডান চাকার আরেকরকম?
অ্যাঁ? সে কী? ডাঃ পট্টনায়ক চমকে উঠলেন।
হ্যাঁ। আর সব দাগই একরকম। একটা করে সোজা রেখা, আর দুদিকে টানা দুসার ত্রিকোণ, মধ্যের ত্রিকোণটা বড়। কিন্তু সামনের ডান চাকার মধ্যের নকশাটা চারকোণা, টানা রেখার বদলে ফুটকি রয়েছে। আর খাজগুলো বেশ চওড়া। হুম! ডাক্তার পট্টনায়ক! এই চাকাটা নতুন কেনা হয়েছে বাকি তিনটে পুরনো। আপনি কি ছবি নেবেন অনুগ্রহ করে?
পট্টনায়ক ক্যামেরা নিয়ে বললেন, নিচ্ছি। কিন্তু কেসের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক আছে বলে মনে করেন কি? মিছেমিছি ছবি নেওয়ার চেয়ে সিওর হওয়া ভাল– তাই না?
সেই সময় হাসিরাম বলল, ফরেস্টে বেড়াতে অনেকে গাড়ি নিয়েই আসে স্যার। পাহাড়ের এদিকটা বেশ ঢালু কি না–আর রাস্তাও রয়েছে।
পট্টনায়ক বললেন, ঠিক তাই। সেজন্যেই এ অব্দি এসে গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেছে কেউ। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে অত রাত্রে গাড়ি কে আনল?
কর্নেল বললেন, ছেড়ে দিন। টায়ারের নকশা আমার মনে থাকবে। ছবি নেবার দরকার নেই।
ক্লান্ত পট্টনায়ক একটা নিঃশ্বাস ফেললেন।…হ্যাঁ, ফিল্মও ফুরিয়ে গেছে দেখছি।
গেট খুলে ছোট্ট ফুলবাগিচা পেরিয়ে বারান্দায় উঠলেন ওঁরা। তারপর কর্নেল তালাটা পরীক্ষা করে খুললেন। একটা জানালার খড়খড়ি ভোলা রয়েছে দেখা গেল। কর্নেল বললেন, খড়খড়ি কি বরাবর তোলা ছিল হাসিরাম?
হ্যাঁ স্যার। সায়েবের আজকালের মধ্যেই আসার কথা। তাই সাফ করে গেছি কাল বিকেলে। ঘরে দেখছেন ভেন্দিলেটার নেই। তাই সায়েবের হুকুম আছে…
মি? পট্টনায়ক, একরকম গন্ধ পাচ্ছেন কি?
পাচ্ছি।
কিসের বলুন তো?
কসমেটিকসের মনে হচ্ছে। এবং সেটাই স্বাভাবিক মিঃ পানিগ্রাহীর বাংলোয়? বলে একটু হাসলেন পট্টনায়ক।
জানালাগুলো খুলে দাও তো হাসিরাম।
হাসিরাম জানালাগুলো সব খুলে দিলে ঘরটা আলোয় ভরে গেল। এককোণে একটা চমৎকার সোফাসেট রয়েছে। দেয়ালে-দেয়ালে সুন্দর পেন্টিংস টাঙানো রয়েছে। একটা শোকেস ভরতি সুদৃশ্য দেশী-বিদেশী পুতুল। বুকশেলফে কিছু বই ও ম্যাগাজিন। কোণের সোফাসেটের দিকে এগোতে গিয়ে কর্নেল হাঁটু দুমড়ে বসলেন হঠাৎ….ডাঃ পট্টনায়ক, এ-ঘরে গতরাত্রে লোক ছিল! বলে তিনি আঙুল দিয়ে একটা কী দেখালেন।
পট্টনায়ক সেটা দেখতে পেয়ে বললেন, সিগারেটের টুকরো?
কর্নেল বললেন, তিনটে পোড়া সিগারেটের টুকরো। মিঃ পট্টনায়ক। আমি একটা পোড়া দেশলাই কাঠি পেয়েছি। আসুন, ভাল করে খুঁজি। তিনটে সিগারেট যখনতখন আরও দেশলাই কাঠি পাবার আশা আছে। ইয়ে-হাসিরাম, তোমার সায়েব সিগারেট খান না নিশ্চয়?
না স্যার।
তাই অ্যাশট্রে দেখছিনে কোথাও?
পট্টনায়ক বললেন, কী মুসকিল! তা বলে অতিথিদের জন্য অ্যাশট্রে রাখবেন না-কি?
কর্নেল মৃদু হেসে বললেন, এ বাংলোয় কোনও অতিথিকে আপ্যায়িত করেন মিঃ পানিগ্রাহী-তাই না হাসিরাম? অবশ্য তার প্রেমিকারা সিগারেট খান কি না জানিনে।
হাসিরাম সায় দিয়ে বলল, এ তার প্রাইভেট বাংলো স্যার। আমি ছাড়া এখানে কারো আসার হুকুম নেই। কেউ দেখা করতে এলে ওধারে ফার্মের গেটের কাছে আপিসে গিয়ে দেখা করেন।
পট্টনায়ক দেশলাই কাঠি খুঁজছিলেন। পেলেন না। বললেন, আশ্চর্য তো! আর কোথাও একটা কাঠির টুকরো নেই!
কর্নেল কাঠির টুকরো ও সিগারেটের নিটে পাফ পকেটে রেখে সোফার দিকে আরও ঘনিষ্ঠ হলেন। বললেন, হাঁটুর নিচে সোফার গায়ে সিগারেট ঘষে নেভাবার চিহ্ন দেখছি। মিঃ পট্টনায়ক! আরেকটা সিগারেট পেলুম। এটা সবে ধরানো হয়েছিল কিন্তু ঘষটে নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে কোনও কারণে?
পট্টনায়ক বললেন, সিগারেটটায় ও কিসের দাগ।
লিপস্টিকের।
মাই গড! স্ত্রীলোক সিগারেট খাচ্ছিল?
এ থেকে ঠোঁটের ছাপ নিতে উৎসাহী হবেন নিশ্চয়?..কর্নেল সকৌতুকে বললেন, ডাঃ পট্টনায়ক, কিছু ফ্যাক্টস এখানে তাহলে পাওয়া গেল। তার থেকে দাঁড়াচ্ছে : একটি পুরুষ এবং একটি স্ত্রীলোক এখানে সিগারেট খাচ্ছিল এবং…
হাসিরাম বলে উঠল, স্যার এই দেখুন–মোমবাতি জ্বালিয়েছিল কেউ।
ডাঃ পট্টনায়ক, পুরুষটি চেইন-স্মোকার যাকে বলে। সে সিগারেটের আগুনে সিগারেট ধরাতে অভ্যস্ত। তাই আমরা একটামাত্র পোড়া দেশলাই কাঠি পেলুম। মহিলাটিকেও সে নিজের সিগারেট থেকে আগুন দেয়। মহিলাটি কয়েকটি টান দিতে সবে শুরু করেছে, তখন হঠাৎ এমন কিছু ঘটে যে সে তক্ষুনি হাঁটুর কাছে বুঝতে পারছেন? টেবিল নয়–হাঁটুর কাছে ঘষে নিভিয়ে ফেলে। তার একটাই অর্থ হয়। তার সিগারেট লুকোতে চেয়েছিল। তার থেকেও অর্থ খোঁজা যেতে পারে– এমন কেউ অভাবিতভাবে এসে পড়েছিল, যার সামনে সে সিগারেট খায় না। আপনি কী বলেন?
