পট্টনায়ক উৎসাহী হয়ে বললেন, অদ্ভুত কেন? যাঁড়ের গুঁতোয় বিস্তর মানুষ মরতে দেখেছি।
বলছি। আগে ব্যাপারটা ভাবুন। মাঠের মধ্যে নির্জন একটা ডেয়ারি। অবশ্য পাসেই একটা হাইওয়ে রয়েছে। ষাঁড়টা একটা বেড়াদেওয়া ফাঁকা জায়গায় বাঁধা ছিল। তার পাশেই নাগালের মধ্যে ছিল একটা খড়ের গাদা। সে দড়ি ছিঁড়ে প্রথম নম্বর শিকারের ওপর চড়াও হয়। খড়ের গাদায় ঠেসে ধরে। লোকটার হার্টে শিঙ ঢুকে যায়। দ্বিতীয় নম্বরের বেলাতেও একই পরিণতি ঘটে। মর্গের রিপোর্টে বলা হয়, তিন ইঞ্চি মোটা কোনও সূচলো কিছুর আঘাতে মৃত্যু ঘটেছে। মার্ডার উইপন হিসেবে ষাঁড়ের রক্তমাথা শিঙটাকে সাব্যস্ত করা হয়। দ্বিতীয় মত্যুর কারণও একই। যাঁড়ের ডান শিঙে রক্ত ছিল। এমন সময় দৈবাৎ ওখানেই আমার গাড়ি বিগড়ে আটকা পড়লুম। তারপর, বুঝতেই পারছেন, চেঁকির পক্ষে ধানভাবনা ছাড়া রেহাই নেই। আমার প্রশ্ন অফিসারদের চমকে দিল। ষাঁড় দুবার দুজন মানুষকে মারবার জন্য আলাদা-আলাদা শিঙ ব্যবহার করে কি না।
ডাঃ পট্টনায়ক হাসতে হাসতে বললেন, ওয়াণ্ডারফুল!
খড়ের গাদার তলা থেকে সত্যিকার মাৰ্ডর উইপন বেরোল। একটা লোহার গোঁজ সেটা। দুষ্ট প্রকৃতির গরু-মোষ বাঁধা হয় তা দিয়ে।
তারপর?
কর্নেল জবাব না দিয়ে জমিতে গিয়ে নামলেন। পট্টনায়ক তার পিছোনে এগোলেন। তারপর হাতের সেই অদ্ভুত কাঁচটা মাটির কাছাকাছি ধরে জানোয়ারের পায়ের দাগগুলো পরীক্ষা করতে থাকলেন। কর্নেল বললেন, অনেকক্ষণ থেকে আপনার হাতে ওই জিনিসটা লক্ষ করছি। নতুন কোনও ফোরেনসিক যন্ত্র বেরিয়েছে বুঝি?
ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, আমারই উদ্ভাবনী ক্ষমতার নমুনা এটা। আতশ কাঁচই বলতে পারেন। তবে এর আণুবীক্ষণিক বৈশিষ্ট্য অসাধারণ। নিজে তৈরি করে নিয়েছি।
কর্নেল হাত বাড়িয়ে বললেন, একবার দেখি আপনার যন্ত্রটা।
যন্ত্র বলতে যা বোঝায়, এটা তা নয়। জাস্ট এ মালটিরিফ্লেকটর গ্ল্যাস। বলে পট্টনায়ক হাতলওয়ালা জিনিসটা কর্নেলকে দিলেন।
কর্নেল লাশের পিঠের দিকে একটু তফাতে প্রথমে ঘাসের পাতা, তারপর একহাতে ঘাস সরিয়ে ক্ষেতের তলা উদোম করলেন। দেখতে দেখতে বললেন, বেলে ধরনের মাটির একটা বৈশিষ্ট্য থাকে। দেখে যান মিঃ পট্টনায়ক! এইসব মাটিতে অজস্র লালচে ছিটে দেখতে পাওয়া যায়। আপনার রিফ্লেকটরে ছিটেগুলো এক সেন্টিমিটার চওড়া দেখাচ্ছে। লক্ষ্য করছেন?
পট্টনায়ক দেখে নিয়ে বললেন, হ্যাঁ–অনেক আগেই লক্ষ্য করেছি। গুচ্ছ গুচ্ছ লাল দানা রাখা বেলেমাটির স্বভাব। ওই দেখুন, কোথাও কত বেশি চওড়া দেখা যাচ্ছে দানাগুলো। জাস্ট অ্যান ইচ্ছ।
কর্নেল লাল মোটা গুচ্ছটার ওপর রিফ্লেকটর স্থির রেখে বললেন, শুধু বেলে বা দোঁয়াশ মাটিতে এমন থাকে না, এঁটেল মাটিতেও বিস্তর লাল ছিটে দেখা যায়। একবার এক গ্রামের বিলের ধারে নাবাল জমিতে লাশ পোঁতা ছিল একটা। বিজ্ঞ অফিসারটির কোনও তুলনা হয় না–তিনি কাছাকাছি জায়গার মাটি থেকে…বাই জোভ! বলে হঠাৎ মুখ তুলে একটু হাসলেন।…ডাঃ পট্টনায়ক, আমরাও অনায়াসে সেই আদিম ও শ্রমসাপেক্ষ পদ্ধতিটি অনুসরণ করতে পারি।
পট্টনায়ক কপালের ঘাম মুছে বললেন, তাহলে তো পুরো ন একর জমি ( খুঁটে-খুঁটে লাল দানাগুলো তুলে নিতে হয়। দ্যাটস এ বিগ জব–খাটুনি ভীমস্য!
কর্নেল বললেন, আপাতত একটা ইঁদুরের খাটুনি খাটা যেতে পারে। আপনার কাছে প্ল্যাস্টিক পেপার আছে?
অবশ্যই।
তাহলে এই সবচেয়ে মোটা দানাগুলো–অন্তত ট্রাকটারের চাকা অব্দি জায়গায় যতগুলো সম্ভব তুলে নিই।
তারপর?
তারপর আপনি আপনার টেবিলের সামনে গিয়ে বসবেন। রাসায়নিক বিশ্লেষণ করবেন।
নিশ্চয়–তাতে আমি পিছপা নই।
ছুরি পেলে ভাল হতো একটা।
নিন–সবই আছে। বলে কিটব্যাগ থেকে একটা ছুরি বের করলেন ডাক্তার। এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখলেন কর্নেল রিফ্লেকটারটা একখানে ধরে কী দেখছেন।…কী? সত্যিকার রক্ত নাকি?
না–একটা গর্ত।
খুরের দাগ ছাড়া আর কী হবে?
এটা আরও গভীর মনে হচ্ছে, মিঃ পট্টনায়ক। বলে কর্নেল লাশটার পিঠের দিকে রিফ্লেকটারটা নিয়ে গেলেন। তারপর একেবারে পা বরাবর থামলেন। তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল হঠাৎ। চোখে বিস্ময় ফুটল।–কী কাণ্ড! এদিকেও একই সাইজের একটা গর্ত। একটা মাত্র খুর দেবে বসবে–এবং দু জায়গায়? বলে তিনি আগের গর্তটা থেকে ছুরি দিয়ে দ্বিতীয় গর্ত অব্দি একটা সরলরেখা টানলেন।
ডাঃ পট্টনায়ক অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলেন। বললেন, কী হলো?
এই সরলরেখাটা লাশের সমান্তরাল?
তাতে কী প্রমাণ হয়?
কিছু প্রমাণ হওয়া নির্ভর করছে আপনার বিশেষজ্ঞ কার্যকলাপের ওপর। ডাঃ পট্টনায়ক, এই গর্ত দুটোর ছাপ নেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আর নিন দু একটা সাধারণ খুরের যে ছাপগুলো দেখছি, তার থেকে। আমি ততক্ষণ লাল দাগগুলো তুলে ফেলি।
কর্নেল তাই করতে ব্যস্ত হলেন। পট্টনায়ক ক্যামেরার লেন্স খুলে আরেকটা অদ্ভুত গড়নের লেন্স পরালেন। তারপর গর্ত দুটর ছবি তুললেন।
কয়েক মিনিট পরে দুজনে উঠে গেলেন সেনাপতির কাছে। সেনাপতি তখনও জাবেদা খাতায় কী সব টুকছেন। কর্নেল বললেন, জিগ্যেসপত্তর শেষ হলো মিঃ সেনাপতি?
হ্যাঁ স্যার।
তেমন কোনও বিশেষ ইয়ে পেলেন-টেলেন নাকি?
মালী হাসিরাম বলছিল, রাতে বৃষ্টির মধ্যে ওই বাংলোতে আলো দেখেছে, তারপর….
