মাঝে মাঝে মুখ তুলে ও পেন্সিল কামড়ে ভাবছিলেন আর লিখছিলেন সেনাপতি। এই যথেষ্ট আপাতত। এবার কয়েকজনের সাক্ষ্য লিখতে হবে। তাদের সই করাতে হবে। লিখলেন : গোপালকিশোরের বিবরণ। তারপর তাকে ডাকলেন… এই যে গোপাল, এবার বলো। কীভাবে লাশটা তোমার চোখে পড়ল?
গোপালকিশোরের বলা শেষ হলে সেনাপতি তার সই নিলেন। তারপর কর্নেলের কাছে গিয়ে সবিনয়ে জানালেন, আপনার স্টোরিটা স্যার…
কর্নেল বললেন, অবশ্যই।…
তখন ডাঃ পট্টনায়ক লাশের ডানহাতের আঙুলের ছাপ নিতে ব্যস্ত। পরে সতর্কভাবে চারপাশের ঘাস আর আগাছায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে ঘোরাঘুরি করলেন। না–কোনও রক্তচিহ্ন নেই, কোনও পায়ের ছাপও নেই। সূত্র বলা যায়, এমন কোনও জিনিসও চোখে পড়ল না তার। কোনও সিগারেটের টুকরো বা পোড়া দেশলাই কিংবা কোনও রুমাল। অবশেষে অস্ফুট মন্তব্য করলেন, সাধারণ খুন! সম্ভবত রেপের পর মার্ডার–আগেই অনুমান করেছি।
সেনাপতি ফার্মের অন্যান্য লোকজনের প্রাথমিক সাক্ষ্য নিচ্ছেন। কর্নেল ডাক্তারের কাছে এসে বললেন, মিঃ পট্টনায়ক, দেখাশোনা শেষ হলো?
যথেষ্ট। বলে পট্টনায়ক হাঁফ ফেলার ভঙ্গিতে কাঁধে ঝোলানো জিনিসপত্রসুদ্ধ একটি আড়মোড়া দিলেন।
কতক্ষণ আগে মারা গেছে, মনে হলো আপনার?
পট্টনায়ক হাসলেন।…দ্যাটস এ ডিফিকাল্ট কোয়েশ্চেন কর্নেল। ঠিকমতো মড়া না ঘেঁটে..।
আপনার অনুমানের ক্ষমতা অসাধারণ বলেই জানতুম।..কর্নেল সপ্রশংস স্বরে বললেন।…রাইগর মরটিস শুরু হয়েছে নিশ্চয়?
আমার অনুমানের কথা যদি বলেন, তাহলে বলব–অন্তত দশ থেকে এগারো ঘন্টা আগে মেয়েটি মারা গেছে। আপাতদৃষ্টে ইনস্ট্যান্ট ডেথ–আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয়েছে বলতে পারি। অবশ্য, দেয়ার আর আদার ফ্যাক্টরস।
তাহলে আপনার অনুমান অনুসারে রাত নটা থেকে দশটার মাঝামাঝি খুনের, সময়টা দাঁড়ায়। কী বলেন?
সঠিক সময় বলা কঠিন। তবে ওই সময়ের মাঝামাঝি অথবা কিছু পরেও হতে পারে।
বৃষ্টি শুরু হয় বিকেল সাড়ে ছটায়। থামে–আমার হিসেব মতে, রাত দুটোর কাছাকাছি। আমি একটা বই পড়ছিলুম। বৃষ্টি ছাড়ার পর ঘুমিয়ে পড়ি। তাহলে লাশের অবস্থা দেখে আপনার কি মনে হয় যে রাত নটা-দশটা বা তারপর থেকে বাকি বৃষ্টিটা লাশের ওপর পড়েছে?
বাধা দিয়ে ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, দ্যাট ডিপেণ্ডস। প্রথমত, যা বুঝলুম– খুনটা এখানে করা হয়নি। অন্য কোথাও খুন করার পর লাশটা এখানে এনে ফেলা হয়েছে। কারণ ঘাসে বা জমিতে কোথাও ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। লাশের নিচে নরম মাটি চাপে বসে গেছে কিছুটা। তার মানে-ভারি কিছু পড়লে যা হয়। অর্থাৎ লাসটা বয়ে এনে ফেলেছে খুনী। কখন ফেলেছে প্রশ্ন হলে অবশ্য চোখ বুজে বলতে পারব যে আপনার কথামতো রাতে বৃষ্টি থামবার আগেই সেটা ঘটেছে। লাশের ওপর বৃষ্টি পড়ার লক্ষণ খুব স্পষ্ট।
কর্নেল বললেন, তা যদি হয়-তাহলে লাশ বয়ে আনার পথে রক্ত ধুয়ে পড়বেই। কোথাও-না-কোথাও দু-একফোঁটাও আমরা দেখতে পাব। কারণ বৃষ্টির জল গড়িয়ে যাওয়ার প্রশ্ন এ মাটিতে ওঠে না।
ঠিক বলেছেন। ডাঃ পট্টনায়ক লাফিয়ে উঠলেন।…চলুন, আরও ভালভাবে দেখতে দেখতে কিছু দূরের মাটি পরীক্ষা করা যাক।
করেছি। কিন্তু চারদিকে ফার্মের এলাকায় অন্তত কোথাও তেমন রক্তচিহ্ন আমি দেখিনি।
সে কী! তাহলে লাশটা শূন্য থেকে এখানে গজালো নাকি? অদ্ভুত তো!
রিপিট করি। এখানেই খুন হলে ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকতই-দৌড়ানোর চিহ্ন থাকত?
নিশ্চয়ই।
বৃষ্টির মধ্যেই কোথাও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে?
অবশ্য, অবশ্য।
বৃষ্টির মধ্যেই লাশটা এনে ফেলা হয়েছে?
দ্যাটস রাইট।
কিন্তু কোথাও বৃষ্টি-ধোওয়া রক্তের চিহ্ন নেই মাটিতে। কোনও পায়ের দাগ নেই।
ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, যদি লাশটাকে ছাতার আড়ালে বয়ে আনা হয়– তাহলে…
কর্নেল হেসে বললেন, সম্ভব। তাহলে বলতে হয়, ছাতা ধরে একা লাশ বয়ে আনার মতো হারকিউলিসই এর হত্যাকারী!
কেন? একাধিক লোক থাকতে পারে বয়ে আনার সময়।
কিন্তু তাদের পায়ের চিহ্ন কোথায় গেল?
মাটিতে বেশি বালি থাকায় ধুয়ে গেছে।
লাশটা ভারি স্বাস্থ্যবতী মোটাসোটা মেয়ের লাশ। নরম বালিমেশানো মাটিতে পা বসে যাবেই।
ব্যাপারটা তাই বটে। ডাঃ পট্টনায়কের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
কর্নেল একটু কেশে বললেন, আশা করি, ডাঃ পট্টনায়ক জমিতে মানুষের পায়ের দাগ না দেখলেও বিজন্তুর পায়ের দাগ লক্ষ করেছেন?
হ্যাঁ–তা করেছি। ক্ষেতে গরু চরার চিহ্ন স্পষ্ট। ঘাস পরীক্ষা করেও সেটা বোঝা গেছে।
খুরের দাগগুলো এখানে আসার পর আমি দেখতে পাই। গোপাল বলেছে, প্রায়ই বেড়া গলিয়ে বাইরের গরু ঢুকে পড়ে। কাজেই, বৃষ্টির মধ্যে কোনও গরু অবশ্য মোষও হতে পারে, এই ক্ষেতে ঢুকেছিল। লাশের কাছেও ওই রকম চিহ্ন রয়েছে। কিন্তু আমরা কেউ তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছিনে কারণ, ক্ষেতে বা মাটিতে ওটা খুবই স্বাভাবিক চিহ্ন। ডাঃ পট্টনায়ক, একবার ফের লাশটার কাছে যাই, চলুন।
একটু পরিহাসের ভঙ্গিতে ডাঃ পট্টনায়ক বললেন, গরু-মোষ ইত্যাদি শৃঙ্গধারী জীবের পক্ষে এই ধরনের হত্যাকাণ্ড অবশ্য অসম্ভব নয়। তাড়া করার সময় পিঠে শিঙ বিঁধিয়ে মাটিতে আছাড় দিলেও দিতে পারে।
কর্নেল পরিহাসে সাড়া দিলেন না। বললেন, বিয়্যালি। অন্তত একটি কেসের বেলায় তাই সাব্যস্ত করা হয়েছিল মনে পড়ছে। বর্ধমানে এক ডেয়ারিতে পর-পর দুজন মারা পড়ে–দুজনেই একই রাতে। একটা নতুন ভাল জাতের ষাঁড় কেনা হয়েছিল সদ্য। ষাঁড়ের শিঙে রক্তের দাগ ছিল। ভারি অদ্ভুত কেস বলব।
