সেনাপতি হেসে বললেন, আমার এগোনো মানে তো স্যার, লাশটা উঠিয়ে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। অবশ্য কিছু পেপারওয়ার্ক রয়েছে। ছকবাঁধা ভাষায় একটা বিবরণ লেখা।
বলে তিনি নোটবইতে ৬বি মার্কা পেন্সিল লড়িয়ে দিলেন। রুটিন ওয়ার্কস, পুলিশের ভাষায়। আইটেমগুলো ধরাবাঁধা। তবে ফিতে বের করতে হলো। যে কোনও দুদিকের মোটামুটি স্থায়ী সীমানাচিহ্ন হিসেবে কোনও গাছ দেয়াল কিংবা এ ধরনের কিছু বেছে নিয়ে লাশ থেকে তাদের দুরত্ব মাপার কাজ রয়েছে। একটা চিহ্ন হিসেবে উঁচু আলটা পাওয়া গেল উত্তরে, পুবে একটা ইউক্যালিপটাস গাছ। সেনাপতি মাপজোকের ফিতে বের করলেন। একজন সেপাই সেটার একপ্রান্ত ধরল। শেষে ট্রাকটারটা থেকে দূরত্বও মাপা হলো।
সেই সময় ডাক্তার পট্টনায়ক সতর্ক করলেন। দেখবেন, পায়ের ছাপটাপ নষ্ট হয়।
সেনাপতি এক সময় ওঁর ছাত্র ছিলেন। অনুগত প্রাক্তন ছাত্রের বিনয়ে তিনি বললেন, না স্যার–আমি জানি। তেওয়ারী, এগোও তুমি।
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে চুরুট টানছিলেন। যেন এঁদের উপস্থিতি তার চেতনার বাইরে। পট্টনায়ক তার কাছে গেলেন।…এই যে কর্নেল! এ– কেসের নাম কী দেবেন, ভাবছেন বুঝি? এ মার্ডার ইন দা ফার্ম নাকি…
কর্নেল হাসলেন অভ্যাস মতো।…না। এ মার্ডার ইন দা বিগিনিং অফ এ লং ডে। দীর্ঘ দিনের শুরুতে একটি হত্যাকাণ্ড।
পট্টনায়ক বললেন, ঠিক বলেছেন। দিন লম্বাই বটে। ইস্, চন্দনপুর-অন সীর দিনগুলো যা লম্বা লাগছে, ভাবা যায় না! কী হয়েছে বলুন তো?
আপনি ব্যস্তবাগীশ মানুষ কি না। তাই অবসর কাটানো আপনার পক্ষে রীতিমতো ড্যাম বিজনেস! কর্নেল বন্ধুকে যেন সস্নেহে আদর দিলেন। তবে যাই হোক, এখন আপনি লম্বা দিন জবাই করার মতো কিছু পেয়ে গেলেন, বলব।
তাচ্ছিল্যে ভুরু কুঁচকে পট্টনায়ক জবাব দিলেন, এ একটা বাজে কেস বলে মনে হচ্ছে–যা দেখছি। মর্গ থেকে রিপোর্ট এলে দেখবেন, নিছক ধর্ষণের পর খুন। আজকাল আধুনিকতার নামে মেয়েরা যতটা সাহস দেখাচ্ছে, প্রকৃতি তাদের শরীরে তো সে-মতো শক্তি দেননি। এ একটা মারাত্মক অবিবেচনা–তাই না? বলুন!
কর্নেল চাপা হেসে বললেন, শ্রীমতা পট্টনায়ক ও তার মেয়ের সামনে এ মন্তব্য করার সাহস আশা করি আপনার আছে, মাই ডিয়ার ডক্টর পট্টনায়ক!
পট্টনায়ক একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, রিয়্যালি কর্নেল, চোখে আঙুল দিয়ে না দেখালে অনেকে কিছু দেখতে পায় না। আশা করি আমার স্ত্রী কন্যার স্বাধীনতাবোধ এই ঘটনায় কিছু চোট খাবে। কল্যাণীকে সঙ্গে আনলে ভালই করতুম। যখন তখন সে একা পায়ে হেঁটে কিংবা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গত সন্ধ্যায় বৃষ্টি না হলে ওকে আমরা দেখতে পেতুম ভাবছেন? আমার তো সব সময় ভয়, কখন কী ঘটে যায় নাকি। আজকাল সুশিক্ষিত বদমাশদের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। আমরা যাকে ক্রাইম বলি, তাই তাদের নাকি আর্ট অফ মর্ডান লিভিং! যতঃ সব!
কর্নেল বললেন, পায়ের ছাপটাপ কিছু লক্ষ করলেন?
না। সেনাপতির মাপজোক চুকে যাক। তারপর দেখব। ডাঃ পট্টনায়ক কিটব্যাগ থেকে প্লাস্টার ছাঁচ তৈরির উপকরণগুলি বের করতে ব্যস্ত হলেন। তারপর ক্যামেরার মুখে একটা বাড়তি লেন্স পরালেন। ফের বললেন, বাজে কেস। রাজ্যের মেয়ে একাদোকা ঘুরে বেড়ায় সন্ধ্যার দিকে। রাতঅব্দিও কেউ কেউ সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসে থাকে। তার ওপর মদ্যপান..ওঃ, হেল অফ ইট! আপনি দেখবেন, এই মেয়েটির পাকস্থলীতে একগাদা অ্যালকোহল বজবজ করছে।
মর্গে আমি যাচ্ছি না। বলে কর্নেল লাসটার দিকে এগোলেন।
তখন মাপজোক সেরে জিপের ইঞ্জিনের বনেটে একটা খাতা ফেলে সেনাপতি ৬বি পেন্সিলটা জোর লড়িয়ে দিয়েছেন। ডাঃ পট্টনায়ককে পাশে দেখে বললেন, আমার কাজ শেষ স্যার। আপনি এখন যেতে পারেন। ছাপটাপ কিছু তো দেখলুম না–যা ঘাস!
সেনাপতি লিখছিলেন : আজ বাইশ জুলাই ভোর ছটা তের মিনিটে কলকাতার প্রখ্যাত অপরাধ-বিজ্ঞানী কর্নেল এন সরকারের ফোন পাই। তিনি জানান, স্থানীয় অবজারভেটরি থেকে ফোন করছেন। পানিগ্রাহী ফার্মে একটা মেয়ের লাশ পড়ে আছে নাকি। তিনি ওই ফার্মের ট্রাকটার চালক শ্ৰীগোপালকিশোর দাসের কাছে খবরটা জেনেছেন বলেন। তিনি আরও বলেন, বিশিষ্ট ফোরেনসিক-বিশেষজ্ঞ ডাঃ সীতানাথ পট্টনায়ক এখন চন্দনপুর-অন-সী-তে নিজের বাড়িতে রয়েছেন–তাঁকে যেন সঙ্গে নিই। তাই তাঁকে এবং থানায় বেশি কনস্টেবল না থাকায় রামদুলাল তেওয়ারী আর অজিত মহাপাত্রকে নিয়ে অকুস্থলে চলে আসি। ফার্মের ধানী জমিতে লাশটা দেখতে পাই। লাশটার ত্রিশ মিটার দূরে দক্ষিণে একটা ট্রাকটার জমি চষতে চষতে এসে থমকে দাঁড়ায়, তার প্রমাণ পিছনে টাটকা চাষের চিহ্ন। জমিতে ধান নেই–ঘাস ও আগাছা রয়েছে। চারদিকে উঁচু আল আছে। জমিটার পরিমাণ, গোপালকিশোর বলেছে, নয় একর। জমিটার সীমানা : উত্তরে গোলাপ বাগিচা, পুবে সাত মিটার চওড়া প্রাইভেট রাস্তা, দক্ষিণে কর্মচারীদের বসবাসের ঘর, গোডাউন, যন্ত্রপাতি রাখার জায়গা, পশ্চিমে ভুট্টাক্ষেত। লাশটা রয়েছে জমির উত্তর পূর্ব কোণার দিকে। স্থায়ী সীমানাচিহ্ন উঁচু আল থেকে আনুমানিক দুমিটার এবং স্থায়ী সীমানা-চিহ্ন পূর্বে একটা ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে আনুঃ পাঁচ মিটার দূরে। লাশটার মাথা পশ্চিমে, পা পূর্বে রয়েছে। এবং লাশটা উত্তর দিকে কাত হয়ে আছে। বাঁ হাত শরীরের নিচে চাপা পড়েছে, ডান হাত ৯০ ডিগ্রী কোণ করে কোমর থেকে হাফ মিটার দক্ষিণে লম্বালম্বি ছড়ানো–তালু চিৎ। লাশটার নিচে ঘন ঘাস আছে। লাশের সেক্স স্ত্রী। বয়স আনুমানিক কুড়ি থেকে বাইশ। রঙ-আনুঃ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। পরনে ক্রিমরঙা আঁটো নাইলন স্ন্যাকস, গায়ে হলদে খদ্দরের হাফপাঞ্জাবি কালো বাটিকের কাজ করা। চুল ববছাট। কোনও গয়না নেই। প্রকাশ্য হাত অর্থাৎ ডান হাতের কবজিতে চওড়া বাদামী ব্যাণ্ডে মোটা ঘড়ি রয়েছে(কোম্পানীর নাম : এভালান্স, অ্যামেরিকার তৈরি নং ২২৮৭৯৪ এ)। সিঁথিতে সিন্দুর-চিহ্ন নেই। ডান পায়ে স্লিপার দুফিতের–পরা অবস্থায় রয়েছে। ফিতের রঙ লাল, আনুঃ তিন সে.মি. চওড়া। বাঁ পা খালি। বাঁ পা থেকে পঞ্চাশ সে.মি. দূরে সরাসরি উত্তর দিকে এবং স্থায়ী উত্তর সীমানাচিহ্নের এক মিটার দূরে আরেকটি অবিকল একই গড়নের একটি স্লিপার পড়ে রয়েছে। চিৎ হয়ে আছে সেটা। লাশটার মাথা পা অব্দি আনুঃ মাপ দেড় মিটার। ক্ষত চিহ্ন : পিঠে-হার্টের উল্টোদিকে। জমাট থলথলে রক্ত রয়েছে। কিছু নিচেই ঘাসে পড়েছে। তাছাড়া আশেপাশে কোথাও রক্তের চিহ্ন দেখি না। ফার্মের কেউ মৃত তরুণীকে চেনে না বা দেখেনি। আশে-পাশে খুঁজে মার্ডার উইপন বলা যেতে পারে এমন কিছু পাওয়া গেল না। প্রাথমিক বিবরণ মোটামুটি এই। তদন্ত সাপেক্ষ।…
