পিঠে ছুরি মারা হয়েছে। কিন্তু ছুরিটা নেই। পিঠে মারা হয়েছে, তার একটা কারণ হতে পারে, দৌড়ে পালানোর সময় আঘাত করেছিল হত্যাকারী। কর্নেল সতর্ক চোখে আশেপাশে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন। কোথাও একবিন্দু রক্ত নেই। মাটিটা বেলে। জল শুষে নিয়েছে। কাদা হয়নি বিশেষ। ঘাসে বা আগাছার পাতায় কোথাও এক ফোঁটা রক্ত লেগে নেই। লাশটা মনে হয় বাইরে থেকে এনে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও পায়ের দাগ নেই দেখা যাচ্ছে। নরম মাটিতে দাগ পড়া অনিবার্য ছিল। দেখা যাক, পুলিশ অফিসাররা কেউ আসুক। থানায় বলা হয়েছে ডাঃ পট্টনায়ককে সঙ্গে আনতে। পট্টনায়ক শুধু ডাক্তার নন, ফোরেনসিক-এক্সপার্টও। একসময় কলকাতায় ফেরেনসিক ইন্সটিটিউটে ইন্সট্রাক্টারও ছিলেন। সেই সূত্রে কর্নেলের সঙ্গে আলাপ হয়। শেয়ালদা স্টেশনে ট্রাকবন্দী একটা লাশের ব্যাপারে চমৎকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন ভদ্রলোক।
গোপালকিপোর, তাহলে মেয়েটিকে তুমি চেনো না বলছ? কর্নেল এবার চুরুট ধরালেন।
আজ্ঞে না স্যার। এই প্রথম দেখছি।
কর্নেল মুখ ঘুরিয়ে জমির উত্তর-পূর্ব দিকে টিলার গায়ে সেই বাংলোটা দেখতে দেখতে বললেন, ওখানে কে থাকে?
গোপালকিশোর বলল, সায়েব যখন আসেন, থাকেন। বাকি সময় তালাবন্ধ থাকে।
কেউ থাকে না? কোনও মালী, কিংবা দাবোয়ান?
না স্যার। বাংলোটার বদনাম আছে। বলে গোপালকিশোর করুণ হাসল।
বদনাম! ভূতের নাকি? কর্নেল হেসে উঠলেন।
আজ্ঞে সেরকমই। রাতবিরেতে মানুষের আওয়াজ পাওয়া যায় কখনো। কখনো আবছা লোক দেখা যায়। আমরা আলো নিয়ে গিয়ে দেখেছি, কেউ নেই দরজা তালাবন্ধ রয়েছে ঠিকঠাক।
তুমি নিজে কখনো দেখেছ কি?
না স্যার আমার চোখে পড়েনি। ভোমরলালরা দেখেছে।
কে ভোমরলাল?
দারোয়ান স্যার। সে বেটা অবিশ্যি গাঁজা খায়। তবে হাসিরাম মালীও নাকি দেখেছে।
মিঃ পানিগ্রাহী এসব কথা জানেন?
না স্যার। ওনাকে এসব ফালতু কথা বলা যায় নাকি? তবে একবার…।
একবার?
সায়েব খুব বকেছিলেন এসে–শেবার ঘরের মেঝেয় কে বমি করে রেখেছিল।
বমি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। অথচ আশ্চর্য, দরজায় তালা আটকানো ছিল দিব্যি।
তুমি বমিটা দেখেছিলে নিশ্চয়?
না স্যার, হাসিরাম দেখেছিল। ওকেই সব ধুতে হয়েছিল কি না। তাহলে তোমাদের বাংলোর ভূতে বমি করে দেখছি!
এইসময় একে একে গেটের পাশের গুদাম আর ঘরগুলো থেকে কিছু লোককে এদিকে আসতে দেখা গেল। কেউ কেউ দৌড়ে আসছিল। সবার আগে যে এল, তার গোঁফগালপাট্টা ইত্যাদি দেখেই বুঝলেন, এই ভোমরলাল। সে একলাফে কাছে এসে অস্ফুট আর্তনাদ করল, হা রামজী! এ কী ব্যাপার?
অন্যেরাও এসে ভিড় করল। বিস্মিত গুঞ্জন শুরু হলো। কর্নেল গম্ভীর স্বরে বললেন, ভোমরলাল, এটা খুনখারাবির ব্যাপার। তুমি সবাইকে বলো, সরে তফাতে গিয়ে দাঁড়াক। এক্ষুণি পুলিশ এসে যাবে।
গোপালকিশোর আদেশটা ঝট করে লুফে নিল। হাঁকডাক শুরু করল সে।…তফাতে যাও, তফাতে যাও! ভোমরলালও দারোয়ানী দেখাতে ছাড়ল না। সূর্য উঠছে। লাল একটা চাকা বেরিয়ে পড়েছে। সূর্যটা দেখতে দেখতে মন বিষণ্ণ হয়ে গেল কর্নেলের। হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটা দিনের শুরু, কোথায় পৌঁছবেন কে জানে! অবাক ভয় পাওয়া লোকগুলোর মুখে সুর্যের লালচে রঙ পড়েছে। একটা মুখে গিয়ে তার দৃষ্টি আটকে গেল। কী যেন রয়েছে মুখটায়। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। কিছু জোর করে চেপে রাখলে মানুষের মুখে একটা দম আটকানো ছাপ। পড়ে, কর্নেল দেখেছেন। সরলতা! ডাঃ পট্টনায়ক সরলতা নিয়ে তর্ক করছিলেন মেয়ের সঙ্গে। এই সেই সরলতার দ্বিতীয় নমুনা বটে! কর্নেল লোকটার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে নরম স্বরে বললেন, তোমার নাম কী ভাই? কিছু বলবে তুমি? বলো–কোনও ভয় নেই!
লোকটি অমনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।…আমি হাসিরাম স্যার। আপনি পুলিশের অফিসার স্যার? কাল রাতে স্যার, আমি ঠিক দেখেছিলাম-সায়েবের বাংলোর মধ্যে যেন আলো জ্বলছে। এরা ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেবে বলে কিছু বলিনি স্যার। তখন বিষ্টি হচ্ছিল জোর। তারপর আলোটা যেমন জ্বলে উঠেছিল, আচমকা নিভে গেল স্যার।.।
ডিটেকশন করার ব্যাপারে ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়ার মূল্য আছে। কর্নেল সরকার চুরুট টানতে থাকলেন।..অনেক সময় ফ্যাক্টস বা বাস্তব তথ্যের চেয়েও ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া বেশি কাজ দেয়।
.
০৪.
প্রাথমিক তদন্ত
জিপ থেকে চারজন ব্যক্তভাবে তোক নামল। পুলিশ অফিসার শ্রী সেনাপতি, ডাঃ পট্টনায়ক আর দুজন বন্দুকধারী সেপাই। তারা দৌড়ে লাশটার কাছে চলে এল। পট্টনায়কের কাঁধে একটা বড়সড় এয়ারব্যাগ আর অদ্ভুত গড়নের ক্যামেরা ঝুলছে। হাতে সেকেলে গড়নের হাতলওয়ালা আয়নার মতো কী একটা রয়েছে–গোলাকার ঢাকনা দেওয়া কাঁচ।
সেপাই দুজন তাদের কর্তব্য সেরে নিল আগে। অর্থাৎ ফার্মে লোকজনকে অন্তত পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে খেদিয়ে দিল। পট্টনায়ক সশব্যস্তে বললেন, এক মিনিট মিঃ সেনাপতি। তারপর সাবধানে এগিয়ে লাশের ডানকবজিতে নাড়ি পরীক্ষা করে নিলেন। তারপর এগিয়ে পিছিয়ে নানা ভঙ্গিতে পটাপট সুইচ টিপলেন ক্যামেরার। লাশটার চারদিক থেকে কয়েকটা ছবি তুললেন। শেষে ক্লোজশটও নিলেন গোটা তিনেক। তারপর মৃদু হেসে হাত ইশারা করলেন, হ্যাঁ, মিঃ সেনাপতি–আপনি এগোতে পারেন এবার। শী ইজ কোয়াইট ডেড।
