কর্নেল মুহূর্তে টের পেলেন লোকটা একটা মারাত্মক কিছু দেখে ভীষণ শক্ খেয়েছে। তিনি তার সামনে দাঁড়িয়ে শক্ থেরাপি প্রয়োগ করার মতলবে ধমক দিলেন, আলবত তোমার দোষ। তুমিই তো চাপা দিয়েছ! স্বচক্ষে দেখেছি?
অমনি গোপালকিশোর কর্নেলের পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।…দোহাই স্যার, বাঁচান আমাকে! আমি খুন করিনি, আমি খুন করিনি!
কর্নেলের গায়ে পেশীগুলো শক্ত হয়ে গেল। খুন! মার্ডার! কী বলছে ও? দুহাতে ওর কাধ ধরে দাঁড় করালেন। তারপর এক মুহূর্ত ওর মুখটা দেখে নিয়ে সজোরে গালে এক চড় মারলেন। এই শক্ থেরাপি প্রয়োগ ছাড়া উপায় ছিল না।
চড় খেয়ে গোপালকিশোর কাঠ হয়ে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে তার মুখে স্বাভাবিকতা ফুটে উঠল। একটা বড় নিশ্বাস ফেলে মাথাটা দুপাশে দোলাল হতাশভাবে। তারপর বলল, স্যার কি পুলিশ অফিসার?…
.
কিছু পরে অবজারভেটরিতে গিয়ে থানায় ফোন করে কর্নেল গোপালকিশোরের সঙ্গে পানিগ্রাহী ফার্মের দিকে যেতে যেতে ভাবছিলেন, এই তাঁর বিধিলিপি বলা যায়। শয়তানের সঙ্গে পাঞ্জা কষতে কষতেই তাঁর অবসরভোগী জীবনটা কেটে যাবে মনে হচ্ছে। একদণ্ড ফুরসত পাবেন না। এক চিরকালের খুনী সবসময় সব জায়গায় এমনি করে তার সামনে ফেলে দিচ্ছে একটা করে লাশ, তাকে লেলিয়ে দিচ্ছে নিজের পিছনে–এ এক বিচিত্র লুকোচুরি খেলা! রহস্যময় অন্ধকারে সেই খুনীকে খুঁজে বের না করা অব্দি তার রেহাই নেই। মাথায় জেদ চড়ে যায়। যৌবনে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে শত্রুর সঙ্গে এমনি মরণপণ হারজিতের লড়াই করতে হয়েছে। তাকে। সেই থেকে ওই জেদের জন্ম। কর্নেল মনে মনে বলছিলেন, না ঈশ্বরনা। তুমি আমাকে পাদরি ভেবো না। আমি তোমার প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত প্রফেটও নই তাদের পায়ের নখের যোগ্যও নই। তবু কী জানি, জীবনে এ এক দুর্মর প্যাসনের পাল্লায় আমি পড়েছি যা আমাকে অনবরত একটি শক্তির বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়েছে, যে শক্তি জীবনবিরোধী। সে মৃত্যুর চেলা। এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মধ্যে সহজাত শক্তি হিসেবে সে জন্মায়–তার নাম হননেচ্ছা, হিংসার বিষাক্ত পিণ্ডের মতো তার অবচেতনায় উপস্থিতি। সুযোগ পেলে অনুকূল অবস্থা ও আবহাওয়ায় সেই পিণ্ড ডিনামাইটের মতো ফাটে ও ধ্বংস করে। সে হিসেবে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এই হত্যাকারী রয়েছে। অস্তিত্বের অন্ধকার চোরকুঠুরি থেকে সে দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসে। তাই ডাঃ পট্টনায়কের মতো সজ্জন ভদ্র সুসভ্য মানুষকে। যদি দেখি–প্রিয়তমা স্ত্রী অথবা কন্যাকে হত্যা করে বসেছেন, বিস্মিত হবার– কিছু নেই।…
পরক্ষণে চমকে উঠলেন।…মাই গুডনেস! এ কী ভাবছি! হঠাৎ পট্টনায়কের কথাটা মাথায় এল কেন? এই আমি নীলাদ্রি সরকারও কি হননেচ্ছা থেকে মুক্ত? কে জানে! আমরা কোন মুহূর্তে কে কী করে ফেলব, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। সত্যি নেই। এমন কি, যে বিচারক ভারতীয় দণ্ডবিধির দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, যিনি খুনীকে ফাঁসি দেন–তিনিও কি সেই সনাতন প্রবৃত্তি থেকে মুক্ত? উত্তরবঙ্গের সেই বিচারক ভদ্রলোকের কাহিনী সবাই জানে, যিনি স্ত্রী ও তিন মেয়েকে খুন করে বসলেন। ….
টিলার কাছাকাছি এসে বাঁদিকে পথ ঘুরল। সামনে পানিগ্রাহী ফার্ম দেখা গেল। টিলার পশ্চিমের ঢালু গা থেকে নেমে কিছু অসমতল এবং কিছু সমতল জমি বেড়া দিয়ে ঘেরা রয়েছে। টিলার গায়ের অংশে ইউক্যালিপটাস গাছের মধ্যে একটা কাঠের বাংলোমতো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। জমিটার দক্ষিণপ্রান্তে–সেই বাংলোর সরাসরি উল্টোদিকে ফার্মের গেট আর গুদাম। একটা চালাঘরও রয়েছে।
কর্নেল ভীষণ দুঃখিত। এই সরলতাময় ভোরবেলাটি পৃথিবীর জন্যে বয়ে। আনল এক ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ। যে চিরকালের খুনী তার এই সুন্দর দিনটি এভাবে মাটি করল, তার প্রতি ঘৃণায় ও রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার অন্যমনস্ক একটা হাত পকেটে ঢুকতেই একটি শক্ত বাঁকানো জিনিসের অস্তিত্ব টের পেলেন। রিভলভার! কী আশ্চর্য, আসবার সময় তাহলে কখন এটা পকেটে ঢুকিয়েছিলেন যথারীতি!
দুঃখে হাসলেন কর্নেল। বরাবর এটা হয়ে আসছে। অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে বলা যায়। বেরোলেই এটা সঙ্গে নিয়ে ফেলেন, জেনে বা না জেনেও। কেন নেন? আত্মরক্ষা! তাহলে মাই ডিয়ার ওল্ড ম্যান, তুমি সতত সতর্ক, কারণ তুমি সেই ইটারনাল মার্ডারারকে ভয় করো। তুমি ক্রমাগত দিনের পর দিন তার একটার পর একটা মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে তাকে বেআব্রু করে চলেছ–তাই তোমার এত অবচেতন ত্ৰাসনা জানি কখন সে তোমাকেই আক্রমণ করে বসে!
গোপালকিশোর ধরা গলায় রুদ্ধশ্বাসে বলল, এই যে স্যার, এই যে! আহা হা, এমন কমবয়সী মেয়ে স্যার! এত নিষ্ঠুর মানুষ থাকতে আছে–আহা হা!
দেখতে পাচ্ছি। বলে কর্নেল উঁচু আল থেকে যুবকের মতো লাফ দিয়ে নামলেন এতক্ষণে। পরক্ষণে তার নার্ভগুলো বর্তমান অবস্থার দিকে সক্রিয়তায় তৎপর হলো। অনেক হত্যাকাণ্ডের মতোই এও একটি নিছক হত্যাকাণ্ড। সূর্যের আভাস দেখা দিয়েছে দিগন্তে। একটু ঝুঁকে মেয়েটির মুখ লক্ষ্য করলেন। কোথায় যেন দেখেছেন! সম্ভবত সমুদ্রতীরেই। না, কাল বিকেলে যে চারটি মেয়ে তার কাছে সিগারেটের জন্যে আগুন চেয়েছিল, এ তাদের দলের নয়। কারণ, সেই স্ন্যাকস ও গারারাধারিনী তরুণীদের কারও গায়ে পাঞ্জাবি ছিল না।
