দেখতে দেখতে ট্রাকটারটা আরও দশ মিটার এগিয়ে গেল। তখনও জিনিসটা কী বুঝতে পারছে না গোপালকিশোর। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার। আরও পাঁচ মিটার..আরও দুই…আরও দুই…ফের দুই…একেবারে জিনিসটার সামনে সজোরে ব্রেক কষল সে। তার মুখ সাদা হয়ে গেল। কয়েকমুহূর্ত পাথরের মূর্তির মতো স্টিয়ারিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল গোপালকিশোর।
তারপর সংবিত ফিরে পেল। চকিত চোখে চারদিক দেখে নিল। কেউ কোথাও নেই।
সে লাফ দিয়ে নামল ট্রাকটার থেকে।
তার উল্টোদিকে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে একটি মেয়ে। ববছাট চুলগুলো ঘাস ও কাদায় মাখামাখি, হলুদ ঢিলে পাঞ্জাবির ওপর কালচে জংলা নকশা আর চাপ চাপ রক্ত। পরনে ক্রিমরঙা আঁটো স্ন্যাকস। এক পায়ে দুফিতের স্লিপার রয়েছে, অন্য পা খালি–স্লিপারটা ছিটকে একপাশে পড়ে রয়েছে। ঠিক ঘুমোবার ভঙ্গিতে পড়ে রয়েছে মেয়েটি।
যাই হোক, পিঠে রক্ত ও ক্ষতচিহ্ন দিয়ে জংলা ক্ষেতে কোনও মেয়ের ঘুমোতে আসা খুব সহজ ব্যাপার নয়। গোপালকিশোরের শরীর থরথর করে কাঁপছিল। মেয়েটির মুখ ঘাসের মধ্যে কাত হয়ে ডুবে রয়েছে। বৃষ্টিতে ভেজার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আপাতদৃষ্টে। গোপালকিশোর বিভ্রান্ত হয়ে দৌড়তে থাকল হঠাৎ।
সেই ভোরে চন্দনপুর-অনসীর নির্জন রাস্তায় বোবায় ধরা মানুষের মতো গো গোঁ করে তাকে দৌড়তে দেখলে পাগল বলেই মনে হতো। অবশ্য এখানে পাগল কদাচিৎ দেখা যায়।
গোপালকিশোর ড্রাইভার মানুষ। কিন্তু জীবনে একবারও অ্যাকসিডেন্ট না করার রেকর্ড তার আছে। কোনও খুনখারাবিও তার বেয়াল্লিশ বছরের জীবনে চাক্ষুষ করেনি। সরল, অমায়িক, সাবধানী আর হিসেবী বলে তার সুনাম আছে। আজ সকালে এই প্রথম তারই ট্রাকটারের তিন মিটার দূরে একটি রক্তাক্ত লাশ সে আচমকা আবিষ্কার করেছে এবং তার জন্যে সেই বদমাশ সাপটাই নির্ঘাৎ দায়ী।
সে উদভ্রান্তভাবে বিড়বিড় করছিল, আমি চাপা দিইনি! আমার কোনও দোষ নেই, স্যার!
কোথায় যাচ্ছিল, তার খেয়াল নেই। পীচঢালা সরু পরিচ্ছন্ন রাস্তা ধরে সে দৌড়চ্ছিল। বিড়বিড় করছিল, আমি চাপা দিইনি…আমি চাপা দিইনি…
.
০৩.
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার
সামরিক দফতরের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চন্দনপুর-অন সী-তে প্রতি বর্ষায় কিছুদিন এসে কাটিয়ে যান। এখানে তার বন্ধু ডাক্তার সীতানাথ পট্টনায়কের একটি বাড়ি রয়েছে। সেখানেই তিনি উঠেছেন। ডাঃ পট্টনায়ক ভুবনেশ্বরের লোক। মাঝেমাঝে তিনি সস্ত্রীক এ বাড়িতে এসে থাকেন। তার হালকা সবুজ একটি ল্যাণ্ডমাস্টার গাড়ি রয়েছে। এবার তার স্ত্রী মালবিকা আর মেয়ে কল্যাণীও এসেছে সঙ্গে। কর্নেল এসেছেন পরে।
খুব ভোরে উঠে একবার সমুদ্রতীরে বেড়িয়ে আসা কর্নেল সরকারের অভ্যাস। ষাট পেরিয়েছে বয়স। চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু ভিতরে যৌবনের প্রাণপ্রাচুর্য উদ্দাম।
আজ ভোরে কী খেয়াল হলো, কর্নেল সমুদ্রের দিকে গেলেন না। অবজারভেটরির কাছে এসে ডাইনে উত্তরের পথে চললেন। একপাশে বালিয়াড়ি, অন্যপাশে ছড়ানো-ছিটানো কিছু সুন্দর বাড়ি। চন্দনপুর-অনসী বড়লোকের জায়গা। তাই সাধারণ মানুষের কোনও জমজমাট বসতি গড়ে ওঠেনি। চারদিক ফাঁকা, খোলামেলা। কর্নেলের ইচ্ছে হলো, আজ আকাশ যখন পরিষ্কার–তখন টিলায় উঠে সূর্যোদয় দেখবেন। তিনি টিলার দিকে আস্তে আস্তে হাঁটছিলেন। সূর্য উঠতে এখনও আধঘন্টা দেরি আছে। টিলায় পৌঁছতে দশ মিনিট লাগবে মাত্র।
কাল রাত্রে পট্টনায়ক পরিবারের সঙ্গে খেতে বসে সভ্যতা ও সরলতার প্রসঙ্গ উঠেছিল। সেই কথাগুলো এখন মাথায় এল কর্নেলের। সরলতা! এখনও ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় অনেক মানবগোষ্ঠীর মধ্যে এটা টিকে রয়েছে। ঈশ্বর সরলতাকে রক্ষা করুন সভ্যতার থাবা থেকে। আরবস্তুত এই চমৎকার নির্মেঘ ভোরে আকাশ ও পৃথিবী জুড়ে সরলতা বিরাজ করছিল।
মাথার ওপর কী একটা পাখি উড়ে গেলে কর্নেল তাকে দেখার চেষ্টা করলেন। বোঝা গেল না। বার্ডওয়াচিং তার অন্যতম হবি। ভুল হয়েছে, বাইনোকুলারটা আনেননি। পাখিটার ডাক শুনে মনে হলো, দুর্লভ জাতের সেই উড-ডাক। এ অঞ্চলে উড-ডাক নাকি মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায়। কর্নেল মুখ তুলে পাখিটার মিলিয়ে যাওয়া লক্ষ করছিলেন। হঠাৎ তার কানে এল ধুপ-ধুপ শব্দ। তিনি দেখলেন, একটা হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জিপরা লোক ধুকুর-ধুকুর দৌড়ে আসছে। তার কানে এল : আমি চাপা দিইনি..আমি চাপা দিইনি! পাগল নাকি? কর্নেল কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
চন্দনপুর-অন-সী-তে এই ভোরবেলায় পাগল দেখতে পাওয়া এক দুর্লভ ঘটনা বটে! কর্নেল ভাবলেন। কাছাকাছি অনেককালের পুরনো একটা উন্মাদ আশ্রম বা লুনাটিক অ্যাসাইলাম আছে। সেকারণে এখানে প্রবাদ রটে আসছে যে চন্দনপুর অন-সীতে পাগল দেখতে পাওয়া নাকি দুর্লভ ও পরমাশ্চর্য ঘটনা এবং পাগলরা ভাল হতে অর্থাৎ পাগলামি সারাতে চায় না। তাই প্রাণ গেলেও এ তল্লাটে পা বাড়ায় না। অবশ্য এর সত্য-মিথ্যা যাচাই করা মুশকিল। অন্তত কর্নেল বহুবার এখানে এসেছেন, কোনও পাগল দেখেননি।
লোকটা সামনা সামনি আসামাত্র কর্নেল চমকে উঠলেন। আরে! এই লোকটাকে তো পানিগ্রাহী ফার্মে ট্রাকটার চালাতে দেখেছেন!
গোপালকিশোর কর্নেলকে যেন এতক্ষণে দেখল। দেখার সঙ্গে সঙ্গে হাউ-মাউ করে উঠল–স্যার, স্যার! আমার কোনও দোষ নেই–ঠাকুরের দিব্যি, আমি সবে, ক্ষেতে নেমেছি–অমনি স্যার…
