হ্যাঁ, এক আত্মীয়ের সঙ্গেই এসেছে প্রণতি। তিনি ভোরে সারাঙ চলে গেছেন খবর দিতে।…
প্রণতির এই বিবরণ শোনার পর বলা বাহুল্য মনে মনে আমি হাসলুম। প্রণতি কতটা সত্য বলছে, তা জানি না। কিন্তু কতটা মিথ্যা বলছে, তা ধরতে পারছি, প্রথমত, ‘আত্মীয়’ ভদ্রলোকের সঙ্গে রাতে সেইসব রহস্যময় ঝগড়াঝাটি ও কান্নাকাটি–দ্বিতীয়ত, বদ্রীকে বলেছে, সওয়া ন’টার বাসে তুলে দিতে।
আমি ধূর্ত প্রশ্ন ছাড়লুম-খবর না দিয়ে এভাবে আসা কি ঠিক হয়েছে? ধরো, যদি নীতিশবাবু দৈবাৎ কোথাও গিয়ে থাকেন, তোমার আত্মীয় ভদ্রলোক কী করবেন? খামোক হয়রান হয়ে ফিরে আসবেন।
প্রণতি জবাব দিতে দেরি করল না। ভুরু কুঁচকে বলল, আমি ফিরে যাব।
সে কী?
প্রণতি জবাব দিল না। একটু চুপ করে থাকার পর বললুম– তোমার এখানে অপেক্ষা করার অসুবিধে নেই অবশ্য। নীতিশবাবু যদি সারাঙে নাই থাকেন এবেলা, তুমি অপেক্ষা করবে। আর যদি বলল, আমি এখানেই জিপের ব্যবস্থা করে তোমাদের পৌঁছে দিয়ে আসব’খন।
প্রণতি গুম হয়ে শুধু মাথাটা দোলাল।
বললুম– ব্যাপারটা কী বলো তো প্রণতি?
কী ব্যাপার?
হাসলুম। …অনেক খটকা লাগছে। মানে হঠাৎ তোমার এভাবে আসা…
প্রণতি কথা কেড়ে বলল, কী করব? একটা চরমহেস্তনেস্ত করা তো দরকার। কলকাতা থেকে সেজন্যে ছুটে এসেছি।
আপত্তি না থাকলে ব্যাকগ্রাউণ্ডটা জানাতে পারো। আস্তে এবং সহানুভূতি মিশিয়ে কথাটা বললুম–।
প্রণতি একটু চুপ থাকার পর বলল, তুমি তো আগে ভীষণ ইনটেলিজেন্ট ছিলে। টের পাচ্ছ না?
অতি সামান্য।
সেই যথেষ্ট। বলে প্রণতি উঠে দাঁড়াল।
তাকে হঠাৎ ব্যস্ত মনে হলো। ঘড়ি দেখল সে। তারপর মুখটা ঘুরিয়ে ওপাশে নিচে রাস্তার দিকে তাকাল। হাসতে হাসতে বললুম– কিছু যদি মনে না করো, আমার কথা শোনো। তুমি এখানে অপেক্ষা করো। আমি তোমার দূত হয়ে বরং বেরিয়ে পড়ি। আমার হাতে অঢেল সময়। তাছাড়া করার মতো একটা কাজও জুটে গেল বরাতে।
প্রণতি গম্ভীরমুখে শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে বলল, শমীক তো গেছে।
শমীক কে?
আমার পিসতুতো দাদা–যার সঙ্গে এসেছি।
উনি সারাঙের রাস্তা চেনেন তো? বড্ড গোলমেলে এ এলাকার রাস্তাঘাট।
চেনে।
প্রণতির হাবভাব আমার বরদাস্ত হচ্ছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে বললুম– ঠিক আছে। আমি একটু ঘুরতে বেরুব। যদি অসুবিধে হয় জানিও।
প্রণতি কোনও কথা বলল না। আমি হনহন করে গেট পেরিয়ে টিলা থেকে নামতে থাকলুম। নিচের রাস্তায় গিয়ে এদিক ওদিক তাকালুম। এমন উজ্জ্বল সকালে প্রণতির ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামানোর মানে হয় না। মোড়ে এগিয়ে বাঁদিকে একটা সঙ্কীর্ণ পিচের পথ দেখতে পেলুম। সেখানে একটা ফলকে লেখা আছে সারাঙ চার কি. মি.। একটা তীরচিহ্নও আছে। সেই পথ ধরে আনমনে হাঁটতে থাকলুম। পথটা আঁকাবাঁকা। একপাশে পাহাড়ের দেয়াল, অন্যপাশে অতল খাদ। তাকালে মাথা ঘুরে ওঠে। কিছুদূর চলার পর আবছা জলের শব্দ কানে এল। খুঁজতে খুঁজেত আবিষ্কার করলুম, বাঁকের ওধারে একটা ঝর্ণা রয়েছে।
ঢালু ধাপবন্দী পাথর বেয়ে নেমে ঝর্ণার নিচে গেলুম। হাত পঁচিশেক চওড়া একটা নদীর ধারা সৃষ্টি করেছে ঝর্ণাটা। তার ওধারে বালি ও পাথরে ভর্তি অনেকটা চওড়া জায়গায় ছোট ছোট ঝোপ গজিয়েছে। ঝোপে অজস্র নীল ফুল ফুটেছে। পাথরে পা রেখে ডিঙিয়ে সেই ঝোপগুলোর কাছে গেলুম। জলের শব্দে কান ঝালাপালা হচ্ছিল।
একটা উঁচু পাথরে পা ঝুলিয়ে বসে হাত বাড়িয়ে একটা নীল ফুল ছিঁড়তে গিয়েই চমকে উঠলুম।
ওপাশে বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে কেউ। পরনে প্যান্ট, শার্ট, পায়ে জুতো রক্তে মাখামাখি অবস্থা। রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে এবং রঙটা কালচে হয়ে। গেছে।
তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে যে আতঙ্ক ও বিস্ময় চেপে ধরেছিল, তার মধ্যেই দুটো জিনিস মাথায় এল। এটা একটা হত্যাকাণ্ড এবং হত্যাকাণ্ডটা ঘটেছে বৃষ্টি ছেড়ে যাবার অনেক পরে। সম্ভবত ভোরের দিকে।
অনেক বছর ধরে প্রখ্যাত এক গোয়েন্দার সহবাসে এসব জিনিস দেখার সাধারণ আতঙ্ক আমি অনেকটা এড়াতে শিখে গেছি। সেই সঙ্গে গোয়েন্দাসুলভ তদন্তবৃত্তিও অবলম্বন করতে শিখেছি।
আতঙ্ক ও বিস্ময় জোর করে তাড়িয়ে প্রথমে আশেপাশে বালির দিকে তাকালুম। জুতোর ছাপ আছে অনেকগুলো। ধস্তাধস্তির চিহ্ন প্রকট।
সেই ছাপের মধ্যে নিজের জুতোর ছাপ জুড়ে দেওয়া সঙ্গত মনে করলুম না। পাথরের ওপর পা রেখে হামাগুড়ি দিয়ে ঝুঁকে লোকটার মুখ দেখার চেষ্টা করলুম। মুখটা কাত হয়ে আছে। চোখ দুটো একটু ফাঁক। মনে হলো, আক্রমণ ঘটেছিল আচম্বিতে। লোকটা এখানে বসে কারুর জন্য অপেক্ষা করছিল কি?
আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে আরেকটা জিনিস চোখে পড়ল। পাথরে লাফ দিয়ে দিয়ে এগিয়ে ঝুঁকে দেখি, এইখানে অনেকটা বালি সরানো। গর্ত হয়ে রয়েছে। কেউ বা কারা বালির তলা থেকে কিছু উদ্ধার করে নিয়ে গেছে।
আবার লোকটার দিকে তাকালুম। আমারই বয়সী। প্রণতির পিসতুতো দাদা শমীক নয় তো? শিউরে উঠলুম। তারপর পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে ফের তার কাছে চলে এলুম। ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে তার বুকপকেটে ঢোকানোর চেষ্টা করলুম। যদি কোনো কাগজপত্র পেয়ে যাই!
কিন্তু সেই সময় আচমকা আমার পাশেই ঠকাস করে একটা ঢিল পড়ল। লাফিয়ে উঠলুম। মুখ তুলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, ঠকাস করে আরেকটা ঢিল পড়ল পাথরে।
